তোর সমীপে (পর্ব-০৪)

তোর সমীপে (পর্ব-০৪)
তোর সমীপে (পর্ব-০৪)


তোর সমীপে (পর্ব-০৪)
গল্পকন্যা




নিশাত হাজারি কিছুটা কর্কশ স্বরে খাবার টেবিলে উদ্দেশ্য বিহীন ফাঁকা বুলি আওড়ায়, " ক'টা বাজে? এই মেয়েটা তো একটা মানুষ! টেবিলে বসে খেতে না দাও, রুমে অন্তত ঠিক টাইমে খাবারটা পাঠিয়ে দেয়া যেতে পারে!নাকি বাড়ির সকলের বিবেক বুদ্ধি একেবারে লোপ পেয়েছে? " নিশাত খাবার শেষ না করেই উঠে যায়।

কারো মুখে কোনো কথা ফুটছে না । আসমা বেগম খানিক রাগান্নিত হোন।  বাবা চাচাদের সামনে উচ্চ বাক্য ব্যয় করাতে। তবে কলি বেগমের মনে তীব্র জ্বালা হচ্ছে মেয়েটার প্রতি নিজের ছেলের এমন আদিখ্যেতা দেখে। তারচেয়ে বেশি রাগ হচ্ছে মেয়েটার উপর। কি দরকার ছিলো, এই মুহূর্তে নিচে নেমে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরী করার। ছেলেটার খাওয়াটা হলো না। 

 প্রচন্ড মনোকষ্ট নিয়ে ঝুল বারান্দায় দুপুর রোদে বসে আছে পুষ্প। পেটের খুদার জন্য ওর মন খারাপ না, মন খারাপ হলো কতোটা তুচ্ছ ভাবলে বাড়ির কাজের লোকদের মর্যাদা ও পায় না।


হঠাৎই এক দমকা হওয়া আসায় আসমানী রঙা সুতি শাড়ির আঁচলটা উড়তে থাকে।

মুখের দুপাশের ছোটো ছোটো বেবি হেয়ার গুলো বাতাসের তোরে চোখে মুখে লেপ্টে যায়।পরম আবেশে শরীরটাও যেন বাতাসের সাথে দুলে ওঠে।


দমকা হাওয়ার স্পর্শে পুষ্পর মনোকষ্ট যেন এক ঝটকায় বাতাসের সাথে মিলিয়ে যায়। পেটের খুদার কথা ভুলে যায়। মনে পরে যায় সেই মানুষটার কথা। তাকে কি আদৌ ভুলতে পারবে? চোখের কোণ ফের ভরে উঠে। কন্ঠ ভারি হয়ে আসে।


ভেজা স্নিগ্ধ কন্ঠে আওড়াতে থাকে,

"তোমার পাশাপাশি হাঁটা আমার হলো না...,

তোমার হাতে হাত রেখে নদীর তীরে বসে,

কোনো এক পড়ন্ত বিকেল উপভোগ করাও আমার হলো না...,

একটি বার দুজনের মধ্যে আলিঙ্গনের যে ইচ্ছেটা ছিলো,

সেটাও আর পূরণ হলো না..."

#গল্পকন্যা


"কি ধরনের বই আপনার পছন্দ?"  আকস্মিক ভরাট পুরুষালী কন্ঠে পুষ্প চমকে থমকে যায়।


শাড়ীর আঁচলটা পিঠের দিকে টেনে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আবারও বলে উঠে, "ইতস্তত করার কিছু নেই! বলুন কি ধরনের বই আপনার পছন্দ?"


 মেঝেতে দৃষ্টি নিবদ্ধ পুষ্প চিকন নরম স্বরে বলে, "ইংরেজী ও বাংলা উপন্যাস বেশি ভালো লাগে ! সাজানো চরিত্র গুলো থেকে অনেক জ্ঞান লাভ করা যায়। তাদের জীবনী পড়ে বাস্তব জীবনে ধৈর্য্য শিখা যায়। অনেক সময় নিজের কষ্ট লাঘব হয়!"  বলেই উদ্যত হয় চলে যাওয়ার জন্য।


মাত্র গুটি কতক শব্দের কয়েকটি বাক্য, তাতেই কতো ব্যথা লুকোনো! এ স্বরে যেন  অদ্ভুত এক জাদুু আছে! শুধু শুনেই যেতে ইচ্ছে করে।


পেছন থেকে নিশাত ফের বলে, "আমি যদি আপনাকে কিছু বই দেই,  পড়বেন?"


পুষ্প ডান পাশে মাথা কাত করে দ্রুত কক্ষে প্রবেশ করে। নিশাত খুশি হয়।


কলেজ ভার্সিটিতে কতো মেয়ে দেখেছে। গর্ব করার মতো একটা বিষয় ওর আছে, অতি সুদর্শন সুঠাম দেহী হওয়ায় ছেলে হয়েও বেশ কতক প্রপোজাল ও পেয়েছে। তবে কখনো কাউকে মনে টানেনি। ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করেনি। কারো সৌন্দর্য কিংবা ব্যক্তিত্ব ওকে মুগ্ধ করতে পারেনি।


অথচ এই মেয়েটির কি অসাধারণ ব্যক্তিত্ব! মুগ্ধ হওয়ার মতো কি অপার স্নিগ্ধতা পুরো মুখশ্রী জুড়ে! চোখ যেন আটকে থাকে মেঝেতে দৃষ্টিপাত করা আখিঁ জোড়ার ঘন ঘন পলক ফেলার উপর। চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না।


তমা খাবার নিয়ে পুষ্পর কক্ষের বন্ধ দরজায় কড়া নাড়তেই নিশাতের ঘোর ভাঙে।

__________________


ফাইনাল ইয়ারের ফাইনাল এক্সাম খুব শীঘ্রই। এতো বছরের পড়াশোনা সার্থক হবে তো এই পরীক্ষার মাধ্যমে।


আসফাক উদ্দিন হাজারি বাড়িতে এসেছেন মেয়ের পরীক্ষার ব্যপারে কথা বলতে। এভাবে তো মেয়েটার জীবন চলবে না। পরীক্ষাটা দেয়া লাগবে।


ক'দিন ধরে লাগাতার আসছেন, কিন্তু মেয়ের দেখা পাচ্ছেন না।


ড্রয়িং রুমে সবাই বসে আছেন। আসমা বেগম ও রেজাউল হাজারির উদ্দেশ্যে আসফাক উদ্দিন বলেন, "মেয়েটার পরীক্ষা সামনে।যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে, জীবন তো কারো জন্য থেমে থাকে না। যদি আপনারা অনুমতি দেন তাহলে মেয়েটাকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে পরীক্ষায় বসাতাম।"


 আসমা বেগম বলেন, "আপনি মেয়েকে পরীক্ষায় বসাবেন না কি করাবেন তা আপনার ব্যপার। কিন্তু সেটা করবেন কি করে? আপনার মেয়ে তো আপনার কথাই শোনে না। অবাধ্য সন্তান আপনার। যে দিকে যায় সেদিকেই...." বাকি কথা বলার আগে রেজাউল হাজারি হাতে চেপে ধরেন। তিনি বলেন, "আপনার মেয়ে যদি পরীক্ষা দিতে চায় দেয়ান... "


কলি বেগম মাঝখানে ফোঁড়ন কেটে বলে, "বিয়ে হয়ে গেছে, স্বামী নেই, এখন শশুর বাড়ি থেকে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হবে? লোকে কি বলবে? বুঝি বুঝি এসব হচ্ছে নতুন করে অন্য কোথাও সংসার পাতানোর ধান্দা আর কি।" আসফাক উদ্দিন বোকা বোনে যান। বুঝতে পারেন না তাদের কথার পরিপ্রেক্ষিতে কি বলবেন। কারণ সত্যি ই তো, তিনি চান তার মেয়েকে অন্য কোথাও বিয়ে দিতে। বাবা হিসেবে সেটা চাওয়া কি অন্যায়।


আর কিছু বুঝক বা না বুঝক, এ বাড়িতে বিয়ে দিয়ে কতো বড়ো ভুল করেছেন সেটা বুঝতে পারছেন। তারা যেমনি নিষেধ করেন নি তেমনি কোনো আগ্রহ ও দেখাননি। গা-ছাড়া ভাব দেখাচ্ছেন। তাদের মেয়ে হলে কি পারতেন? মনের কষ্ট মনে চেপে বলেন,


"পুষ্পকে একটু ডেকে দিন। ওকে আমি কোচিং এ নিয়ে যাবো।"


তমা যায় পুষ্পর ঘরে, পুষ্পকে বলে, "ভাবি আপনার বাবা এসেছে, নিচে যেতে ডাকছে। আপনাকে নাকি কোন কোচিং এ নিয়ে যাবে।"


পুষ্প বুঝতে পারে বাবা কি কারণে এসেছে। পুষ্প বলে, " উনাকে বলো গিয়ে, আমি পড়াশোনা করবো না। শশুর বাড়িতে সংসার করবো।  তিনি যেন এ বাড়িতে আর না আসে। যদি আসে তাহলে আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো..."


তমা পুষ্পর কথা মতো তাই বলে।আসফাক উদ্দিন হতাশ হন। সকলের সামনে মাথা নত করে এক বুক কষ্ট নিয়ে হাজারি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।আসমা বেগম ও কলি বেগম খুশি হোন।


কলি বেগম বলেন, "বড়ো ভাবি এই সব হচ্ছে মেয়েকে নিয়ে অন্য জায়গায় সংসার পাতানোর ধান্দা।"

"আমি বুঝি ছোটো। তবে এ উদ্দেশ্য আমি সফল হতে দিবো না। ঐ অপয়ার জন্য আমার ছেলে দুনিয়া ছাড়া হয়েছে। ওকে আমি কখনোই অন্য কোথাও সুখে সংসার পাততে দিবে না।"


নিশাত দুশো পঁচিশটা বই ভর্তি একটা বড়ো বাক্স বুকের সাথে চেপে ধরে মেইন ডোর দিয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করে। সিড়ি দিয়ে উঠতেই যাবে।হাত থেকে বাক্সটা পড়ে যায়।  কিছু বই ছড়িয়ে যায়। বিথী, শিথী, প্রাপ্তি সোফা থেকে উঠে ছুটে আসে। এতো বই এক সাথে দেখে তিন জনে অবাক। তিন জন মিলে সেগুলো তুলে নিশাতের হাতে দেয়। 


প্রাপ্তি কৌতুহল বশত বলে, " ভাইয়া তুমি এতো বই দিয়ে কি করবে?"


 নিশাত বই গুলো সুবিন্যাস্ত ভাবে গু়ছাতে গুছাতে বলে, "আরে পুষ্প আছেন না...! ওনার জন্য। সারাক্ষণ একা একা বসে থাকে। কেউ কথা বলে না উনার সাথে। একা একটা মানুষ কিভাবে থাকতে পারে, তাই জন্যে আর কি!"


শিথী অবাক হয়ে বলে, "তাই জন্যে তুমি এতো এতো লেখকের, এতো বই এনে দিবে! কই আমি প্রাপ্তি আপু যে এতো বই পাগল, কখনো এনে দিলে না তো?"


নিশাত ভ্রু কুঁচকে শিথীর দিকে তাকায়, "কেন তোরা কি বাড়ির বাইরে গিয়ে আনতে পারছিস না? তোরা তো কুঁড়ে, আনার জন্য পড়িস না। এক বই-ই রিপিট করিস বারবার। উনি তো একাকি মানুষ; তার কিছুটা নিঃসঙ্গতা ঘোচানোর চেষ্টা মাত্র..."


বাক্সটা নিয়ে দাঁড়াতেই, প্রাপ্তি বলে, "তাই বলে এতো বই...?"


সিঁড়ির ধাপে পা ফেলে এগোতে এগোতে নিশাত বলে, "তো কি করবো? তোরা তো একটু যেয়ে ওনার সাথে আড্ডা দিতে পারিস, কথা বলতে পারিস? তা তো করবি না। আজাইরা থেকে থেকে কূটনামি শিখছিস খালি!"


প্রাপ্তি শিথী দু'জনই খেপে যায়। রেগে শিথী বলে, "দেখলে প্রাপ্তি আপু, ভাইয়া ঐ মহিলার জন্য আমাদের কূটনি বললো?" 


"হুম দেখলাম তো, একদম কথা বলবি না, ঐ মহিলার সাথে আর ভাইয়ার সাথে।"


বিথী ফোড়ন কেটে বলে, "কি বলছো এসব! তোমরা তো দেখি আসলেই কূটনামি করছো। ভাইয়া তো মজা করে বলেছে। আসলেই তো! ভেবে দেখেছো...উনি কিভাবে একাকী সময় কাটান! আমরা তিন জনে কতো আড্ডা দেই, তারপর ভার্সিটি, শপিং কতো জায়গায় ঘুরাঘুরি করি। বাসায় যতক্ষণ থাকি ফোন, টিভি, লেপটপ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, তবুও আমাদের মাঝে মধ্যেই ভালো লাগে না। আর উনি! উনি কিভাবে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি থেকে দিন কাটাচ্ছেন ভেবে দেখেছো একবার। আমাদের কি উচিত না  ওনার সাথে দিনের কিছুটা সময় কাটানো?"


প্রাপ্তি তেলে বেগুন জ্বলে উঠার মতো বলে, "তোর দেখি উনার প্রতি অনেক দরদ উথলে পড়ছে! গত এক মাস যে, তার জন্য হাত ভেঙে নোলা হয়ে বসে ছিলি, তখন কই ছিলো এই দরদ?"


শিথীও তাল মিলিয়ে বলে, "ভালো সাজতে চাস? সাজ গিয়ে, আমাদের এতো সখ নেই।"


বিথীর প্রচন্ড রাগ উঠে যায় বলে, " ওটা একটা দুর্ঘটনা ছিলো, উনি ইচ্ছে করে করেননি। তবুও বড়ো হয়ে উনি আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।"


"ওসব ঢং। তোর হাত কি ঠিক করে দিয়েছিলো। কষ্ট তো তুই ভোগ করেছিলি।" প্রাপ্তির কথা শুনে বিথী উঠে দাঁড়ায় বলে তোমাদের মন মানসিকতার ফিফটি পারসেন্ট নেগেটিভটি বাকিটা সব কিছু মিলিয়ে।" 

"পরের বার তোমার বাবা এলে, স্পষ্ট করে বলে দিও, আর কখনো যেন তোমার লেখাপড়া সংক্রান্ত কোন কিছুর আলোচনা করতে না আসে। এ বাড়িতে থাকতে হলে এসব চলবে না। আমার ছেলে বেঁচে নেই, সেই সুযোগে গায়ের ধলা চামড়া নিয়ে পড়াশোনার নামে বাইরে গিয়ে ফস্টিটস্টি করে বেড়াবে। নাহহ! তা হতে দিবো না। যে পড়াশোনাে জন্য ঘরের বাইরে গিয়ে মান সম্মান খোয়াাতে হবে, সে সব পড়াশোনা আমার চাই না..." আসমা বেগম পুষ্পর ঘরে এসে পুষ্পকে শাসানি দিচ্ছেন, সাথে এ বলেও ধমকে দিচ্ছেন, এ সব কথা যে  উনি বলছেন কেউ যেন না জানে। হঠাৎ গলা খাঁকারি দিয়ে দরজা ঠেলতে ঠেলতে ভিতরে প্রবেশ করে নিশাত......


চলবে...


নিশাত কি সব শুনে ফেলেছে?



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।