তোর সমীপে (পর্ব-০৩)

তোর সমীপে (পর্ব-০৩)
তোর সমীপে (পর্ব-০৩)

তোর সমীপে (পর্ব-০৩)
গল্পকন্যা


শাশুড়ী আসমা খাতুন সর্ব শক্তিতে পুষ্পর কোমল ফর্সা গালে চড় মেরেছে।

পুষ্প  চোখে যেন সরষে ফুল দেখছে। গালে জ্বালা অনুভব হচ্ছে। কোমল ফর্সা গালে লাল হয়ে আঙুলের ছাপ বসে গেছে। আরেকটা চড় পড়বে তখুনি হাত আটকে দেয় বাড়ির ছোটো ছেলে। 


পুষ্প গালে হাত রেখে নিচু মস্তকে,  চুপ করে সব দেখে যাচ্ছে। 


কলি বেগম মেয়েকে নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করছে, "হায় আল্লাহ...!বাড়িতে এ কোন অপয়ার আগমন হলো গো, একে একে বাড়ির ছেলে মেয়ে গুলোর জীবন নষ্ট করে দিচ্ছে। আমার বাচ্চা মেয়েটার একি হাল করে দিলো। এবার ওকে বিয়ে দিবো কিভাবে! অলুক্ষণে মেয়ে কোথাকার; তোর জীবনে কোনোদিন ভালো হবে না মুখপুরী ।"


বড়ো ভাইয়ের বিয়ের উছিলায় তিন দিনের জন্য বাড়ি এসেছিলো, কিন্তু সেই ভাইয়ের মৃত্যু-ই ওকে আটকে দেয়। তারপর থেকে বাড়িতে একের পর এক কান্ড দেখে নিশাত হতাশ।


বড়ো চাচিকে শাসানি দিতে মন চাইলেও, মায়ের চিৎকার চেঁচামেচিতে ছুটেছে বোনকে নিয়ে ।


বাড়ির সকলে মিলে ছোটাছুটি করে দ্রুত বিথীকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। প্রায় মাস খানিক লেগে যায় বিথীর হাত ঠিক হতে।


এ ঘটনার পর থেকে অপয়া শব্দটা পুষ্পর পাশে আরও জোড়ালো হয়ে বসে।


পুষ্পর সাথে কেউ ঠিক মতো কথা বলে না। সবাই এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। শুধু দু একজন ছাড়া।

________________________


সকাল দশটা।

সারাদিন ঘরে বসে থেকে থেকে পুষ্পর নিজেকে নিসঙ্গ মনে হয়। নিসঙ্গতা কাটাতে রুম থেকে বেরিয়ে নিচে আসে।


বাড়ির সকলে ব্যস্ত। কেউ চলে গেছে ভার্সিটিতে, কেউ চলে গেছে অফিসে আদালতে।কিছুক্ষণ সিঁড়ির কাছে দাঁড়ায়।  দেখতে পাচ্ছে কয়েকজন কাজের লোক ঘর দোর আসবাব পরিষ্কার করছে। পা বাড়ায় রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে।


রান্নাঘরে দরজায় পা রাখতেই বুঝতে পারে এখানেও ব্যস্ততার শেষ নেই। কেউ রান্না করছে, তো কেউ সবজি কাটাকুটি করছে; কেউ থালাবাসন ধুঁতে ব্যস্ত।


শাশুড়ী মা মনোযোগ সহকারে রান্না করছেন। চাচি শাশুড়ী এক মনে সবজি কাটতে ব্যস্ত। পুষ্প দরজায় দাঁড়িয়ে হাত কচলাতে কচলাতে বলে, "মা! চাচি! আমি কি আপনাদের সাহায্য করতে পারি!"


আকস্মিক পুষ্পর আগমনে সকলেই পুষ্পর দিকে তাকায়। আমতা আমতা করে পুষ্প একি বাক্যের পুনরাবৃত্তি করে।


সকলে যেন শুনেও না শোনার ভান করে আছে।

পুষ্প বুঝতে পারে সকলেই তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে তো কারো সাথে পুষ্পর সুসম্পর্ক গড়ে উঠার সুযোগ নেই। আর যাই হোক ও তো এখন এই পরিবারেরই একজন। তাছাড়া শুয়ে বসে থেকে একজন মানুষ কিভাবে দিনের পর দিন অতিবাহিত করতে পারে।


পুষ্প এগিয়ে যায়  কলি বেগমের কাছে, হাত বাড়িয়ে  বলে, "চাচী! ছুড়ি আর চপিং বোর্ডটা আমাকে দিন। আমি কেটে দিই। "

কলি বেগম আকস্মিক হেঁচকা টানে ছুড়িটা সরিয়ে নেয়, পুষ্পর সামনে থেকে। আকস্মিকতায় পুষ্প ভয়ে পেয়ে পিছিয়ে যায়।


পিছনেই ছিলো কিছুক্ষণ আগে নামিয়ে রাখা অর্ধেক কড়াই হালকা গরম তেল। জালি কাবাব ভাজার পর গরম তেল ভর্তি কড়াই ঠান্ডা হওয়ার জন্য, নিচে এক সাইডে রাখা হয়েছিল ।


পুষ্পর হঠাৎ করে পেছানো তে পায়ে লেগে কড়াইটা আচমকা কাত হয়ে পুরো তেল মেঝেতে ছিটকে পড়ে যায়। রান্না ঘরে উপস্থিত সকলের পায়ের বিভিন্ন জায়গায় জায়গায় সেই তেল ছিটকে পড়ে।


কলি বেগম চিৎকার করে উঠে, " কি অপয়া মেয়ে গো! কি অপয়া! এমন অলক্ষুণে মেয়ে আমার বাপের জন্মে দেখিনি। জীবনে কোনোদিন রান্না ঘরে এমন অঘটন ঘটেছে? হ্যাঁ, বড়ো ভাবি! বলেন? এ কেমন মেয়ে আনলেন বাড়িতে? রান্নাঘরে পা রাখতে না রাখতেই অঘটন ঘটে গেলো! আমার পা টা এক্কেবারে জ্বলে যাচ্ছে ..."


বাড়ির কাজের লোকজন যে যে ছিলো, সকলেই চিৎকার চেঁচামেচিতে ছুটে আসে। আসমা বেগমের চোখে মুখে রাগ ফুটে উঠেছে। কলি বেগমের চিৎকার ও চেঁচামেচিতে সকলেই ধরে নেয়; আসলেই মেয়েটি অলক্ষুণে বটে। যেদিকে যায় একটা না একটা অঘটন ঘটায়।


কাজের লোকেরা তাৎক্ষণিক আসমা বেগম ও কলি বেগমের পায়ে বরফ ঘষে, বার্নল লাগিয়ে দেয়। পুষ্প ভয়ে আতংকে চুপসে আছে। তার চেয়ে বেশি চুপসে আছে সকলের অবাক নয়নে ওর দিকে তাকানোতে। মনের মধ্যে একটা কথাই চাড়া দিয়ে উঠছে, উপস্থিত সকলেই ওকে অলক্ষুণে মেয়ে ভাবছে।

 

এদিকে নিজের পায়েও যে খানিকটা তেল ছিটে এসেছে। পায়ে জ্বালা করছে। তবে সে খেয়ালে সে নেই। পায়ের জ্বালা থেকে যে মনের জ্বালা বেশি হচ্ছে।


দেখতে লম্বা ও সুঠামদেহী, গৌড় বর্ণ গায়ের রঙ। প্রথম দেখায় তাকিয়ে থাকার মতো সুদর্শন যুবক নিশাত।

এলএলবি শেষ করে এখন ব্যারিস্টারি পড়াশোনার জন্য ইংল্যান্ড যাওয়ার প্রসেসিং করছে। এম্বাসি থেকে এসে বাড়িতে পা রাখতেই না রাখতেই  চিৎকার চেঁচামেচিতে  মেইন ডোর থেকে সোজা কিচেনের দিকে যায়।  কলি বেগমের একমাত্র ছেলে নিশাত এসব দেখে যার পর নাই অবাক। কোনো কিছু হলেই সকলে মিলে দোষটা এই মেয়েটার ঘাড়ে চাপায় কেন?


কাজের লোকদের ধমকে বলে, " কি ব্যপার! হা করে কি দেখছো তোমরা?ওনার পায়ে তেল ছিটকে পড়লো কিনা তা দেখো?"


কেউ এগিয়ে না যাওয়াতে নিশাত এগিয়ে যায়। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ফর্সা পা জোড়ার বেশ কয়েক জায়গায় লাল হয়ে আছে।জলে টইটম্বুর চোখ জোড়া। নিশাত কাজের মেয়ে তমাকে বলে, " তমা! ওনার পায়ে বার্নল লাগিয়ে দেও।"


এই মেয়ের প্রতি ছেলের এমন আদিখ্যাতা কলি বেগমের সহ্য হচ্ছে না। ছেৎ করে উঠে নিশাতের এ বাক্যে।


"বাবু তুমি বাড়িতে ক'দিনের জন্য আছো, বড়োদের ব্যপারে নাক গলিও না। এমন শিক্ষা কিন্তু আমরা তোমাকে দেই নি। "


কলি বেগমের স্বর ছাঁপিয়ে আসমা বেগম সকলের সামনে কর্কশ কন্ঠে বলে উঠেন, " ওর পায়ে বার্নল লাগানোর কোনো দরকার নেই। ওর উপলব্ধি করার দরকার, অন্য কারো ক্ষতি করলে, তাদের কতোটা যন্ত্রণা হয় ।" 


ফের সর্বসমুখে উচ্চস্বরে বলে, " শোনো মেয়ে...! ঘরের কোনো কাজে তোমার হাত লাগাবে না। এটা আমার আদেশ। আমার সংসারে আমার কথার অমান্য করবে এমন মানুষের স্থান নেই।"


নিশাত হতভম্ব হয়ে যায়, মা ও বড় চাচির আচরণে। কোনোদিন তাদের মুখের উপর কথা বলেনি। কিন্তু আজ যে মুখে কথা উঠে আসছে। মুখ খুলতে যাবে তখুনি পুষ্পর চোখ বেয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। ধীর পায়ে সঙ্গে সঙ্গে পুষ্প জায়গাটি ত্যাগ করে।


নিশাত শুধু অব্যক্ত রুপে চেয়ে থাকে। মেয়েটার জন্য বড্ড মায়া হয়। আসলেই মেয়েটা মন্দ ভাগ্য নিয়ে দুনিয়ায় এসেছে।


" কবিরা তাদের কাব্যে বলেছেন, অতন্ত সুন্দরী মেয়েদের ভাগ্য নাকি খারাপ হয়! এটাই হয়তো তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।

কেন বললেন এ কথাটা ? তারা যদি তাদের গল্পে কবিতায় এমন কথার প্রচলন না ঘটাতো, তবে হয়তো মেয়ে গুলোর সাথে মন্দ হলেও কেউ এ কথা বলে আফসোস করতে পারতো না। কোন কবি এ কথা বলেছেন? নিশাতের এ মুহূর্তে তাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে। " 


পুষ্পর থাকার কক্ষটি করিডোরের একেবারে শেষ মাথায়। আসলে প্রান্ত হাজারি নিরিবিলিতে থাকতে পছন্দ করতেন। তাই করিডোরের শেষ কক্ষটি তার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিলো। সেই সুবাদে পুষ্পর কক্ষ এটা। তার পাশের কক্ষটি পুষ্পর ননদের। সিড়ি ঘরের অপর পাশের কক্ষ গুলোর একটিতে নিশাত ও পর পর দুটি কক্ষে বিথী শিথী থাকে। ছাদেও একটি কক্ষ আছে; তালা বদ্ধ কক্ষ। সব সময় তালা ঝুলে থাকে।


মাঝে মধ্যে আসমা বেগমকে ঘরটি খুলে পরিষ্কার করতে দেখা যায়, তাও একদম নিজের হাতে। পুষ্পর কৌতূহল জাগে, কারো সাথে তেমন কথা বার্তা হয় না, তাই জিজ্ঞেস করতেও পারে না।


করিডরের শেষ মাথায় পুষ্পর কক্ষ সংলগ্ন  একটা বড়ো রকমের ঝুল বারান্দা আছে। একদম খোলা বারান্দা। মিনি সাইজের ছাদ ও বলা চলে এটাকে । বারান্দায় বেতের ছোটো ছোটো সোফা ও একটি সেন্টার টেবিল রাখা আছে। অবসরে কেউ কেউ এসে বই পড়ে, চা খায়, আড্ডা দেয়।


 নিচের বাগান থেকে বাগানবিলাসির ঝোপড়ালো ডাল পালা গুলো দোতালার এই বারান্দায় উঠে এসেছে। কিছু ডালপালা আবার পাশেই পুষ্পের কক্ষ সংলগ্ন ছোট্ট বারান্দা ছুঁয়ে গেছে। যখন বাতাস বইতে থাকে, তখন বাগান বিলাসীর রঙিন পাপড়ি গুলো তিরতির করে  কাঁপতে থাকে।


দিনের এবং রাতের অনেকটা সময় পুষ্প তার রুমের ছোট্ট বারান্দায় রকিং চেয়ারটায় বসে কাটায়। কখনো এই বড়ো বারান্দায় বসে কোন এক বইয়ের পাতায় ডুবে যায়। ডুবে যায় বইয়ের পাতায় লেখা অদৃশ্য কারো জীবনিতে। কখনো কখনো বাগানবিলাসীদের মৃদু বাতাসে চোখ মুদে আসে। স্থান কাল ভুলে, সেখানেই নিদ্রা যায়।


ওর কক্ষ থেকে বাগানটা পুরোপুরি দেখা যায় না। ছাদের একটা অংশ দেখা যায় শুধু। পুষ্পর যখন খুব বেশি একা লাগে, তখন করিডোরের ঝুল বারান্দায় আসে। একটা বেতের চেয়ার টেনে রেলিং ঘেঁষে বসে। নিচের সুবিন্যস্ত বাগানে উঁকি দিয়ে। বাগানের সবুজ, সবুজের মাঝে রঙ বেরঙের পুষ্পের মেলা দেখে। কান পেতে শোনার চেষ্টা করে বাতাসের শব্দ, পাখির কিচির মিচির। যদিও ঢাকা শহরে যানজটের শব্দ-ই ভেসে আসে দুর দুরান্ত থেকে। তবুও বাতাসের সাথে এই বাগানবিলাসির পাতা ঝাপটানো, কোন লজ্জাবতীর তিরতির করে  কাপঁতে থাকা ঠোঁটের ন্যায় কাঁপতে থাকা রঙিন ফুল গুলো দেখতে ওর ভিষণ ভালো লাগে।

______________________


দুপুর দু'টো।

পুষ্পর প্রচন্ড খুদা লেগেছে। নিচে যেতেই দেখে ডাইনিং এ মধ্যাহ্ণ ভোজন চলছে। সকলে এমন ভাবে বসে খাচ্ছে যেন পুষ্পর উপস্থিতি কেউ টেরই পায়নি। কিয়ৎক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পরে পুষ্পর নিজেকে কেমন আত্মসম্মানহীন মানুষ বোধ হচ্ছে। কালবিলম্ব না করে চলে আসে নিজের কক্ষে।


এসব কিছু চোখ এড়ায়নি নিশাত হাজারির।

নিশাত হাজারি কিছুটা কর্কশ স্বরে খাবার টেবিলে উদ্দেশ্য বিহীন ফাঁকা বুলি আওড়ায়....


চলবে....


নিশাত হাজারি পুষ্পর হয়ে কিছু বলবে কি?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।