তোর সমীপে (পর্ব-০১) - গল্পকন্যা

তোর সমীপে (পর্ব-০১) - গল্পকন্যা
তোর সমীপে (পর্ব-০১) - গল্পকন্যা


তোর সমীপে (পর্ব-০১)
গল্পকন্যা


১.

"এ্যাই!রেড চেরি, শোনো না!

আমাদের ওয়েডিং নাইটে আমি তোমাকে একদমি ঘুমাতে দিবো না।"


"কেন?কেন?"

"কেন আবার সারারাত জেগে থাকবে...!"

"একদমি না!আমি ঘুমিয়ে যাবো।"

"হুঁ...!পারলে তো!"

"পারবো না কেন?খুব পারবো?আমার ঘুমোতে ইচ্ছে হবে,আর আমি বিছানার মধ্যিখানে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে যাবো।আসে পাশে কেউ এলে এক ব্যাটে ছক্কা মেরে বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে দেবো।"

"তাই?

পারবে না!


এমন ভালোবাসবো যে ঘুমের কথা ভুলেই যাবে।সে রাত হবে একেবারে স্বপ্নের মতো...!"


"ঠিক বলেছেন,কারণ আপনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখবেন।"

"নাহ গো...!রেড চেরি নাহহহ!সে দিনটা এলেই বুঝতে পারবে,একেবারে টুপ করে গিলে ফেলবো....!"

"ছিহহহহ!কি অশ্লীল!"

——————

আজকে পুষ্পর বিয়ে হয়েছে।


বিয়ে পড়ানোর কার্যক্রম শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর পরই ওর মান্থলি প্রবলেম শুরু হয়েছিলো।কষ্টে শিষ্টে কোনোভাবে হাঁটাচলা করে গেছে।

বাসর ঘরে বসিয়ে রেখে ননদ আর জায়েরা বিভিন্ন ধরনের অশ্রাব্য কথা নিয়ে হাসি তামাশা করে গেছে।তাদের মতে তারা বুঝিয়ে দিয়ে গেছে তার করণীয় কি।

এ সব কথোপকথন গুলো পুষ্পর কর্ণকুহরে জ্বালা ধরার মতো ঠেকছিলো।অতিরিক্ত লজ্জায় গা ঘিন ঘিন করছিলো।ইচ্ছে করছিলো বলতে,"এখুনি বেরিয়ে যান রুম থেকে!"কিন্তু না! তা বলা সাজে না।

কাঠপুতুলের ন্যায় নিচু মস্তকে বসেছিলো।বেশ কিছুক্ষণ তাদের হাসি তামাশা চলার পর বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।আর তখুনি হাফ ছেড়ে বাঁচার বদলে পুষ্পর ভিষণ ভয় লাগতে শুরু করে।

মনে পড়ে যায় পুষ্পর ভার্সিটির ফ্রেন্ড তাহার কথা।কিছুদিন আগেই বিয়ে হয়েছিলো তাহার। বিয়ের পর প্রথম যেদিন দেখা হয়,সেদিন কান্না ভেজা কন্ঠে পুষ্পকে বলেছিলো বাসর রাতের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা।তাহার হাসবেন্ড নাকি সেই রাতেই জোর-জবর্দস্তি করেছিলো।

সেসব কথা মনে হতেই ভয়েরা মারাত্মক ভাবে পুষ্পর গলা টিপে ধরেছে।অতিরিক্ত চিন্তা আর ভয়ে নিশ্বাস নিতে পারছে না।কেবলি মনে হচ্ছে," আমার সাথেও এমনটি হতে যাচ্ছে না তো?"এসব ভেবে ভেবে যখন ভিষণ আতংকগ্রস্থ। বারবার মনে নানা ধরনের উল্টা পাল্টা চিন্তা ভাবনা উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে।এই মুহুর্তে পুষ্পর আসফাক উদ্দিনের প্রতি থাকা রাগটা বেড়ে,কয়েক শতগুণ হয়ে গেছে।

কেবল-ই মনে হচ্ছে,"বাবা কিভাবে এমন করতে পারলো আমার সাথে! একটা বার আমার ইচ্ছের কথা ভাবলো না! আমার কথা শুনলে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেতো?আজ যে  এ ঘরে আমার দেহটা আছে,মন সে তো কবেই অন্যের হয়ে গেছে।

অচেনা আজানা একটা মানুষের সাথে কিভাবে বিয়ে দিয়ে দিতে পারলো ?সন্তানের এতো আকুতি,এতো যন্ত্রণার একটু কি বাবার চোখে পড়লো না?

বাবা হিসেবে তুমি ব্যর্থ আসফাক উদ্দিন!মেয়ের জীবনে খুশির বদলে,কান্নাকে তার সঙ্গী করে দিয়েছো।আজকে যদি বর রূপি পুরুষটা আমার সাথে অমানবিক কিছু ঘটায়,কোনোদিন তোমাকে ক্ষমা করবো না।কোনোদিন বাবা বলে ডাকবো না!"


এসব ভাবতে ভাবতে পুষ্প কখন ঘুমিয়ে পড়েছে টেরই পাইনি।


"আমার পিরিয়ড চলছে...,

দয়া করে...ক'টা দিন সময় দিন।"


"কিসের সময়?কোনো সময় দেয়া যাবে না।আজকে আমাদের বিয়ের প্রথম রাত,আর তুমি কোন পিচ্চি খুকি না,সেই হিসেবে এতো ভনিতা করার কিছু নেই।কো-অপারেট উইথ মি! "

"আমি তো আপনারই স্ত্রী,আর সেটা তো একদিনের জন্য নই।সারাজীবনের জন্য।দয়া করে..."


এসব অনুরোধের কোনোটাই প্রান্তর কর্ণকুহরে পৌঁছাচ্ছে না।আজ ওদের বাসর রাত,এ রাতটা প্রান্ত কিছুতেই বিফলে যেতে দিবে না।


ঝাঁপিয়ে পড়ে কোমল নারী দেহের উপর।যেন খুবলে খুবলে কোন হায়েনা হরিণ সাবকের মাংস গো গ্রাসে গিলে যাচ্ছে।পুষ্পর পেটে তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে।ভয়ংকর যন্ত্রণায় উন্মাদের মতো চিৎকার করছে....।

পুষ্পর মনে হচ্ছে পৃথিবীতে কেবল মাত্র ওর সাথেই এমন অমানবিক ঘটনা ঘটছে!হায় কি কপলা!বাসর রাতে নিজ স্বামীর দ্বারা এমন পাষবিক হিংস্রতার শিকার হচ্ছে ।"ঘুমের মধ্যে এ ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে পুষ্প ধরফরিয়ে উঠে বসে।

পরক্ষণেই বুঝতে পারে এতোক্ষণ ভয়ংকর এক স্বপ্নে বিভোর ছিলো। উপলব্ধি করে পুরো তলপেট জুড়ে চিনচিনে সূক্ষ্ম ব্যথারা ছেয়ে আছে।ধীরে ধীরে-ই তা প্রচন্ড ব্যথাতে রূপান্তরিত হচ্ছে।তীব্র ব্যথায় যেন শরীরে জ্বর জ্বর অনুভূত হচ্ছে।

এ অবস্থায় শরীরের উপর দিয়ে কতো ধকল গেছে।সে জন্য হয়তো ব্যথাটা এমন তীব্র হচ্ছে।এ মুহূর্তে একটা পেইন কিলার  কিংবা হট ওয়াটার ব্যাগ পেলে ভালো হতো।

ব্যথায় এবার চোখ দিয়ে পানি বের হবে মনে হচ্ছে।কিছুতেই বসে থাকা যাচ্ছে না।নড়তেই মনে হচ্ছে পড়নের লেহেঙ্গাটা বেখেয়ালিতে নষ্ট হয়ে গেছে।

ব্যথা ভুলে যতোটা দ্রুত সম্ভব ওয়াশ রুমে যেয়ে লেহেঙ্গা পরিবর্তন করে।ভেজা লেহেঙ্গাটা বারান্দার স্টেন্ডে মেলে দিয়ে পাশে তাকাতেই দেখে,সেরোয়ানী পরিহিত অতন্ত সুদর্শন স্বামী নামক পুরুষটি রকিং চেয়ারে বসে বসে ঘুমাচ্ছে।


এতোক্ষণ ও ভুলেই গিয়েছিলো,আজকে ওর বিয়ে হয়েছে।ও ওর স্বামীর বাড়িতে তারই ঘরে অবস্থান করছে।


এই প্রথম দেখেছে লোকটাকে।কিন্তু মনের মধ্যে বিন্দু পরিমাণ ভাবাবেগের তাড়িত নেই।

কিন্তু মানবতার খাতিরে এটা ভেবে খারাপ লাগছে যে ওর জন্য লোকটা নিজের ঘর রেখেও বারান্দায় শুয়ে আছে।আরও একটা ব্যপার ওর কাছে স্পষ্ট।

হয়তো লোকটা ওর মতই ওকে মন থেকে মেনে নিতে পারছে না।অবশ্য তাতে ওর বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই।


আর না ভেবে রুমে চলে আসে।


চোখে আলো পড়তেই প্রান্তর ঘুম ছুটে গেছে।সিগারেট খেতে খেতে কখন যে চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পারেনি।উঠে রুমের ভিতরে যায়।

ওর নব বিবাহিতা স্ত্রীকে কিছু কথা জানানো প্রয়োজন। যতোক্ষণ না বলতে পারছে ততোক্ষণ এক প্রকার অপরাধ বোধে ভুগছে।তাছাড়া ওর হাতে বেশিক্ষণ সময়  নেই।


"আমি বিবাহিত...,পূর্ব থেকেই....!"

আকস্মিক পুরুষালি কন্ঠের বাক্যলাপে চমকে তাকায়।


প্রান্ত ফের বলতে শুরু করে,"বাবার প্রেশারে এ বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি।ছয় মাসের পূর্বে ডিবর্স দেয়ার সিস্টেম নেই।তাই ছয় মাস পর তোমাকে ডিবর্স দিবো।ততোদিন অপেক্ষা করতে হবে।

তুমি এ বাড়িতে থাকো।আমি না বলা পর্যন্ত  কাউকে কিছু জানিও না।সময় হলে আমি-ই জানাবো।আর হ্যাঁ ততোদিন তোমার সব কিছুর দ্বায়িত্ব্য আমার।জানি একটা মেয়ের পক্ষে এটা কোনো সহজ ব্যপার না।

 আমি দুঃখীত তোমার জীবন নষ্ট করে দেয়ার জন্য।পারলে আমাকে ক্ষমা করো।আমি নিরুপায় হয়ে বিয়েটা করেছি।আমি অলিভিয়াকে অনেক ভালোবাসি।ওকে ভুলে থাকা আমার পক্ষে পসিবল না।"

পুষ্প সম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।নিজের কানকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না।যা শুনছে সব সত্যি শুনছে তো!বুকে প্রচন্ড জ্বালা অনুভব হচ্ছে।কিন্তু চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল পড়ছে না।

সেরোয়ানির পকেট থেকে একটা কার্ড আর কাগজ বের করে পুষ্পর দিকে বাড়িয়ে দেয়,"এই যে এই কার্ডটা রাখো।আমি ভোরের ফ্লাইটে লন্ডন চলে যাচ্ছি।আমার স্ত্রীর কাছে। আমার সাথে যোগাযোগ করার মাধ্যম লেখা আছে,কোনো দরকার পরলে যোগাযোগ করো।বন্ধুর মতো তোমার পাশে থাকবো।"

পুষ্প বুঝতে পারছে না।ওর জীবনের সাথে কি পুতুল খেলা হচ্ছে? মুখের কথা যেন সরে গেছে, কোনো কথাই ফুটছে না।একের পর এক শকে ভেতরটা কেমন শক্ত খোলসে আবৃত হয়ে যাচ্ছে।

মাত্র-ই ওর চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেলো এগারো ঘন্টা আগে কবুল বলে বিয়ে করা ওর স্বামী।

মনে পড়ছে সেই মানুষটাকে যে ওর মন ভালো করার জন্য কতো কথাই না বলতো।

শেষ যেদিন রাতে ওদের মধ্যে কথা হয়েছিলো।এই বাসর রাত নিয়ে কথা হয়েছিলো।আর আজ এ কেমন বাসর রাত যাপন করছে!


কথা গুলো এখনো কানে বাজছে,

"এ্যাই!রেড চেরি, শোনো না!

আমাদের ওয়েডিং নাইটে আমি তোমাকে একদমি ঘুমাতে দিবো না।"


"কেন?কেন?"

"কেন আবার সারারাত জেগে থাকবে...!"

"একদমি না!আমি ঘুমিয়ে যাবো।"

"হুঁ...!পারলে তো!"

"পারবো না কেন?খুব পারবো?আমার ঘুমোতে ইচ্ছে হবে,আর আমি বিছানার মধ্যিখানে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে যাবো।আসে পাশে কেউ এলে এক ব্যাটে ছক্কা মেরে বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে দেবো।"

"তাই?পারবে না।


এমন ভালোবাসবো যে ঘুমের কথা ভুলেই যাবে।সে রাত হবে একেবারে স্বপ্নের মতো...!"


"ঠিক বলেছো,কারণ তুমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখবে।"

"নাহ গো...!রেড চেরি নাহহহ!সেদিনটা এলেই বুঝতে পারবে,একেবারে টুপ করে গিলে ফেলবো....!"

"ছিহহহহ!কি অশ্লীল!"

"স্ট্রেঞ্জ!অশ্লীলতার কি দেখলে এখানে?এটা ন্যাচারাল ব্যপার?আর সবারই ওয়েডিং নাইট নিয়ে কিছু না কিছু ইচ্ছে থাকে।"


ফোনের এপাশে তখন লজ্জাবতী লতার ন্যায় চুপসে গিয়েছিলো পুষ্প।মুখের কথা ফুটছিলো না।কথারা গালের সাথে আটকে গিয়েছিলো।

সেটা বুঝতে পেরে পরিস্থিতি সাভাবিক করার জন্য বলেছিলো,"আচ্ছা...ঠিক আছে, এটা বলো যে,বাসর রাত সম্পর্কে তোমার ওপিনিয়ন কি?তোমার হাসবেন্ডের সাথে কিভাবে কাটাবা?"

খানিকক্ষণ চুপ থেকে পুষ্প মজার ছলে বলেছিলো,"কিভাবে আবার!বাসর রাত অন্য সব রাত থেকে আলাদা।ফুল দিয়ে সাজানো বিছানায় ঘুমানো যাকে বলে।ভাবেন  আপনি ঘুমাচ্ছেন,আপনার চারপাশে ফুলের তীব্র ঘ্রাণে মম করছে।ঘুমের মধ্যেও এক রকম স্নিগ্ধতা আপনাকে গ্রাস করে রেখেছে,আহা...!কি ফ্যান্টাস্টিক ব্যপার!"


"তার মানে,তুমি তোমার বাসর রাত ঘুমিয়ে কাটাবা?"


"হ্যাঁ!

ঘুমাবো-ই তো!

এমন সুন্দর বিছানায় কে না ঘুমাতে চাইবে বলেন।আমি যেমন সারাদিনের ঝামেলার পর ক্লান্ত থাকবো,সে ও থাকবে।সো দুজনেই নাক ডেকে ঘুম দিবো!"


"হুম বুঝলাম!"

"কি বুঝলেন!"

"কি আবার? তোমার জামাইর কপাল পোড়া!বাসর রাতে বউয়ের চাপে দাড় টানতে হবে।"

"দাড় টানতে হবে মানে?"

"মানে নাক ডাকতে হবে!"


সেই কথা শুনে পুষ্প হাসতে হাসতে বিছানায় গড়াগড়ি খেয়েছিলো।হাসার এক পর্যায়ে ওর পেটে খিল ধরে গিয়েছিলো।অপর পাশ থেকে মানুষটা মুগ্ধ হয়ে হাসির কলধ্বনি শুনে গিয়েছিলো।

এতোক্ষণে পুষ্পর চোখের কোণ ঘেঁষে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো।ভেতরটা যে না পাওয়ার তীব্র ব্যথায় হুঁ হুঁ করে উঠছে।


চলবে কি আপনারা বলুন?

পর্বঃ ০২ পড়ুন


পুষ্পর এই অনিশ্চিত জীবনে কি ঘটতে চলেছে?কি হবে ওর সাথে?কে হবে ওর পথচলার সঙ্গী ?

জানতে চাইলে রেসপন্স দিন।ধৈর্য্য সহকারে সাপোর্ট দিন।আপনাদের সাপোর্ট পেলেই কেবল নিয়মিত গল্প আসবে।আর হ্যাঁ স্টিকার কমেন্ট করবেন না।গল্প সম্পর্কে মতামত জানাবেন।


(ভুলগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো।)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।