প্রাক্তন (পর্ব ১০)

প্রাক্তন (পর্ব ১০)
প্রাক্তন (পর্ব ১০)

প্রাক্তন (পর্ব ১০)
মিশিতা চৌধুরী


তিন্নি কথা বলা শেষ করে আমার কাছে এসে বলল-- "ভাইয়া মুন কল করেছে ও জ্যামে আটকা পড়েছে আসতে আরো কিছুক্ষণ লাগবে।"


প্রায় এক ঘন্টা পর মুন আসলো।আমি আড়ালে থাকায় দেখতে পায় নি। তিন্নির কাছে গিয়ে বসলো--

-অবশেষে আমাদের রাণীর দেখা মিললো!!!!

-এভাবে বলিস না প্লীজ। বিয়ের পর এতোটা ব্যস্ত হয়ে গিয়েছি বুঝতে পারি নি কিভাবে এত্তোগুলো মাস কেটে গেল।

-হুম। ভালোবাসার মানুষ সাথে থাকলে আর কি লাগে! 

তন্ময় বললো---ইসসস।এমন একটা মানুষ যদি আমি পেতাম।

তিন্নি---তোর মতো হুতুম পেঁচার প্রেমে কেউ পড়বে না।

তন্ময়--আমি হুতুম পেঁচা হলে তুই কি!!! শেওড়া গাছের পেত্নী একটা।

তিন্নি---তন্ময়ের বাচ্চাআআআআআ।  

তন্ময়---ছি। আমার মতো নাবালক ছেলেকে এতো বড় অপবাদ!!

তিন্নি--কিরে মুন এসে এমন  চুপচাপ হয়ে গেলি। কোনো কথা বলছিস না।কোনো সমস্যা হয়েছে বাসায়?

মুন মুখটা মলিন করে বললো, না সব ঠিক আছে রে।

-তবে তোকে এমন বিষন্ন দেখাচ্ছে কেন? ভাইয়ার সাথে কিছু হয়েছে?

-না ওনার সাথে কখনো কিছু হবে না।

-মানে ? বুঝলাম না 

-তিন্নি আমার ভাগ্য এতো খারাপ কেন দোস্ত? নিজের ভালোবাসার মানুষের পাশে থেকেও যেন যোজন যোজন দূরে আছি।আমি হয়তো রাশেদের ভালোবাসা কখনো পাবো না রে ।ওর মনে অন্য কেউ অনেকটা জুড়ে আছে। সেখানে আমার কোনো জায়গা নেই। রাশেদ জোরে করে অনিচ্ছাকৃত ভাবে থাকছে আমার সাথে। এ থাকার মধ্যে কোনো ভালোবাসা,মায়া কিছুই নেই। আমি বুঝতে পারছি আমি অযাচিত ভাবে রাশেদের জীবনে ঢুকে পড়েছি।

-মুন তুই এতো ভেঙ্গে পড়িস না তো।তুই তো সবসময় পজিটিভ ভাবতে শিখিয়েছিস আমাদের। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়া তোর কাছেই শেখা।

-হুম । আল্লাহর উপর ভরসা করে কাটিয়ে দিচ্ছি।

-আচ্ছা তোর আর রাশেদ ভাইয়ার কিভাবে বিয়ে হলো দেখা হলো বললি না তো।

-সে অনেক কাহিনী। শোন তবে । আমি একদিন রাশেদকে দেখার জন্য ওর অফিসের সামনে গেলাম। অনেকক্ষণ পর সে অফিস থেকে বের হলো।দেখে কেমন যেন লাগছিল। মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আছে। দুই কদম পা ফেলতেই মাথা ঘুরে পড়ে যায়। কয়েকজন লোক এসে ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। খুব কান্না পাচ্ছিলো। তখন একটা গাড়ি এসে ওকে নিয়ে যাচ্ছে।আমি অন্য একটা গাড়ি নিয়ে রাশেদের গাড়িটা অনুসরণ করতে করতে ওর বাড়ি অবধি পৌঁছে যাই। কিন্তু ভেতরে ঢুকবো কি করে। ও কেমন আছে তা জানার জন্য মনটা কেমন ছটফট করছে। বেশ কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ দেখলাম অফিসের কয়েকজন কর্মচারী রাশেদকে দেখতে এসেছে।আমি ওদের সাথে মিশে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লাম। এর মধ্যে ডাক্তার এসে গেছে। তিনি বললেন কয়েকদিন খাওয়ায় অনিয়ম হওয়ায় এমন মাথা ঘুরে পড়ে গেছে।

আমি চুপটি করে মুনের সব কথা শুনছি। একটা মানুষ আমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।আর আমি কিনা.....

তিন্নি বলে উঠলো,"তুই যে ভেতরে ঢুকলি ওনারা কেউ বুঝতে পারে নি?

-বলছি।রাশেদকে দেখে অফিসের লোকদের সাথে বেরিয়ে আসবো এমন সময় রাশেদের আম্মু বলল,"তুমি একটু থাকো মা তোমার সাথে আমার কথা আছে"।

ভয়ে বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো।ধরে ফেলল নাকি আমায়। আমি আল্লাহকে ডাকছি। উনি এসে আমার হাত ধরে সোফায় বসালেন। তারপর আমি কি করি, আমার ফ্যামিলি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। ওনার কথা শুনে বুঝলাম উনি আমায় সন্দেহ করে নি। নিজেকে বড্ড ছোট মনে হলো।এমন একটা ফেরেশতার মতো মানুষকে মিথ্যা বলা ঠিক হবে না। আমি সব সত্যি বলে দিলাম। আমার কথাগুলো শুনে উনি আমার মা বাবার নাম্বার চাইলেন। পরের দিন সকালে দেখলাম উনি আমাদের বাসায়। মা বাবার সাথে কথা বলছে বিয়ে নিয়ে।তারপর আর কি। পরের ঘটনা গুলো তো জানিস।


-বাহ! খুব ইন্টারেস্টিং বিয়ে। আল্লাহ কত সহজে তোদের এক করে দিলো।

-হুম। আচ্ছা রাশেদ ভাইয়া জানেন তুই যে ওনাকে এতো ভালোবাসিস?

-না রে দোস্ত। যার মনে আমার জন্য কিঞ্চিত পরিমাণ  ভালোবাসা নেই তাকে ভালোবাসার কথা বলে নিজের ভালোবাসাকে ছোট করতে চাই না। তার কাছে আমার এই ভালোবাসা অর্থহীন।

-এই কয়মাসে একটুও কি রাশেদ ভাইয়া পরিবর্তন হয় নি?

-হুম আগের চেয়ে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। আগের চেয়ে  কেয়ার করে, খোঁজ খবর নেয়।

-তাহলে বললি যে তোকে ভালোবাসে না!

-ভালোবাসা আর খোঁজ খবর নেওয়া একই না দোস্ত।হয়তো এক ছাদে থাকি বলে দায়িত্ব পালন করছে। নিজের কর্তব্য গুলো করে যাচ্ছে।তাতে কোনো ভালোবাসা নেই।কোনো মায়া নেই।কোনো প্রেম নেই।


আমি এতোক্ষণ ধরে মুনের সব কথা শুনছিলাম। মুনের বলা প্রতিটা কথা সত্য। নিজের প্রতি খুব ঘৃণা হচ্ছে।আমি একটা মানুষকে এতোটা কষ্ট দিলাম কি করে!!

নিজেকে আর সামলাতে না পেরে ওদের কাছে গেলাম।মুন আমায় দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো।


-রাশেদদদ। আপনি এখানে!!!

-হুম।আমি ।

-আপনি এখানে কি করছেন?

-আপনার মনের ভেতরের জমে থাকা কথাগুলো শোনার জন্য এখানে এসেছি। 

-কিন্তু আপনি কিভাবে জানলেন আমি এখানে?

-আমি ওদেরকে আসতে বলেছি এখানে।

-মানে কি?এসব আপনার প্ল্যান ছিল?

-জি ম্যাডাম সবটাই আমাদের তিনজনের প্ল্যান।

-কেন করলেন এমন?আমায় একটি বার জানানোর প্রয়োজন মনে হলো না?আমি কি এতোটাই পর?


তিন্নি বললো,"তুই ভাইয়াকে ভুল বুঝছিস মুন।

মুন রেগে গিয়ে বলল----আমি ভুল বুঝছি?কোনটা ভুল আমার? আমার জন্য কোনো ভালোবাসা নেই ওনার মনে। শুধু করুনা করে গেছেন। নিজের কর্তব্য পালন করছেন।

-মুন আপনি প্লীজ শান্ত হোন। আপনি এমন রেগে যাবেন না। আমি তো আপনাকে.....

-থাক রাশেদ বাকিটা বলতে হবে না। আপনি আমাকে কোনোদিনও ভালোবাসতে পারবেন না।আপনি অন্য কাউকে ভালোবাসেন এটাই তো বলবেন!!

আমি মুনকে চিৎকার করে বললাম,"আমি আপনাকে ভালোবাসি মুন।"

মুন স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে বলে উঠলো,"এসব কি বলছেন?"

আমি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম মুনের সামনে। ওনার দিকে একট গুচ্ছ গোলাপ দিয়ে বললাম,"হুম সত্যি বলছি আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি।আপনাকে ছেড়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি আপনার সাথে সারাজীবন কাটাতে চাই। প্লীজ মুন আমায় ছেড়ে কোথাও যাবেন না। আমার ভালোবাসা গ্ৰহণ করুন। ফিরিয়ে দেবেন না।

মুন আমায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো।

-রাশেদ আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি। আপনার জন্য মনের সিন্দুকে একটু একটু করে ভালোবাসা গুলো জমিয়ে রেখেছি। আপনি ভাবতেও পারবেন না কতটা ভালবাসি আপনাকে। 

মুনের চোখের পানি মুছে দিয়ে বললাম,এই চোখে আর কখনো কান্না দেখতে চাই না। আপনি জানেন হাসলে আপনাকে কত সুন্দর লাগে? মোনালিসার ছবি যিনি এঁকেছেন তিনি যদি আপনাকে দেখতো তাহলে মোনালিসাকে ছেড়ে আপনার ছবি আঁকতো।

-শুনুন এসব কথা বলে আমায় পটানোর চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই।আমি এতো সহজে আপনার ফাঁদে পা দিচ্ছি না। 

আমি তিন্নি আর তন্ময়কে ইশারা দিলাম। ওরা এসে একটা কাপড় দিয়ে মুনের চোখ বেঁধে দিলো।

-কি হলো আমার চোখ বাঁধলি কেন তিন্নি! রাশেদ কোথায় আপনি?আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?

মুনের হাতটা ধরে বললাম.........


***চলবে***

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।