প্রাক্তন (পর্ব ১৩)

প্রাক্তন (পর্ব ১৩)
প্রাক্তন (পর্ব ১৩)

প্রাক্তন (পর্ব ১৩)
মিশিতা চৌধুরী


--রাশেদ তোমার সাথে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগলো। তোমাদের মেয়েটাও খুব মিষ্টি।

--হুম আমার মুনিয়া মামুনি একদম ওর মায়ের মতোই হয়েছে।

"বাবাই আসো না তাড়াতাড়ি প্লীজ। মাম্মাকে ছাড়া ভালো লাগছে না।

আসছি বলে গাড়িতে উঠে চলে এলাম।

পরের দিন সকাল বেলায় মুনকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আমি কলেজে গেলাম। একটু পরে ঋতু এসে বলল---

--রাশেদ তোমার সাথে একটু কথা বলা যাবে?

--হুম কিন্তু আমার একটা ক্লাস আছে ওটা শেষ করে আসি।

--আচ্ছা ঠিক আছে।

ক্লাস শেষে কেন্টিনে গেলাম। ঋতু বসে আছে। জিজ্ঞেস করলাম--

--কেমন লাগছে নতুন জায়গায়?

--হুম ভালোই।মন ভালো করার জন্য জায়গা টা একদম পারফেক্ট।

--হুম। ঠিক বলেছ।

--আচ্ছা তুমি তো তোমাদের বিজনেস জয়েন করেছিলে। হঠাৎ এই প্রফেশনে কিভাবে?

--আমার স্ত্রীর ইচ্ছেতে আসা।

--ওহ আচ্ছা।

--তোমার কেমন কাটছে দিনকাল?স্বামী কি এখন বাইরে আছে নাকি দেশে?

--স্বামী!!! এই শব্দটা আমার জন্য নয়।

--কেন কি হয়েছে? ঋতু তুমি ঠিক আছো তো?

--হুম।


ম্যাডাম আপনাকে প্রিন্সিপাল স্যার ডাকছেন।

--রাশেদ আমি আসছি এখন।

কলেজ ছুটির পর বাসায় ফেরার জন্য বের হলাম। ঋতু বলল---

--রাশেদ যদি কিছু মনে না করো তবে এক কাপ কফি খেতে পারবে আমার সাথে?

--হুম।

আমি আর ঋতুর পাশের একটা ক্যাফেতে গিয়ে দুটো কফি অর্ডার করলাম।

--আচ্ছা তখন বললে স্বামী শব্দ তোমার জন্য না। শিশিরের সাথে কিছু হয়েছে নাকি?

--শিশিরের কথা তোমার মনে আছে?

--হুম অবশ্যই।

--সে অনেক কাহিনী।পরে কখনো বলবো।

--আজকেই বলো।সময় সবচেয়ে মূল্যবান। হয়তো পরে কখনো আর সময় পাবো না শোনার।

--কেন শোনার সময় পাবে না?

--বলা তো যায় না মানুষের জীবনে কখন কি ঘটে যায়। আল্লাহ কার ভাগ্যে কি রেখেছেন তিনি জানেন‌।তাই যতটা সময় পাওয়া যায় উপভোগ করে নেওয়া উচিত‌।যা কিছু ভালো কাজ  সব করে নেওয়া উচিত। এবার বলো কি হয়েছে তোমার? কোন কাহিনীর কথা বলছো।জানতে চাই আমি।


আচ্ছা বলে আনমনে ঋতু কিছু একটা ভাবলো।তারপর বলা শুরু করলো---

--সেদিন তোমার বিয়েতে আসতে চেয়েছিলাম। নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুর স্মরনীয় দিনের সাক্ষী হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে নি।গ্ৰামে যেতে হয়েছে। চারদিন পর গ্ৰাম থেকে আসার সময় গাড়িটা খারাপ হয়ে যায়। উপায় না পেয়ে বাসে চড়ে আসছিলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা ট্রাকের ধাক্কায় বাসটা উল্টে যায়।সবাই কমবেশি আহত হয়।চারজন মা*রা যায়। আমি খুব গুরুতরভাবে আহত হই । কাছের একটা হাসপাতালে আহতদের ভর্তি করানো হয়। দূর্ঘটনার পর পরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।তিনদিন পর আমার জ্ঞান ফেরে।আম্মু আর বাবা পাশে বসে কান্না করছে। বুঝতে পারছিলাম খারাপ কিছু হয়েছে। একটু সুস্থ হওয়ার পর অন্য একটা হাসপাতালে নেওয়া হয়।আম্মুকে বার বার জিজ্ঞেস করেছিলাম কি হয়েছে আমার?আমি তো  সুস্থ হয়ে গিয়েছি।অন্য হাসপাতালে কেন নেওয়া হচ্ছে।আম্মু বলেছিল ছোট একটা অপারেশন করাতে হবে।

ওই অপারেশনটা শেষ হওয়ার পর প্রায় একমাস হাসপাতালে ছিলাম। একমাস পর বাসায় গেলাম। বাসায় যাওয়ার পর সবাইকে কেমন যেন মনে হতে লাগলো।মনে হচ্ছে সবাই কিছু লুকিয়ে যাচ্ছে।এভাবে দিনগুলো যাচ্ছে।ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হতে লাগলো। ক্লাস টিউশন পড়াশোনা আর সাথে শিশির। সব মিলিয়ে ভালোই কাটছে। একদিন সকালে শিশির কল দিয়ে বলে আগামী সপ্তাহ সে দেশে আসবে। তারপর বিয়ের  কথা বলবে।তার কিছুদিন পর শিশির দেশে আসলো।মা বাবার সাথে ফোনে কথা বলল। আগেই অবশ্যই আম্মু আর বাবাকে  বলেছি শিশিরের কথা।কোনো রিয়েক্ট করে নি। খুব অবাক হয়েছিলাম।এমনতো হওয়ার কথা না। বাবার তো রেগে যাওয়ার কথা।ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত লাগলো।পরের দিন ঠিক হলো ওরা আমাদের বাসায় আসবে। যেদিন আসবে সেদিন আমার একটা পরীক্ষা থাকায় সকাল সকাল বেরিয়ে গিয়েছিলাম।দুপুরে বাসায় এসে দেখি দুপক্ষের কথা কাটাকাটি হচ্ছে। ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম । বাবা কি ওদের  সাথে রাগ দেখিয়ে কিছু বলেছে!! ভয়ে ভয়ে ভেতরে এলাম। বললাম--


--কি হচ্ছে এখানে?এতো চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছে কেন?


শিশিরের মা বলে উঠলো,"এই তো এসে গেছেন মহারানী।নাটের গুরু টা।কী ভেবেছিলে আমাদের ছেলেকে বোকা বানিয়ে বিয়ে করে নেবে। শয়তান মেয়ে একটা।

--আহ মা তুমি ঋতুর সাথে এমন আচরন করছো কেন?

--তুই চুপ থাক শিশির।ওরা ওদের বন্ধ্যা মেয়েকে আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইলো।আর আমি বসে বসে নাটক দেখবো। শিশির এক্ষুনি বাসায় চল।এই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও থাকার ইচ্ছা নেই।

আমি বললাম--এক মিনিট আন্টি। আপনি একটু শান্ত হন। আম্মু আন্টি এসব কি বলছেন?

আম্মু বলল--মা তুই একটু বস। আমি তোকে সবটা বুঝিয়ে বলছি।

--হুম আমি ঠিক আছি।বলো আমিও জানতে চাই সত্যিটা।

--এক্সিডেন্টে তুই অনেক মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিস।ডাক্তার  বাঁচার কোনো আশ্বাস দিতে পারছিলো না। অনেক চেষ্টার পর তুই সুস্থ হয়ে গিয়েছিস। কিন্তু পেটে প্রচণ্ড আঘাত পাওয়া তোর একটা অপারেশন করতে হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন অপারেশনটা না করালে তোকে বাঁচানো যাবে না।আর অপারেশনটা করলে তুই কখনো মা হতে পারবি না।বাধ্য হয়ে আমরা দ্বিতীয় উপায় বেছে নিয়েছি। আমাদের কাছে তোর বেঁচে থাকা অন্য সব কিছুর থেকে বেশি জরুরি। 


স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ--আম্মু তুমি আমায় আগে বলো নি কেন এসব?আমায় তো একবার জানাতে পারতে।তাহলে আজকে এতো অপমানিত হওয়া লাগতো না।

--মা আমরা তোকে জানাতে চেয়েছি কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না। ভেবেছিলাম শিশিরের সাথে কথা বললে ও তোকে বুঝিয়ে বলবে সবটা। ওদের কাছে কিছু লুকিয়ে তোকে বিয়ে দিতে চাই নি।তাই ওদের সবটা বলতেই ওরা রেগে যায়।

--আম্মু ওনাদের রাগ করার টা  কি স্বাভাবিক নয়?কেউ এমন মেনে নেবে ?অন্য সবার আগে আমায় জানানো প্রয়োজন ছিল তোমাদের।তাহলে আজ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।

--মা আমরা...

--থাক বাবা আর কিছু বলো না। আমার জন্য তোমাদের এতোটা অপদস্থ হতে হয়েছে।আমায় প্লীজ মাফ করে দাও।


শিশিরের মা মুখ বেঁকিয়ে বলল,"কি নাটক বাজ মেয়ে।দেখ শিশির  কাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলি!! এতোসব কান্ড ঘটে গেছে সে নাকি কিছুই জানে না। অলক্ষুনে মেয়ে। এই চল তাড়াতাড়ি এই বাড়ির বাতাস টাও বিষাক্ত। অভিশপ্ত এই বাড়িতে এক মুহুর্তের জন্য থাকতে চাই না।

--আম্মু তুমি প্লীজ থামো এবার। ঋতু এসব জানতো না। জানলে আমায় জানাতো।

--তুই এই  অপয়া মেয়ের হয়ে একটা কথাও বলবি না। চুপচাপ বাসায় চল।নইলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।

আমার আম্মু আর বাবা এসে হাত জোড় করে বলল--

--দয়া করে আপনারা চলে যাবেন না। আমার মেয়েটা শিশিরকে অনেক ভালোবাসে। আমার মেয়েটা অপয়া নয়।ও খুব লক্ষ্মী মেয়ে।ওর মতো মেয়ে চাইলেই পাওয়া যায় না।প্লীজ আপনারা একটু দয়া করুন।

নিজের মা বাবা এভাবে কাকুতি মিনতি করতে দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিল।চোখ দিয়ে অনবরত টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিনা। নিজেকে শান্ত করে আম্মুকে বললাম--

--কি করছো তোমরা? ওনাদের যেতে দাও। আটকাবে না।

ওরা চলে যাচ্ছিল।তখন পথ আটকে বললাম--

--আন্টি আজ যা কিছু হয়েছে সব আমার দোষ। আপনি কিছু মনে করবেন না।মন থেকে ক্ষমা চাইছি।আমার ভুলত্রুটি গুলো মাফ করে দেবেন।তবে একটা কথা মনে রাখবেন আমি জন্ম থেকে বন্ধ্যা নই।আজ যদি আমার জায়গায় আপনার মেয়ে থাকতো তখন কি তাকেও অপয়া অভিশপ্ত বলে তকমা লাগিয়ে দিতেন?

--এই মেয়ে তোমার সাহস তো কম না। নিজের সাথে আমার মেয়ের তুলনা করছো!!

--তুলনা করছি না।আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর কারোর হাত থাকে না।আপনারা এবার আসতে পারেন।

ওনার চলে গেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছি তখনি শিশিরের কল--

--ঋতু আমার মা বাবাকে বোঝাতে পারি নি।ওরা কিছুতেই তোমায় মেনে নেবে না।

--হুম জানি। 

--আমি মা বাবার একমাত্র ছেলে।কি করে ওদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে তোমায় বিয়ে করি? মা বলেছে তার অমতে তোমায় বিয়ে করলে তার লাশ দেখতে হবে।আমি ছেলে হয়ে কি করে মেনে নেবো?তাছাড়া তুমি তো আমায় সন্তান দিতে পারবে না।আমার উত্তরসূরী হবে না। আমার বংশের কথা আমায় ভাবতে হবে।

--এখন তুমি কি চাও?

--আমি আমাদের রিলেশনশিপ এখানে শেষ করতে চাই।মা বাবার পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করে সুখে শান্তিতে থাকতে চাই।

--আচ্ছা ঠিক আছে।

--শুধুই আচ্ছা!!আর কিছু বলবে না?

--যা বলার তা তুমি বলে দিয়েছো। সবসময় তোমার ভালো চেয়ে এসেছি। এখনও চাই এবং আগামীতেও চাইবো। নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা‌। আল্লাহ হাফেজ।


তারপর সবকিছু থেকে  ব্লক করে দিলাম।আর যোগাযোগ নেই। নিজের ভেতর জেদ চেপে গেল।এমন কিছু করতে হবে যেন সমাজের মানুষ আমায় কিছু বলার আগে দশবার ভাবে।দুস্থ অসহায় মানুষের পাশে থাকতে হবে। মানুষের বাজে কথা শুনতে শুনতে নিজেকে তিল তিল করে তৈরি করলাম।একটা বৃদ্ধাশ্রম আর অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করলাম। মা বাবা আর ওদের নিয়েই ব্যস্ত থাকি।

ঋতুর কথা শুনে খুব খারাপ লাগলো‌।মেয়েটাকে কতটা ঝড় ঝাপটা সামলাতে হয়েছে। বললাম--

--ঋতু যা হয়েছে ভালোর জন্য হয়েছে। তুমি কোনো কিছু নিয়ে আফসোস করো না। তোমায় যে ছেড়ে গেছে সে একদিন পস্তাবে।যারা তোমায় বাজে কথা শুনিয়েছে তারা একদিন তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করবে।মিলিয়ে নিও।

কথাগুলো বলতে বলতে একটা কল আসলো।ফোনটা লাউড স্পিকারে ছিল বুঝতে পারি নি।

অপর প্রান্ত থেকে বলে উঠলো,স্যার আপনি তাড়াতাড়ি আসুন।ম্যাডামের.....


***চলবে**


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।