চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০৬ )

চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০৬ )
চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০৬ )


চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০৬ )
মিশিতা চৌধুরী


ভাইয়া ঘর ছেড়ে বেরিয়ে বাইরে চলে গেল। ভীষণ খারাপ লাগছে। আমার জন্য তবে ভাইয়া ভাবী জীবনে অশান্তি নেমে এলো!

"নাহ এভাবে আর বসে থাকা চলবে না।আমায় কিছু একটা করতে হবে। এভাবে অন্যের গলগ্রহ হয়ে থাকা যাবে না।কাল থেকে চাকরির খোঁজ করতে হবে। অনুকে একটা ফোন করি দেখি কিছু ব্যবস্থা করতে পারে কি না।

--হ্যালো অনু।

--হ্যাঁ চন্দ্রা বল।

--তোর সাথে দেখা করতে চাই। তুই কখন ফ্রি?

--আরে তোর জন্য আমি সবসময় ফ্রি। আমার বাসায় চলে আয়।

--কিন্তু কথাগুলো খুব ব্যক্তিগত।

--সমস্যা নেই।মা বাবা কিছুদিনের জন্য গ্ৰামে গেছে।আমি এখন একা।

--ওহ আচ্ছা।ঠিক আছে আমি কাল বিকেলে আসবো‌ তাহলে।

--ওকে চলে আয়।

--আচ্ছা রাখছি।


পরেরদিন বিকেলে অনুর বাসায় গেলাম।অনুকে সবটা খুলে বললাম।

--তুই এতো দিন জানাস নি কেন?

--আসলে আমি নিজেই এখনো ঘোরের মধ্যে আছি। এখনো বিশ্বাস করতে পারিনা আমার সাথে এমন হয়েছে।

আমার কথাগুলো শুনে অনুর মনটা খারাপ হয়ে গেল।

"চন্দ্রা তুই দেখিস একদিন না একদিন ও ঠিক ওর শাস্তি পাবে।"

"দোস্ত আমার এখন একটা কাজের খুব দরকার। এভাবে বাড়িতে বসে থাকলে পুরোনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।আমি আরো ভেঙ্গে পড়ছি।তাছাড়া ভাইয়ার উপর ও প্রেসার হয়ে যাবে।"

"দোস্ত তুই একদম চিন্তা করিস না আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করছি।"

"অনেক ধন্যবাদ অনু"


অনু হেসে বলল,ওহ আচ্ছা আমি তো এখন পর তাই আমায় ঘটা করে ধন্যবাদ দিচ্ছিস।

"না না।তুই এমন ভাবিস না"

"হিহিহি আমি তো মজা করছিলাম।তুই আজ থেকে যা।কাল আমার অফিস ছুটি।দুজনে অনেক গল্প করবো‌।"

"আজ না।আম্মু চিন্তা করবে।অন্য একদিন থাকবো"

"আমি আন্টিকে ফোন করে দিচ্ছি।তোর মনে আছে আমরা দুইজন প্রায়ই একসাথে থাকতাম।রাত জেগে আড্ডা দিতাম।আর আন্টির সে কি বকুনি।"

"হুম মনে আছে"

"তুই বস আমি করে আসছি"


একটু পরে এসে বলল,"আন্টি রাজি হয়ে গেছে।তুই এখানেই থাকবি আজ।"

"সত্যি রাজি হয়ে গেছে?"

"হুম হুম সত্যি।আজ অনেক গল্প করবো।আচ্ছা আমি অনলাইনে খাবার অর্ডার করে দিচ্ছি।"


দু'জনে মিলে সারারাত অনেক গল্প করলাম। সকালে নাস্তা খেয়ে বাসায় আসলাম। রুমে এসে দেখি বিছানার উপর একটা নতুন ফোন রাখা।"কে রাখলো ফোনটা"।মাকে ডাক দিলাম।

--আম্মু ফোনটা কে রেখেছে এখানে?এটা কার?

আম্মু অবাক হয়ে ফোনটা নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,দেখে তো বেশ দামি মনে হচ্ছে"

"হ্যাঁ ওই জন্য জিজ্ঞেস করছি।"


ভাইয়া এসে বলল,"আমি রেখেছি।তোর তো ফোন নেই।তাই ভাবলাম একটা ফোন নিয়ে আসি।

" ভাইয়া তুমি!! এতো দামি ফোন দিয়ে কি করবো!একটা নরমাল ফোন পরে আমি নিয়ে নিতাম"

ভাবী মুখ বাঁকা করে বলল,"আদরের বোন তুমি চন্দ্রা। তোমার জন্য না আনলে কার জন্য আনবে।আমি যে গত কয়েক মাস ধরে বলছি আমার ফোনটা খারাপ হয়ে গেছে।তার দিকে কোনো হুঁশ নেই।"

"ভাইয়া আমার তো এতো দামি ফোন লাগবে না।এটা তুমি ভাবীকে দাও।ভাবী নাও ধরো তুমি এই ফোনটা ব্যবহার করবে!"

"না চন্দ্রা এটা তোর জন্য এনেছি তাই তুই ব্যবহার করবি।শোনো আঁখি তোমার ফোনটা কিনে দিয়েছি ছয় মাস ও হয় নি। আরেকটা ফোন দিয়ে কি করবে!এটা চন্দ্রা ব্যবহার করুক। আমি পরের মাসে তোমায় নতুন একটা কিনে দেবো।"


ভাবী রাগ করে বলল,"লাগবে না। হুড়মুড় করে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

"ওর কথায় কিছু মনে করিস না।"

"না ভাইয়া মনে করি নি!"


মা দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছে।ভাইয়া যাওয়ার পর কাছে এসে বলল আঁখি যে কেন এমন করছে!তুই এসব নিয়ে মন খারাপ করিস না।কিছুদিন পর ঠিক হয়ে যাবে।অনুর সাথে কেমন কাটলো বল?ওকে নিয়ে এলি না কেন?"

"ওর কিছু কাজ ছিল তাই আসতে পারে নি।পরে আসবে একদিন।"

"আচ্ছা তুই ফ্রেশ হয়ে আয়।আমি খাবার দিচ্ছি।"

"আম্মু আমি খেয়ে এসছি।আয়াত মামুনি কোথায়?

"এই তো আমি ফুফিমনি।জানো স্কুলে একটা ড্রয়িং করতে দিয়েছে কিন্তু আমি কিছুতে পারছি না। তুমি আমায় একটু হেল্প করো না।"

"হেল্প করলে আমি কি গিফট পাবো?"

"উম্মাহহহহহহহ উম্মাহহহহহ এমন এত্তোগুলা আদর পাবে!"

"হিহিহি এই মিষ্টি মিষ্টি আদর পাওয়ার জন্য আয়াত বুড়িকে তো হেল্প করতেই হয়! চলো আমি দেখিয়ে দিচ্ছি!"


আমি আয়াতকে ড্রয়িংয়ে হেল্প করছিলাম তক্ষুনি আম্মু ডেকে বলল অনু কল দিয়েছে।গিয়ে কলটা রিসিভ করলাম।

--হ্যালো চন্দ্রু তোর জন্য একটা খুশির খবর আছে।

--কি খবর?

--একটু আগে আমাদের ম্যানেজার স্যার কল দিয়ে বলল কাল তাড়াতাড়ি অফিসে যেতে আমাদের অফিসে নতুন এমডি এসছে।তাই ওনাকে ওয়েলকাম করতে হবে।স্যার বলল নতুন এমডি আমাদের আগের এমডি স্যারের ছেলের বৌ। ওনার একজন পিএ লাগবে।আমি তোর কথা বলেছি।স্যার বলল কাল অফিসে নিয়ে আসতে।

--সত্যি বলছিস!

--হুম রে সত্যি।শোন তুই কাল সকালে রেডি হয়ে থাকবি।আমি এসে তোকে নিয়ে যাবো।

--আচ্ছা ঠিক আছে।

--রাখছি এখন।


আমি দৌড়ে গিয়ে আম্মুকে খবরটা দিলাম।আম্মু খুশিতে কান্না করে দিয়েছে।

পরের দিন সকালে রেডি হয়ে অনুর সাথে অফিসে গেলাম। নতুন মালিক আসবে বলে অফিসটাকে অনেক সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে।

--তুই এখানে বস।আমি স্যারের সাথে কথা বলে আসছি।

--আচ্ছা।


অনু তার স্যারের সাথে কথা বলতে গেছে।আমি চুপচাপ বসে রইলাম। টেনশনে হাত পা কাঁপছে।হাতে মুখে একটু পানি দেওয়া দরকার। একজনকে জিজ্ঞেস করে ওয়াশরুমে গিয়ে হাতে মুখে পানি দিয়ে আসলাম।বাইরে এসে দেখি প্রচন্ড ভীড়।একজন মহিলাকে সবাই ঘিরে রেখেছে। কিছুক্ষন পর উনি কেবিনে চলে গেল‌।মুখটা দেখতে পাই নি।


একটু পরে একজন লোক এসে আমার ধরে ডাকলো। আমি এগিয়ে আসতেই বলল,

--আপনি ভেতরে যান ম্যাডাম আপনাকে ডাকছে।


আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে ভেতরে গিয়ে নিচের দিকে সালাম দিলাম। সালামের উত্তর শুনে উপরে তাকিয়ে নির্বাক হয়ে গেলাম।

--তানিয়াআ!

তানিয়া কেবিনের বাইরে গিয়ে বলল,"সবাই একটু আমার রুমে আসুন।"


সবাই যখন রুমে আসলো তখন বললো,এই মেয়েটাকে এখানে কে ঢুকতে দিয়েছে?এই তুমি এখানে কি করছ? তোমার কোনো যোগ্যতা নেই আমার পিএ হওয়ার। একটা সাধারন কলেজ থেকে পড়াশোনা করে এতো বড় কোম্পানির বসের পিএ হওয়ার স্বপ্ন দেখলে কিভাবে?গরীবরা এমনই ছেঁড়া কাঁথা গায়ে দিয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখে।সেদিন তো অনেক বড় বড় কথা বললে।আজ ঠিকই ভিক্ষা চাইতে চলে এসছো‌ তাই না। অবশ্য তোমাদের মতো মেয়েদের থেকে এর চেয়ে বেশি আশা করাই ভুল। ঠিক আছে বল কত টাকা চাই।


এতোক্ষণ তানিয়ার কথাগুলো চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলাম।ওর এমন চিৎকারে সবাই নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা শুরু করে দিয়েছে।প্রথমে ভেবেছিলাম কিছু না বলে বেরিয়ে যাবো। কিন্তু পরে মনে এর একটা জবাব দেওয়া উচিত।আমি হেসে বললাম---

--"কুল ম্যাডাম কুল।এতো হাইপার হলে শরীর খারাপ করবে। আমি জানতাম না এখানে আপনি থাকবেন।যদি জানতাম তবে কখনোই পা রাখতাম না। ভিক্ষা দেওয়ার কথা বলছেন।ভিক্ষা কাকে দেবেন?আমিই তো আপনাকে আমার সবকিছু ভিক্ষা দিয়ে আসলাম।আমায় কিছু দেওয়ার সামর্থ্য আপনার নেই।আর বড় বড় কথা, সে তো আমি বলবো। আমি তো অন্যের সংসার ভেঙ্গে দেই নি। আমারই বড় বড় কথা মানায়,আপনার না।যে গরীবদের এতোটা ছোট করছেন তাদের পরিশ্রমেই আপনাদের মতো বড়লোকরা দামি কম্বল গায়ে দামি স্বপ্ন দেখেন। একদিন গরীবরা কাজ করা বন্ধ করে দিলে বুঝবেন গরীবরা কতটা মূল্যবান। অবশ্য আপনার মোটা মাথায় এসব ঢুকবে না। শুধুমাত্র নামডাক ওয়ালা ভার্সিটি থেকে পড়াশোনা করলেই হয় না। পারিবারিক শিক্ষা থাকা জরুরি যা আপনার এক্কেবারে নেই। বড়লোকের উচ্ছন্নে যাওয়া মেয়ে হলে যা হয় আরকি।


তানিয়া প্রচন্ড রেগে সিকিউরিটি ডাকতে লাগলো। সিকিউরিটি এসে বলল--

--জি ম্যাডাম।

--এই মেয়েকে কে ঢুকতে দিয়েছে। এক্ষুনি গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দাও।

"মিসেস অভিরাজ আমি চলে যাচ্ছি। বেচারাকে আর কষ্ট করতে হবে না। আপনি বোধহয় রেগে গেছেন।রাগ করা ঠিক না।কথায় বলে রাগলেন তো হারলেন।আসছি।


গটগট করে অফিসের বাইরে এসে বড় বড় নিশ্বাস নিতে লাগলাম।অনু এসে বলল,"ঠিক আছিস তুই?"

"হুম।

"চল তোকে বাড়ি পৌঁছে দেই।"

"না দোস্ত আমি একা চলে যাচ্ছি। তুই কাজ কর!"

"তুই শিওর যেতে পারবি তো?"

"হুম পারবো।"


অফিসের এরিয়া পেরিয়ে রাস্তায় গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

"আপনার তো অনেক সাহস। মুখের উপর কেমন উচিত জবাব দিয়ে দিলেন। এইজন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ"


ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম........


***চলবে***

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।