চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০৪ )

চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০৪ )
চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০৪ )


চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০৪ )
মিশিতা চৌধুরী


অভি তানিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।বলল,"দেখো চন্দ্রা যা হবার হয়ে গেছে।তা নিয়ে এতো বাড়াবাড়ি না করলেও পারতে।প্রথম থেকেই তোমাকে আমার পছন্দ ছিল না।নেহাত মা বাবার ভয়ে কিছু বলতে পারি নি।আমি আগেও মাকে তানিয়ার কথা বলেছি।তানিয়ার সাথে আমার ভার্সিটি লাইফ থেকে রিলেশন। ও দেখতে স্মার্ট, সুন্দরী,মর্ডান। কিন্তু মা ওকে পছন্দ করে নি। বাবা বলেছে আমি যদি তানিয়াকে বিয়ে করি তবে আমায় সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করবে।তাই বাধ্য হয়ে তোমায় বিয়ে করে নিয়েছি।


তোমার চলাফেরার ধরন,ড্রেস আপ সব কিছু ব্যাকডেটেড।সব দিকে তুমি গাইয়া ক্ষেত।


তোমার সাথে বিয়ের নাটকটা তানিয়ার প্ল্যান।তাই বিয়ের পরই আমি লন্ডন চলে যাই। সেখানে তানিয়া আর আমি একসাথে ছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম বাবা কবে তার সম্পত্তি আমার নামে করে দেবে।সেই অপেক্ষার পালাও শেষ হলো।দেশে আসার কিছুদিন আগে বাবা আমায় জানায় সম্পত্তির অর্ধেক অংশ আমার নামে লিখে দিয়েছে।তাই আমি আর তানিয়া বিয়েটা সেরে ফেললাম।যদিও ভেবেছিলাম পুরো সম্পত্তি আমার নামে হয়ে যাবে। But bad luck! what ever!

এতোগুলো দিন তোমায় কিভাবে সহ্য করেছি গড নোজ।ভালোই হলো তুমি সবাইকে সবটা জানিয়ে দিলে। আমি তো টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম কিভাবে বলবো কথাগুলো।কথায় আছে না, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন।ডিভোর্স পেপার রেডি আছে তুমি স্বাক্ষর করে দিও।ভেবো না তোমার দেনা পাওনা সব শোধ করে দেবো।

সবাই শুনে রাখো আমি তানিয়ার সাথে এই বাড়িতে থাকবো‌।চাঁদ তুমি চাইলে এই বাড়িতে থাকতে পারো।তাতে আমাদের কোনো অসুবিধা নেই তাই না তানি বেবি?"

তানিয়া রেগে বলল, অসুবিধা নেই মানে?আমি আর এই মেয়ে একই বাড়িতে থাকবো এটা তুমি ভাবলে কি করে?ওর জিনিসপত্র নিয়ে এক্ষুনি বেরিয়ে যেতে বলো"

আমি বললাম,"হাহাহা মিস তানিয়া ওফসস সরি মিসেস তানিয়া তুমি ভাবলে কি করে আমি এই বাড়িতে পড়ে থাকবো! আমি আগেই আমার জিনিস গুছিয়ে নিয়েছি।আর শুনুন মিস্টার অভিরাজ আপনার টাকা আমার লাগবে না।যে টাকাগুলো দেবেন বলে ভেবেছিলেন সেগুলো আপনার স্ত্রীর জন্য রেখে দেন। ভবিষ্যতে কাজে আসবে।

মা আপনার আর বাবার দেওয়া সমস্ত জিনিস পত্র, শাড়ি গয়না আলমারি তে রাখা আছে। নিন মা চাবিটা।"

মা ডুকরে কেঁদে উঠলো,"মা রে তুই যাস না।তুই আমার মেয়ে হয়ে থাকবি।কেউ কিচ্ছু বলার সাহস পাবে না। আমি তোকে ছেড়ে কিভাবে থাকবো মা?"

"আমায় যে যেতে হবে মা।যার হাত ধরে বাড়িতে ঢুকেছি সেই মানুষটাই আমার নেই। আপনাদের ছেড়ে এভাবে চলে যেতে হবে কখনো ভাবি নি।মা যদি কখনো কোনো ভুল করে থাকি তবে আমায় মাফ করে দেবেন। আপনাদের আদর ভালোবাসার কথা আমি সারাজীবন মনে রাখবো।আপনি নিজের যত্ন নেবেন। বাবার খেয়াল রাখবেন।আমি আসছি।"


তানিয়া বলল,"রুমে চলো বেবি এসব ন্যাকামো সহ্য করতে পারছি না।


অভি রুমের দিকে পা বাড়াতেই,"দাঁড়াও অভিরাজ তোমায় বিশেষ কিছু বলার নেই।একটা কথা মাথায় রেখো যে অন্যায় আমার সাথে করেছো। জেনে শুনে আমার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছো।তুমি এর শাস্তি একদিন না একদিন ঠিক পাবে।তখন আফসোস করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।"


বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলাম। কষ্টে অপমানে নিজের উপর ঘৃণা হচ্ছে। কি থেকে কি হয়ে গেল। এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না‌।মনে হচ্ছে ঘুমের ঘোরে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি। ঘুম ভেঙ্গে গেলে দুঃস্বপ্নটা কেটে যাবে।পা যেন আর সামনের দিকে এগোচ্ছে না।মাথাটা বড্ড ঘুরছে। মনে হচ্ছে পড়ে যাবো।সামনে একটা পার্ক দেখতে পেলাম।পার্কের ভেতরে গিয়ে একটা বেঞ্চে বসলাম। এভাবে একা একা বাসায় যাওয়া মোটেও উচিত হবে না। আমাকে বেঁচে থাকতে হবে নিজের জন্য।আজ থেকে শুধু নিজেকে নিয়ে ভাববো। আগের মতো হাসিখুশি থাকবো।যে আমার জীবনটাকে নরক যন্ত্রণা দিয়েছে তাকে দেখিয়ে দেবো শুধুমাত্র পোশাক আশাক দিয়ে মানুষ স্মার্ট হয় না। স্মার্টনেস মানুষের মনের মধ্যে বিরাজ করে। আল্লাহর রহমত থাকলে মানুষ সব কাজ পারে।

"তুমি আমায় ছেড়ে অন্য কারোর হাত ধরেছো তো। তুমিও একদিন মন ভাঙ্গার কষ্ট পাবে।আমি আজ যতটা কষ্ট পাচ্ছি তার চেয়ে বেশি কষ্ট তোমায় পেতে হবে। আমি তোমায় অভিশাপ দেবো না। কিন্তু আমার তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নগুলো তোমায় দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়াবে।"


কাঁধে কারোর আলতো স্পর্শ পেয়ে কান্না থামিয়ে দিলাম।

--"চন্দ্রা মা "

--"আম্মু তুমি!!!"

--"হ্যাঁ। তোর শাশুড়ি মা আমায় ফোন করে সব জানিয়েছে।আমি ওদের বাসায় যাচ্ছিলাম।দূর থেকে দেখলাম তুই এখানে বসে আছিস।"

আম্মুকে জড়িয়ে কান্না করতে লাগলাম। আমার কান্না দেখে আম্মুও কাঁদতে লাগলো। অনেকক্ষন কান্নার পর আম্মু চোখ মুছিয়ে দিলো।বলল,

--"যে মেয়েটাকে এতো আদর যত্নে বড় করেছি সে এমন অসহায়ভাবে কাঁদছে।আমি মা হয়ে কি করে সহ্য করি বল তো?মা রে আমায় তুই মাফ করে দে। আমার জন্য তোর জীবনটা এমন তছনছ হয়ে গেছে।"

--"এভাবে বলো না আম্মু।যা হয়েছে তাতে তোমার কোনো দোষ নেই‌। প্রত্যক মা বাবা চায় তাদের সন্তানরা খুব ভালো থাকুক।একটা শান্তিপূর্ণ জীবন পাক। তুমিও তাই চেয়েছো। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না।আমার নিয়তি আমায় এই জায়গায় দাঁড় করিয়েছে।

--"চল মা তোর সাথে যে এমন অন্যায় করছে তাকে  জবাব দিতে হবে।"

--"না আম্মু এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। যেখানে ভালোবাসা নেই সেখানে বার বার গিয়ে নিজের আত্নসম্মান বলি দেওয়ার কোনো মানে হয় না। তাছাড়া আমার শশুর শাশুড়ি খুব ভালো মানুষ।এসব করলে ওনারা খুব কষ্ট পাবেন।"

--"তুই শুধু অন্যের কষ্টের কথা ভাববি। তোর ভেতরটা যে জ্বলে পুড়ে খাঁক হয়ে যাচ্ছে সে কথা ভাবলি না।তুই তো সবসময় অন্যের সাথে হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতিস।আজ নিজের সাথে এতো বড় একটা অন্যায় করলি।"

--আমি মুচকি হেসে বললাম,"কে বলল প্রতিবাদ করি নি! আমি ওই বাসা ছেড়ে একেবারে চলে এসেছি এটাই তো প্রতিবাদ।আম্মু তুমি তো সবসময় আমায় শিখিয়ে এসেছো সময় সবচেয়ে বড় শিক্ষক। আমাদের কোন পরিস্থিতিতে কি করতে হবে সময় তা বলে দেয়।"


আম্মু আমার কপালে চুমু খেয়ে বললো,"আমার মেয়েটা অনেক বড় হয়ে গেছে।"

--"চলো আম্মু আমাদের বাসায় যাই। কতদিন তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাই নি।আজ তোমার কোলে ঘুমোবো ঠিক ছোটবেলার মতো। তুমি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিও।


বাবা মারা যাওয়ার পর আম্মু আমাকে আর ভাইয়াকে একা হাতে মানুষ করেছে। বাবার রেখে যাওয়া বেশ কিছু টাকা ছিল। সেগুলো দিয়ে পড়াশোনার খরচ চালাতে হতো। আম্মু বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেনি।তাই সবসময় চাইতো আমরা যেন অনেক দূর পড়াশোনা করি। মায়ের ইচ্ছেতেই আমি শিক্ষকতা করতাম। ভাইয়া একটা কোম্পানিতে চাকরি করে। আমার বিয়ের দুই বছর আগে ভাইয়া বিয়ে করে।


আম্মু আর আমি বাসায় আসলাম।

"তুই এখানে চুপটি করে বস আমি তোর জন্য লেবুর শরবত নিয়ে আসছি।খেলে ভালো লাগবে"

"খেতে ইচ্ছে করছে না।ভাবী আর আয়াত কই? ওদের দেখতে পাচ্ছি না কেন?"

"ফায়াজ ওদের নিয়ে বৌমার বাবার বাড়ি গেছে। আয়াত বায়না করছে কয়েককদিন ধরে। কাল চলে আসবে।"


আম্মু আমার জন্য শরবত নিয়ে এসেছে। শরবতের গ্লাস টা হাতে দিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসলো আমার সামনে।

"চন্দ্রা তুই কি জানিস তোর নাম চন্দ্রা কেন রেখেছিলাম?

"কেন রেখেছিলে আম্মু?..........



***চলবে***


(আসসালামুয়ালাইকুম কেমন আছেন সবাই? গল্পটা কেমন লাগছে জানাবেন প্লীজ।কোনো পরামর্শ থাকলে  সংকোচ বোধ ছাড়াই জানাতে পারেন)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।