চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০১ )

চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০১ ) - মিশিতা চৌধুরী
চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০১ ) - মিশিতা চৌধুরী

চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০১ )
মিশিতা চৌধুরী


বাজার করে এসে ব্যাগগুলো রান্নাঘরে রেখে দিলাম।বাইরে ঝলসানো রোদে প্রাণ যায় যায় অবস্থা।দিন দিন গরমের তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে।পুরো শরীরটা ঘেমে একাকার হয়ে গেছে।টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে পুরোটাই খেয়ে নিলাম। শাশুড়ি মা ঘর থেকে বেরিয়ে বলল,"বৌমা যা যা বলেছি সব এনেছো তো?

"হ্যাঁ মা সব নিয়ে এসেছি।"

"তুমি গিয়ে একটু বিশ্রাম নাও। অনেক ধকল গেছে তোমার উপর।"

"কি যে বলো!এই টুকুই কাজ।আমি একদম ঠিক আছি ।তোমায় আমি সাহায্য করি প্লীজ।"

 মা হেসে বলল,"পাগলি মেয়ে আমার "


আমি আর মা রান্নাঘরে রান্না করতে লাগলাম।রান্না করতে করতে আমার পরিচয় দেই।


"আমি চন্দ্রা। পড়াশোনা শেষ করে একটা স্কুলে শিক্ষকতা করতাম।হুট করে একদিন বিয়ে হয়ে গেল।বিয়ের পর নিজের ইচ্ছায় চাকরিটা ছেড়ে দেই।বিয়ের সম্পর্কে জানার পরই ভেবে নিয়েছি চুটিয়ে সংসার করবো।পাঁচ বছরের সংসারে ভালোবাসার কোনো অভাব নেই। বিয়ের এক বছরের মাথায় আমার স্বামী অভিরাজ  চাকরি সূত্রে লন্ডন চলে যায়। শশুর  শাশুড়ি আর ননদ মিলে আমার ছোট্ট সংসার। যদিও শশুর সবসময় ব্যবসায়ের কাজে ব্যস্ত থাকে আর ননদের বিয়ে হয়ে গেছে গতবছর।"


আমি পেঁয়াজের খোসা ছাড়াচ্ছিলাম হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ। দরজা খুলতেই দেখি আমার শশুর আর আমার ননদ রিমা দাঁড়িয়ে আছে।বাবা কক্সবাজার গিয়েছিল ব্যবসায়ের কাজে‌।আসার সময় রিমাকে নিয়ে এসেছে।বাবাকে সালাম দিলাম।

"কেমন আছিস মা"

"আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি বাবা।দাও লাগেজটা।"

রিমা এসে জড়িয়ে ধরে বললো,"তুমি আমায় ভুলেই গেলে!!

"না তো তোমায় কি ভোলা যায়। তুমি হচ্ছো আমার ননদিনী রায় বাঘিনী"

রিমি হেসে বলল,"তোমায় খুব মিস করেছি ভাবী।"


সবার সাথে গল্প আড্ডা দিতে দিতে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। খাবার খেয়ে অভিকে একটা কল দিলাম। আজকাল অভি টা কেমন জানি হয়ে গেছে। আগে কল দিলে সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করতো। রিসিভ করতে না পারলে মেসেজে জানিয়ে দিতো।আর এখন....

কল টা রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে সুমধুর কন্ঠে বলে উঠলো,"আপনি যে নাম্বারে কল করেছেন সেটি এখন ব্যস্ত আছে!"


মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।"তিনদিন পর আসবে অথচ তার কোনো পাত্তা নেই। আজ কল দিলে ধরবোই না হুহ"

নিজে নিজে কথা বলতে লাগলাম।

" কি এতো বিড়বিড় করছো ভাবী। ভাইয়া কল রিসিভ করে নি?"

মুখ ফুলিয়ে বললাম,"করে নি।আমিও করবো না।"

"হিহিহি। তুমি রাগ করলে একদম বাচ্চাদের মতো লাগে। হুম একদম ধরবে না।বুঝুক মজা।দেখ কেমন লাগে!"

"আমার ননদিনীটা দেখি পাকা গিন্নি হয়ে গেছে।তা তুমিও বুঝি রাফাত ভাইয়ের সাথে এমন করো!"

"হুম। খুব জ্বালাই। বেচারা আমার জ্বালায় মাঝে মাঝে ভাবে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি"

"হিহিহি।রিমা তুমিও না পারো বটে! দেখো তোমার কল এসেছে। নাম নিতে না নিতে বান্দা হাজির।"


রিমা কথা বলতে বলতে চলে গেল। আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি।

একটু পরে অভি কল করলো,"হ্যালো।সরি সুইটহার্ট। আমি কাজে একটু বিজি ছিলাম।আসলে অনেক দিনের ছুটি নিয়েছি তো তাই আগে থেকেই কাজ গুলো গুছিয়ে নিচ্ছি।তুমি রাগ করো না লক্ষ্মীটি। তোমার কি কি লাগবে বলো? সব নিয়ে আসবো!"

"আমার তুমি হলেই হবে অভি।আর কিছু চাই না"

"আচ্ছা আমি এখন রাখি তুমি সাবধানে থেকো"

"অভিটা সত্যি কেমন যেন হয়ে গেছে। আগে আমার সাথে কথা বলার ছুঁতো খুজতো আর এখন। নাহ আমি ভুল ভাবছি। মানুষটা একা একা এতদূর পড়ে আছে আমাদের জন্য। সারাদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে যাচ্ছে আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। আর আমি কি না উল্টা পাল্টা ভাবছি।


এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতে পারি নি। বাবার ডাকে ঘুম ভাঙল।

--বৌমা ও বৌমা এদিকে আসো তো একটু।

তাড়াহুড়ো করে মায়ের রুমে গেলাম।মা বাবা দুজনেই বসে আছেন।

"বাবা তোমার কিছু লাগবে?

" না মা।এই নাও মা তোমার পছন্দের আচার নিয়ে এসেছি কক্সবাজার থেকে।"

" আমার জন্য..."


শাশুড়ি মা বলে উঠলো,"কেন আনবে না বৌমা। তুমি তো আমাদের আরেকটা মেয়ে।রিমা আর তুমি তো আলাদা কেউ না।"

খুশিতে আমার কান্না চলে আসছে। এই মানুষগুলো আমায় বড্ড ভালোবাসে। 

"সন্ধ্যা বেলায় চোখের জল ফেলতে নেই মা।"

চোখ মুছে নিলাম।আমি সত্যিই অনেক ভাগ্যবতী। এইরকম শশুর শাশুড়ি আর ননদ পেয়ে খুব খুশি। আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া।

"মা আমি যাই চা করে নিয়ে আসি।"

"আমার জন্য তোমার হাতের সেই স্পেশাল আদা চা কিন্তু"

মুচকি হেসে বললাম,"ঠিক আছে বাবা এক্ষুনি নিয়ে আসছি।"

আমি রান্নাঘরে গিয়ে চা করতে লাগলাম।"কি করছো ভাবি?"

"চা বানাচ্ছি। সোফায় গিয়ে বসো আমি চা আর তোমার পছন্দের নুডলস নিয়ে আসছি।


রিমা আসলে বাড়িতে একটা হই হই ব্যাপার থাকে।আমি আর ও একদম বন্ধুর মতো।সব কিছু শেয়ার করি। মাঝে মাঝে আমার শাশুড়ি মাও আমাদের সঙ্গ দেয়।


হাসি আড্ডা কেটে গেল তিনদিন।সকাল থেকে বাড়িতে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। আজ চার বছর পর অভিরাজ ফিরবে।সবাই তার ফেরার অপেক্ষায়  আছে।মা এসে বলল, বৌমা এই শাড়িটা আর গহনাগুলো পড়ে নাও।রিমা ও রিমা এদিকে আয় তো একটু।"

"হ্যাঁ মা বলো।"

"তোর বাবা কল দিয়েছে।ওরা প্রায় এসে গেছে।তুই বৌমাকে সুন্দর করে সাজিয়ে দে। আমার ছেলেটার চোখ যেন না সরে।"

"আরে বাহ মা তুমি কবে এতো রোমান্টিক হয়ে গেলে"

মা রিমার দিকে চোখ পাকিয়ে বলল,"খুব দুষ্ট হয়েছিস না।যা  তাড়াতাড়ি করে তৈরি হয়ে নে।"

আমরা সবাই সাজুগুজু করে অভির আসার অপেক্ষা করছি। নিজের প্রিয় মানুষটিকে কাছে পাওয়ার আনন্দে মনটা একটু পর পর নেচে উঠছে।রুমে দেখতে গেলাম সব ঠিকঠাক আছে কিনা।আজ রুমটা অভির পছন্দ অনুযায়ী সাজিয়েছি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম। 


একটু পরে কেউ আমায় পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেছে।আমি ঘুরতেই দেখি মুখোশ পরা একটা লোক। ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলাম।মা দৌড়ে এসে বলল,"কি হয়েছে বৌমা?"

আমি বললাম,"চো....."

তারপর আর কিছু মনে নেই।জ্ঞান ফেরার পর দেখি মা আর রিমা আমার পাশে বসে আছে।

"কেমন লাগছে ভাবী?"

"হু ভালো"

"বৌমা তুমি এখনও ভয় পাচ্ছো?"

"হু কেমন অদ্ভুত একটা মুখোশ পরা ছিল লোকটা"

"ভয় পেয়ো না আমরা সবাই তোমার সাথে আছি!"

"মা চোরটা ধরা পড়েছে?"


রিমা আর মা মুচকি মুচকি হাসছে। মনে মনে বললাম,কি হলো চোরের কথা বলায় ওরা এমন হাসছে কেন?কেসটা কি জানতে হচ্ছে!

"হ্যাঁ বৌমা চোরটাকে ধরতে পেরেছি। সত্যি এমন চোর আজকাল দেখাই যায় না।সাহস আছে চোরের।"

"বাবা চোরটাকে ছেড়ে দিয়েছো?"

"না মা ওই চোর তোমার সাথে দেখা করতে চায়!"

আমি অবাক হয়ে বললাম,"আমার সাথে!"

"আয় ভেতরে।"

মাথা তুলে তাকাতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। "অভি তুমিইইইইইইই!!!"


অভি কান্নার ভান করে বললো.......



#গল্প_চন্দ্রাবতী

#পর্ব_০১

#মিশিতা_চৌধুরী


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।