চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০২ )

চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০২ )
চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০২ )

চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০২ )
মিশিতা চৌধুরী


অভি কান্নার ভান করে বললো"বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই আমায় চোর বানিয়ে দিলে। ভাবলাম একটা সারপ্রাইজ দেবো‌।সব নষ্ট হয়ে গেছে।"

সবাই অভির দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে হাসতে লাগলো।

মা বললো," অনেক হাসি মজা হয়েছে এবার সবাই ফ্রেশ হয়ে আসো। চোরের চক্করে কারোর তো খাওয়া হয় নি।খাবার দিচ্ছি সবাই খেতে আসো। অভি অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছে ওর বিশ্রামের দরকার।"

সবাই খেয়ে বিশ্রাম নিতে চলে গেছে।আমি সব গুছিয়ে রাখছিলাম!


রিমা এসে বলল,"ভাবী তুমি এখানে কি করছো? যাও রুমে যাও বলছি। এতো দিন পর তোমার হিরো এসেছে কোথায় রোমান্স করবে তা না সে রান্নাঘরে খুটুর খুটুর করছে।"

"কাজগুলো শেষ করে যাচ্ছি"

"আমি করে দিচ্ছি।তুমি ভাইয়ার কাছে যাও!

"কিন্তু......"

"ওসব কিন্তু টিন্তু পরে।যাওওওওওওওও!"


রিমার জোড়াজুড়িতে রুমের দিকে আসতে লাগলাম। খুব লজ্জা লাগছে।এতো দিনের চেনা পরিচিত রুমে ঢুকতে বুকটা কেমন দুরুদুরু করছে।

"এতোক্ষণে আসার সময় হলো তোমার?"

"না মানে ইয়ে"

"এতো ইতস্তত না করে এদিকে আসো"


আমি কাছে যেতেই আমায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আমিও পরম আবেশে অভিকে জড়িয়ে নিলাম। যেন মরুর বুকে বৃষ্টির ঢল নেমেছে। 

কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, "তোমায় খুব মিস করেছি চাঁদ"।(অভি আমায় চাঁদ বলে ডাকে)

"আমিও তোমায় মিস করেছি।জানো প্রতি মুহূর্তে তোমার কথা মনে পড়তো।"

"এই পাগলি মেয়ে কান্না করছো কেন!"

"এটা আমার সুখের কান্না।"


সারাদিন ঘোরাঘুরি,আড্ডা দেওয়া আর অভির সাথে দিনগুলো খুব ভালো কাটছে।মনে হলো আমি যেন স্বর্গসুখে আছি। 

 হঠাৎ একদিন ঠিক হলো সবাই মিলে রেস্টুরেন্টে খেতে যাবে।

অভি বলল,"চাঁদ আমি গোসল করতে যাচ্ছি।তুমি আমার জামা কাপড় বের করে রাখো।"

"এক্ষুনি দিচ্ছি"


জামা কাপড়গুলো বের করছিলাম হঠাৎ আমার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এলো।অন করতেই দেখি অভির কিছু ছবি। তাও একটা মেয়ের সাথে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। নিজেকে শান্ত রাখলাম। আজকালকার আধুনিক যুগে ছবিগুলো পরিবর্তন করা খুব কঠিন কিছু না।মনকে এটা ওটা বলে মানাচ্ছিলাম।

"চাঁদ এই চাঁদ।তখন থেকে ডাকছি।কি এতো আকাশ পাতাল ভাবছো তুমি?"

"ক কই কিছু না তো"

"তুমি এমন থোতলাচ্ছো কেন শুনি?ঠিক আছো তো? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?"


নিজেকে স্বাভাবিক রেখে হাসিমুখে বললাম,"দূর আমার আবার কি হবে?আমি তো ঠিক আছি"

"আমি নিচে যাচ্ছি। তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হও।বের হতে দেরি হয়ে যাবে।"


অভি নিচে চলে গেল।মনটা বড্ড খচখচ করছে।কে পাঠালো ছবিগুলো।ওই নাম্বারে ফোন করলাম কিন্তু সুইচ অফ বলল।

"নানা রকম চিন্তা মাথায় হানা দিচ্ছে। অভি আমায় ঠকাচ্ছে না তো। কাকে বলবো।পরে যদি ভুল হই তবে অভির কাছে ছোট হয়ে যাবো।আমাকেই আসল ঘটনা খুঁজে বার করতে হবে!"

সেদিনের মত চিন্তাগুলো সরিয়ে সবার সাথে ঘুরতে গেলাম। কিন্তু ছবিগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

"কি হলো বৌমা কি এতো চিন্তা করছো? কিছুই তো খাচ্ছো না"

"এই তো মা খাচ্ছি"

খাওয়ার মাঝখানে অভি বললো,"আমি ওয়াশরুম থেকে আসছি।তোমরা খাও।"


ঘন্টাখানেক পর ফিরে এসে বলল," আকাশের সাথে দেখা হয়ে গেছে।ওর সাথে কথা বলতে বলতে দেরি হয়ে গেছে।"

"ওকে নিয়ে এলি না কেন? অনেক দিন দেখি না ছেলেটাকে!"

"ওর দরকারি কাজ আছে তাই চলে গেছে। বাসায় আসতে বলেছি।"

"খুব ভালো করেছিস।"


খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমরা অনেকক্ষণ ঘুরলাম। বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেছে। রুমে ঢুকবো তখনই আমার বান্ধবী অনু কল দিলো,"হ্যালো চন্দ্রা কেমন আছিস?"

"ভালো আছি রে। তোর কি খবর?"

"এইতো চলছে।তোকে একটা কথা বলার জন্য কল দিয়েছি। তোকে একটা ভিডিও পাঠিয়েছি।দেখ তো মেয়েটা তোদের আত্নীয় কি না। ভাইয়াকে আজ মেয়েটার সাথে দেখলাম। খুব ক্লোজলি বসে কথা বলছে। তুই আবার কিছু মনে করিস না।"


ভিডিও টা অন করতেই দেখি অভি আর আগের দিনের ছবিতে দেখা সেই মেয়েটি। বুঝতে বাকি রইল না।


আমি যেটাকে স্বর্গসুখ ভেবে স্বপ্নের ভেলা ভাসছি। ওটা আসলে তাসের ঘর। সর্বগ্ৰাসী হয়ে আমার দিকে ধেয়ে আসছে। পৃথিবীতে প্রিয় মানুষটার দেওয়া আঘাত মৃত্যুর সমান। প্রতিটা মুহূর্ত ছটপট করছিলাম। কষ্টে ঘৃনায় নিজের উপর বড্ড রাগ হচ্ছে। আমি এতোটা অন্ধ বিশ্বাসী হয়ে শুধু কষ্ট পেয়ে গেলাম। একটা মানুষ এতো নিখুঁত ভাবে অভিনয় করে গেলো আর আমি বুঝতেই পারলাম না।

নাহ এখন ভেঙ্গে পড়ার সময় নয়।যে আমার বিশ্বাস নিয়ে ছেলে খেলা করেছে তার মুখোশ উন্মোচন করার সময় এসে গেছে। তার আগে আমায় আরো কিছু কাজ করতে হবে।

সারারাত শুধু এপাশ ওপাশ করে গেছি। চোখ দুটো যেন নিজেদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। ভোর বেলায় উঠে ছাদে গিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম। কিচ্ছু ভালো লাগছেনা।বড্ড এলোমেলো লাগছে সব।

গতকাল অনেক ঘোরাঘুরি হয়েছে তাই সবাই অনেক ক্লান্ত। নাস্তা তৈরি করে সবাইকে ডেকে নিলাম।মা বাবা এসে রিমাকে ডাকলো।রিমা এসে বলল ভাবী আমায় তাড়াতাড়ি খেতে দাও।


মা বললো,"এতো তাড়াহুড়ো করছিস কেন আস্তে খা"

"মা আমায় ও বাড়ি যেতে হবে। তোমায় বললাম না আমার ছোট ননদ কানাডায় চলে যাবে।আজই ফ্লাইট।তাই বারবার করে বলে দিয়েছে যাওয়ার জন্য। আবার কত বছর পর আসবে কে জানে!

"পাউরুটি মুখে পুরতে পুরতে বাবা বলল,অভি তোর সাথে জরুরি বিষয়ে আলোচনা আছে। তুই একবার অফিসে আসতে পারবি।"

"নিশ্চয়ই পারবো। তাহলে একসাথে যাবো।"

আমি বললাম,"অভি তোমার ফোনটা দিয়ে যেও আমায়। আমার ফোনটা কাজ করছে না।"

হকচকিয়ে বলল,"আমার ফোন।"

"হ্যাঁ মায়ের সাথে কথা বলবো। অনেকদিন কথা বলিনি"

"আমি তো তাড়াতাড়ি চলে আসবো।আসার পর না হয়....

"না আমার খুব আর্জেন্ট"

বাবা বলল,"আরে কিছুক্ষণের মধ্যেই তো চলে আসবি দিয়ে যা ফোন টা"


একপ্রকার জোর করে ওর থেকে ফোনটা নিলাম।আগে কোনোদিন অভির ফোনে হাত দেই নি। হয়তো আনলক করা আছে।আমি হাতের কাজ সেরে নিলাম। 

"ভাবী আমি বের হচ্ছি। তোমার চোখ মুখের এই অবস্থা কেন?তুমি ঘুমাও নি ঠিকভাবে তাই তো?

"আসলে কাল রাতে ঘুমাতে পারি নি।ওই জন্য মাথাটা ব্যাথা করছে।"

মা অস্থির হয়ে বলল,"বৌমা তুমি ঠিক আছো? ডাক্তার ডাকবো?আচ্ছা আগে মলম লাগিয়ে দেই।

"না মা তুমি এতো টেনশন করো না।একটু ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে।"

"ঠিক আছে তুমি গিয়ে রেস্ট নাও। কিছু দরকার পড়লে ডাক দিও।"

"আচ্ছা বলে রুমে চলে আসলাম। রুমে এসে অভির ফোনটা চেক করতে লাগলাম। দেখলাম মেয়েটার সাথে  হাজার হাজার ছবিতে ওর গ্যালারি ভরা। হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারে শত শত চ্যাট।সব দুজনের ভালোবাসা আদান-প্রদানের। চোখের পানি বাঁধ মানছে না। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে।

"আল্লাহ আমি কি এমন পাপ করেছি যার জন্য তুমি আমায় এতো বড় একটা শাস্তি দিলে। ও আল্লাহ বলো না আমি কি করবো এখন? আমার ভালোবাসার মানুষটিকে এভাবে কেড়ে নিলে?যাকে বিশ্বাস করে সবটা উজাড় করে দিলাম সে আমায় এমনভাবে ঠকাতে একবারের জন্যও বুকটা কেঁপে উঠলো না। এতো দিন ধরে বলা প্রত্যেকটা কথা তবে মিথ্যা ছিল! কিন্তু কেন সে মিথ্যা বলেছে?কেন এভাবে ঠকিয়েছে।


কিছুক্ষণ থ মেরে বসে রইলাম।কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। এদিকে অভির আসার সময় হয়ে গেছে।যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।প্রথমে কয়েকটি ছবি আর স্ক্রিনশর্ট আমার ফোনে নিলাম। তারপর ওই মেয়েটার নাম্বারে......


****চলবে***



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।