প্রাক্তন (পর্ব ১২)

প্রাক্তন (পর্ব ১২)
প্রাক্তন (পর্ব ১২)


প্রাক্তন (পর্ব ১২)
মিশিতা চৌধুরী

কয়েকদিন পরে একদিন বিকাল বেলায় মুন মাথা ঘুরে পড়ে গেলো।সবাই মিলে ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ওর জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিল। এমন তো আগে কখনো হয় নি।

আম্মু বলল--রাশেদ বাবা ডাক্তার এখনো কিছু বলছে না কেনো?তোর বাবাকে তো জানানো হয় নি।একটা কল দে।

--আম্মু আগে ডাক্তার কি বলে শুনি তারপর বাবাকে জানাবো।

অপেক্ষার প্রহর যেন কাটছেই না।যত সময় গড়াচ্ছে হৃদস্পন্দন বেড়ে চলেছে। আমার মুনটা ঠিক আছে তো। বেশ কিছুক্ষণ পরে ডাক্তার এসে বলল--

--অভিনন্দন আপনাদের পরিবারে নতুন সদস্য আসতে চলেছে।

--মানে?

--আপনি বাবা হতে চলেছেন।

আম্মু খুশি হয়ে বললো--আপনি সত্যি বলছেন। আমার মুন মা তবে.....

--জি আপনার বউমা মা হতে যাচ্ছে।

--আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তোমার কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া। বউমার সাথে দেখা করা যাবে ডাক্তার সাহেব?

--জি যাবে। রাশেদ সাহেব আপনার স্ত্রী অনেক দূর্বল ওনার ঠিকভাবে যত্ন নিতে হবে ‌। ভারী কোনো কাজ করা যাবে না।আপনি আমার সাথে আসুন। ওনার ওষুধগুলো বুঝিয়ে দেই।

ডাক্তারের সাথে দেখা করে এসে মুনের কেবিনে গেলাম।আম্মু মুনের হাত ধরে বসে আছে।আমি যেতেই---

--তোরা কথা বল আমি তোর বাবাকে আর বেয়াই বেয়ানদের খবরটা দিয়ে আসি।


মা চলে গেল কেবিনের বাইরে।আমি একটা চেয়ার টেনে মুনের মাথার কাছে বসলাম।আমি এখনও নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছি না। বাবা হওয়ার অনুভূতি এতটা  আনন্দময় তা বাবা না হতে পারলে  বুঝতাম না।

--মুন কেমন লাগছে আপনার?

--হু ভালো।আচ্ছা আমার কি হয়েছে?ডাক্তার তো আমায় কিছু বলে নি।আম্মু ও চুপচাপ ছিলো।কান্না করছিল।আর কিসের খবর দেওয়ার কথা বলল?এমন করে মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম কেন?

--ওরা কিছু বলে নি?

--না তো অনেক বার জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু বলল আপনি এসে বলবেন। রাশেদ আমার কি খারাপ কিছু হয়েছে? আমার থেকে কিছু লুকাবেন না প্লীজ।


মুনকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা আদর দিয়ে বললাম--অনেক ভালোবাসি আপনাকে বউ।এতো বড় একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। 

--রাশেদ আমি কি সারপ্রাইজ দিলাম?

--মুন আমাদের একটা ছোট্ট বেবি আসছে। এই যে আপনার এই পেটের মধ্যে সে আছে। কয়েকদিন পর আপনাকে আম্মু আর আমায় বাবাই বলে ডাকবে। 

মুন খুশিতে কান্না করে দিলো।এই অনুভূতি টা বাবার চেয়ে মায়েদের হয়তো বেশি। মায়েরা তো তার আসার অস্তিত্ব  টের পায় মুন পেটে হাত রেখে বলল,

--রাশেদ আপনি সত্যি বলছেন। আমাদের পুঁচকে হবে।

--হুম তো বউ। আপনার মতো দেখতে একটা লক্ষ্মী মেয়ে বাবু  হবে আমাদের। এবার থেকে আপনাকে অনেক সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। কোনো কাজ করা চলবে না। শুধু বিশ্রাম করবেন। মনে থাকবে?

--সারাদিন বিশ্রাম নিলে বাসার কাজ করবে কে?সময়মত আম্মুর ওষুধ  দেওয়া। বাবার যত্ন নেওয়া এসব কে করবে?

--এসব কাজ করার জন্য আমি দুজন খালাকে বাসায় আসার জন্য বলে দিয়েছি। ওনারা বাবা মায়ের খেয়াল রাখবে আর আপনার খেয়াল রাখার জন্য আমি আছি। বাবার সাথে কথা বলে আমি অফিসে কাজ বাসায় বসে করবো। আপনার দেখা শুনা হবে আর কাজের ক্ষতি হবে না।

--রাশেদ আপনি প্লীজ এমন করবেন না।সবাই কি ভাববে?

--যা ভাবার ভাবুক আমার কি!


আম্মু এসে বলল, রাশেদ যা বলছে একদম ঠিক বলেছে। মুন মা তুই শুধু রেস্ট নিবি। রাশেদ তোর বাবার সাথে কথা বলেছি। বেয়াই বেয়ানকেও বলে দিয়েছি। ওনারা রওনা  দিয়েছে বাসা থেকে।

নার্স এসে বললো,"অভিনন্দন ম্যাম এন্ড স্যার। আপনারা চাইলে ম্যামকে বাসায় নিয়ে যেতে পারেন। এই যে ওনার ওষুধ গুলো।ম্যাম এখন থেকে নিজের প্রতি আরো যত্নশীল হতে হবে। ভালো থাকবেন সবসময়। স্যার ম্যামকে সবসময় হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করবেন‌।কোনো রকম টেনশন যেন না করে এতে কিন্তু বাচ্চার ক্ষতি হবে।

--জি আমরা খেয়াল রাখবো।


রাতে মুনকে বাসায় নিয়ে আসলাম। মুনের মা বাবাও এসে গেছে।সবাই অনেক খুশি। অনেক বছর পর আমাদের বাড়িতে নতুন কেউ আসতে যাচ্ছে। সবাই খুব এক্সাইটেড।

----------------------------------------------------------

ধীরে ধীরে নয় মাস কেটে গেলো। মুনের পেটটা অনেক বড় হয়ে গেছে। আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়ে গেছে। 

--বঊ আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে।একটা চুমু খাই।দেখুন আপনার চুমুর অভাবে আমি আস্তে আস্তে শুকিয়ে যাচ্ছি।

--রাশেদ আম্মু আছে কিন্তু। 

--আম্মু থাকলে কি হয়েছে?আমি তো আমার বিয়ে করা আইনগত বউকে চুমু খেতে চাইছি। 

--ভালো হচ্ছে না কিন্তু।

মনভার করে বসে রইলাম।মুন এসে টুপ করে দু'গালে দুইটা চুমু খেলো।

--আহহহহ শান্তি। বউ আপনি যদি আমায় এই মুহুর্তে চুমু না দিতেন তবে আমি কঙ্কাল হয়ে যেতাম।অন্তরটা কেমন মরুভূমিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।এখন আবার আইসল্যান্ডের মতো হয়ে গেছে।

--হিহিহি। কত্ত ড্রামা  করতে পারেন আপনি!

--এই হাসিমুখটা দেখার জন্য আমি সারাজীবন ড্রামা করতে চাই।

মুন আমার গাল দুটো টেনে দিয়ে বলল--হুম হুম আমার ড্রামা কিং আমিও আপনাকে অনেক ভালোবাসি।

--বউ আমায় একটু অফিসে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি চলে আসবো। আপনি কিন্তু রুম থেকে বের হবেন না।আমি যাবো আর আসবো।

--আচ্ছা আমি গোসল করে নামাজ পড়ে নেই তবে।ততক্ষণে চলে আসবেন কিন্তু।

--ঠিক আছে। গোসলে যাওয়ার আগে ফলগুলো খাওয়া শেষ করুন।

--আমার খেতে ইচ্ছে করছে না। দেখুন আমি কত মোটু হয়ে গিয়েছি!!

--হন তো আরো মোটু।মোটু হলেও আমার ,পাতলু হলেও আমার।আপনাকে খেতেই হবে। আপনার খাওয়া শেষ হলে তবেই বের হবো নইলে যাবোই না।

--আচ্ছা খেয়ে নিচ্ছি।


মুনের খাওয়া শেষ হওয়ার পর আমি অফিসে গেলাম। বিদেশী একটা কোম্পানির সাথে একটা ডিল হচ্ছে।

অফিস থেকে বাসায় ফিরতে দেরী হবে তাই  ভাবলাম মুনকে কল দিয়ে জানিয়ে দেই। মুনকে কল দিলাম কিন্তু ধরলো না। আম্মুকে কল দিলাম।

--হ্যালো আম্মু ।মুন কোথায়?ওকে কল দিচ্ছি ধরছে না কেন?উনি ঠিক আছেন তো?

--হুম রাশেদ বাবা। বউমা একদম ঠিক আছে। তুই চিন্তা করিস না।আমরা সবাই আছি ।মুনমা এখন ঘুমাচ্ছে।

--ওহ আচ্ছা। ঘুম থেকে উঠলে বলে দিও আমার একটু দেরি হবে আসতে।একটা মিটিং আছে।

--ঠিক আছে বাবা। তুই সাবধানে থাকিস।

--আচ্ছা। তুমিও সাবধানে থেকো।


মিটিং শেষ করে সবাইকে তাদের কাজ বুঝিয়ে দিতে দিতে অনেক রাত হয়ে গেছে। মুনের জন্য কেমন কেমন লাগছে। আম্মুকে কল দিলাম রিসিভ করলো না। ভাবলাম হয়তো ঘুমাচ্ছে। অফিস থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠবো এমন সময় মুনের কল--

--হ্যালো মুন‌।সরি বউ একটু দেরি হয়ে গেছে।আমি এক্ষুনি আসছি। আপনার  জন্য ফুল নিয়ে আসবো।

--রাশেদ বাবা

--আম্মু তুমি! কোথায় ছিলে ?কল করেছিলাম রিসিভ করো নি কেনো?মুন কোথায়? সব ঠিক আছে তো।

--রাশেদ বাবা তুই এক্ষুনি হাসপাতালে চলে আয়।মুন সিড়ি থেকে পড়ে গেছে । ওকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। ওর অবস্থা ভালো না। তাড়াতাড়ি আয় বাবা।

হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেলো। খুব দ্রুত পৌঁছাতে হবে।আমার মুন ঠিক আছে তো? আল্লাহ আমার মুনের যেন কিছু না হয়। হাসপাতালে পৌঁছে আম্মুর কাছে গেলাম।

--আম্মু আমার মুন কোথায়?

--শান্ত হ বাবা।এতো অস্থির হোস না।

--আম্মু ওনি কিভাবে পড়ে গেল। তোমরা কোথায় ছিলে?

আমি আম্মুর কোলে রেখে কান্না করতে লাগলাম। 

--আম্মু আমার জন্যই এমন হয়েছে। আমি যদি তাড়াতাড়ি আসতাম এমন কখনোই হতো না। আল্লাহ তুমি আমার মুনকে ঠিক করে দাও। 

--রাশেদ বাবা তুই এমন বলিস না। মুন মায়ের কিচ্ছু হবে না। আল্লাহকে ডাক।

একটু পর ডাক্তার এসে বললো, "রাশেদ সাহেব আপনার মেয়ে হয়েছে। অনেক অনেক অভিনন্দন।"

----------------------------------------------------------

--রাশেদ তুমি এখানে!!কত বছর পর দেখা। কেমন আছো?

ঋতুর ডাকে অতীত থেকে ফিরে এলাম। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঋতু আর অতীতের ঋতুর পার্থক্য চোখে পড়ার মতো হলেও তার সে ভুবন ভোলানো হাসি আগের মতোই আছে!

--হুম আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। অনেক বছর পর দেখা। তুমি কেমন আছো?

--আলহামদুলিল্লাহ ভালো।

--এখানে কি মনে করে?

--বদলি হয়ে এসেছি এই কলেজে। একজন শিক্ষক নাকি অন্য জায়গায় চলে যাবেন। তাই নতুন শিক্ষক না আসা পর্যন্ত আছি। পরে আগের জায়গায় চলে যাবো। তুমি এখানে কি করছো? কোনো কাজে এসেছ?

--হুম। আমি এই কলেজে পড়াই।

--ওহ আচ্ছা। তোমার স্ত্রী কেমন আছেন?

উত্তর দিতে যাবো তক্ষুনি গাড়ি চলে আসলো। ভেতর থেকে বলে উঠলো,

--বাবাই তাড়াতাড়ি এসো আমাদের যেতে লেট হচ্ছে তো মাম্মাম অপেক্ষা করছে।

-এই তো মা আসছি।

--ঋতু আমি আজ আসি।মেয়েটা ডাকছে।

--রাশেদ তোমার সাথে......


***চলবে***


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।