প্রাক্তন (পর্ব ০৮)

প্রাক্তন (পর্ব ০৮)
প্রাক্তন (পর্ব ০৮) 


প্রাক্তন (পর্ব ০৮)
মিশিতা চৌধুরী

প্রথম পাতায় খুলতেই দেখি একটা ছবি।ছবিটা অস্পষ্ট। কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। ছবিটার পেছনে লেখা, "তুমি আমার না পাওয়া ভালোবাসা। যাকে মনের ভেতরের একটু একটু করে লালন করে যাই রোজ।

দ্বিতীয় পাতায় লেখা,"তোমায় যেদিন প্রথম দেখি তোমার গায়ে নীল শার্ট। জানো নীল রঙে তোমায় দারুন মানায়।এতো সুন্দর কেন তুমি!তোমার একটা ছবি তুলে রাখলাম। কিছু মনে করবে না তো!! রোজ ছবিটা দেখি আর ভাবি এতো মায়া কেন তোমার ওই মুখে!!!

তোমার সম্পর্কে না জেনেই তোমায় ভালোবেসে ফেলি। তুমি দেখতে এতোটাই সুন্দর অন্য কিছু ভাবার সময় পাই নি। তোমায় খুব ভালোবাসি প্রিয়।"

তৃতীয় পাতা,"আজ জানতে পারলাম তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসো। তুমি হয়তো কখনো জানতেই পারবে না তোমায় আমি কতখানি চাই। হৃদয়ের আনাচে কানাচে ঘুরে একবার যদি দেখতে তবে বুঝতে প্রিয় তোমার জন্য হৃদয় নামক বস্তুটা কেমন হাহাকার করে। তুমি জানতেই পারলে না একটা মানুষ দূর থেকে তোমায় ভালোবেসে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।"

চতুর্থ পাতা,"জানো র.....।না তোমার নাম মুখে নেওয়ার অধিকার নেই আমার। শুধু জেনে রেখো একটা মানুষ সারাজীবন অপেক্ষা করে যাবে। আল্লাহর কাছে রোজ মুনাজাতে চাইবে। তুমি খুব ভালো থেকো। 

পঞ্চম পাতা,আজ জানতে পারলাম তুমি যাকে ভালোবাসো সে.......


মুন ছোঁ মেরে হাত থেকে ডায়েরিটা নিয়ে নিলো।

- রাশেদ আমার সব জিনিসে আপনার অধিকার আছে কিন্তু আমায় না জানিয়ে আমার ডায়েরিটা পড়া উচিত হয়নি।

-সরি মুন।আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে ডায়েরিটায় হাত দিয়েছি। আপনিও ছিলেন না। আমার খুব বোরিং লাগছিল তাই। আমি দুঃখিত।

ডায়েরিটা রাখতে রাখতে বলল, "ঠিক আছে। আপনার বোরিং লাগছে কেন? ভ্রু কুঁচকে বললো,"আপনি কি আমায় মিস করছিলেন?"

-না তেমন না। আসলে...

-হুম মিস করবেন কেন। আমি আপনার কেউ নই। রেডি হয়ে নিন আমাদের বের হতে হবে।।


"মুন কি আমার উপর রাগ করেছে?"ওই ডায়েরিটা কাকে নিয়ে লেখা।ছবিটা অস্পষ্ট হলেও কেমন যেনো চেনা চেনা লাগলো। সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।মুন যদি অন্য কাউকে ভালোবাসে তবে আমায় বিয়ে করলো কেন?"

সন্ধ্যার পর ওদের বাসা থেকে বের হবো। এমন সময় মুন এসে বললো, চলুন যাই এবার?"


মুনের দিকে তাকালাম। থ হয়ে গেলাম।আজ ওকে খুব সুন্দর লাগছে। একটা কালো শাড়ি আর হালকা গহনাতে অপূর্ব লাগছে।

-আমার দিকে বারবার না তাকিয়ে সামনে তাকান ।

ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললাম,"আমি তো আপনার দিকে তাকাচ্ছি না। ওপাশটা দেখছিলাম।"

-গাড়ি চালানোর সময় সামনের দিকে তাকাতে হয়। হুলো বিড়ালের মত উঁকি ঝুঁকি মারতে হয় না।

-কিহহহ আপনি আমায় হুলো বিড়াল বললেন!!

-এখানে আপনি ছাড়া আর কেউ আছে কি!

-আমি যদি হুলো হই তবে আপনি একটা একটা ....না থাক বলবো না।

-বলুন তো শুনি‌। 

-আপনি অপ্সরা।

মুন মুচকি হেসে বলল,"ওহ আচ্ছা" 

গাড়ি চালানোয় মন দিলাম। একটু পর গাড়ি থামালাম।

-আপনি একটু বসুন আমি আসছি ।।ছোট্ট একটা কাজের কথা মনে পড়ে গেল।

-কোথায় যাচ্ছেন?

-আসছি।

পাশে একটা ফুলের দোকান থেকে মুনের পছন্দের ফুল নিলাম। গিয়ে দেখি গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।আমায় দেখে বলল--

-কোথায় গিয়েছেন আমায় রেখে? 

-নিন ম্যাডাম।

অবাক হয়ে বললো,"এগুলো আমার জন্য?"

আমি দুষ্টুমি করে বললাম--

-না আমার আরেকটা বউ আছে তার জন্য। আপনার কাছে রাখতে দিচ্ছি।পরে নিয়ে নেব।

-এই মিয়া আপনার আরেকটা বউ আছে মানে!!! আপনার তো একতরফা একটা ভালোবাসা ছিল। বউয়ের কথা তো জানতাম না!

-ওহহহ জানতেন না। কি ভুলটাই না করলেন এবার কি হবে!

-ওই সাঁকচুন্নিটা কে শুনি?

-মুন আপনি জেলাস!!! ও মাই গড।

একটু গাল ফুলিয়ে বলল"মোটেই না।আমি কেন জেলাস হব?"

-"নাকটা কেমন লাল হয়ে গেছে আপনার!

-সত্যি আরেকটা বউ আছে?

-হাহাহা। মজা করছিলাম।


মুন আমায় জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিল,"আপনি আমার সাথে এমন মজা করবেন না কখনো।আমি কোনো কিছুর বিনিময়ে আপনাকে হারাতে পারবো না। 

আলতো করে চোখের পানি মুছে দিয়ে বললাম",মুন আপনি কাঁদছেন কেন?আমি তো মজা করছিলাম আপনার সাথে।আমি আছি আপনার পাশে সবসময়। আর কখনো কান্না করবেন না।"

-রাশেদ আমি জানি আপনি অন্য কাউকে ভালোবাসেন।অন্য কাউকে নিয়ে আপনার স্বপ্নগুলো সাজানো।আমি সেখানে হুট করে ঢুকে পরেছি।কখনো আপনার মনে আমার জন্য জায়গা হবে কিনা জানিনা। কিন্তু একটা কথা বলতে চাই আমায় ভালোবাসতে হবে না আপনার। কোনো অধিকার দিতে হবে না।শুধু যত দিন বাঁচি আপনার পাশে থাকতে চাই। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আপনার সেবা করতে চাই। আপনার কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চাই।


আমি চুপ করে মুনের কথাগুলো শুনছিলাম। মেয়েটার মনে অনেক কষ্ট জমা আছে। মন ভরে কাদুঁক। কাঁদলে মনটা হালকা হবে। অনেকক্ষণ পর মুন আমায় ছাড়লো।

-সরি রাশেদ আমি একটু বেশি ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলাম। আপনি আমায় ক্ষমা করে দেবেন।

-হুম ক্ষমা করতে পারি একটা শর্তে।

-শর্ত!!!

-হুম শর্ত।

-কি শর্ত বলুন?

-শর্তটা হলো এই যে আপনি আমায় তুমি করে বলবেন। 

-রাশেদ আমি আপনার এই শর্তটা মেনে নিতে পারছি না।

-কেন?

-আপনি শব্দটা আমার কাছে খুব স্পেশাল। আপনি ডাকে একটা মায়া কাজ করে। তুমি ডাকলে মানুষ আপন হয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। কিন্তু আপনি ডাকে একটা অদ্ভুত টান আছে। এটা আমার নিজস্ব মতামত।তাই আমি আপনাকে আপনি বলে ডাকবো। 

-মুন একটা অনুরোধ রাখবেন?

-কি অনুরোধ?

-ইয়ে মানে

-জড়তা না রেখে আপন ভেবে বলে ফেলুন।

-আমায় আপনার বন্ধু করবেন?

-হিহিহি।এটা বলতে এতো আমতা আমতা।

-হুম করবো।তবে বন্ধু মানে জানেন তো?

-কি?

-বন্ধু মানে সুখে দুঃখের সঙ্গী। বন্ধুত্ব এমন একটা সম্পর্ক যা কখনো কোনোদিন মুছে যায় না নষ্ট হয় না ‌। বন্ধু মানে ভালো,মন্দে, বিপদে আপদে সবসময় পাশে থাকা।সব কিছু শেয়ার করা।

-হুম ।আমি আপনার খুব ভালো বন্ধু হবো। 

মুন হেসে বলল,"ঠিক আছে। এবার চলুন সবাই চিন্তা করছে।বেশি দেরি হলে বকা খেতে হবে।"

অনেকদিন পর খুব ভালো লাগছে। নিজেকে খুব নতুন লাগছে। নিজের কাছে নিজে প্রমিস করলাম মুনকে খুব ভালো রাখবো। ও কষ্ট পায় এমন কাজ কখনো করবো না।

---------------------------------------------------------


সেদিনের পর থেকে ঋতুর কথা মনে করতাম না।মুনের সাথে আমার দিনগুলো খুব ভালো কাটছে। 

ধীরে ধীরে অনেকগুলো মাস কেটে গেল। মুন আর আমার বন্ধুত্বটা আরো গভীর হয়েছে। যতদিন যাচ্ছে আমি মুনের প্রতি  দুর্বল হয়ে পড়ছি। ওর দায়িত্ববোধ, আমার  প্রতি খেয়াল রাখা, সবার যত্ন নেওয়া,আম্মু সেবা করা। সবকিছু আমায় তার প্রতি আকৃষ্ট করে চলেছে। আমার মনে হচ্ছে আমি মুনকে ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু মুন!!!

সেকি আমায় ভালোবাসে!!ওর মনে কি একই অনুভূতি কাজ করে? আমি তো কিছুই জানি না।ওর সেই ডায়েরী!!  কাকে নিয়ে লেখা!কার জন্য এতো ভালোবাসা জমিয়ে হাসি মুখে সবকিছু মেনে নিয়েছে!

ডায়েরীর কথাগুলো মনের ভেতর নাড়া দিচ্ছে বার বার।মুন কি তবে আমায় ছেড়ে চলে যাবে।ফোনের শব্দে চমকে উঠলাম। মুনের ফোনে একটা কল আসে। নাম্বারটা সুইটহার্ট দিয়ে সেভ করা। বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো।তবে কি এই সে মানুষ যাকে  মুন ভালোবাসে।ভয়ে বুকটা দুরুদুরু করতে লাগলো। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না। দু' দুই বার কল এসে কেটে গেল। নিজেকে শান্ত করে মুনকে ডাকলাম।

-মুন কোথায় আপনি? আপনার একটা কল এসেছে।

অনেক বার ডাকার পরও মুনের কোনো সাড়াশব্দ নেই।মনে পড়লো আম্মুর সাথে কেনাকাটা করতে গেছে। কলটা রিসিভ করা কি ঠিক হবে! সেবার ডায়েরিটা ধরেছি বলে অনেক রাগ করেছে। কলটা রিসিভ করে বলে দেই যাকে চাইছেন সে বাসায় নেই ।বাসায় আসলে বলবো কল দেওয়ার জন্য । কথাগুলো সাজিয়ে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে.........



***চলবে***


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।