রিয়াজ রাজ/ ভয়ংকর রহস্য ( পর্ব-০৫)

রিয়াজ রাজ/ ভয়ংকর রহস্য ( পর্ব-০৫)
রিয়াজ রাজ/ ভয়ংকর রহস্য ( পর্ব-০৫)


গল্পঃ ভয়ংকর রহস্য
পর্বঃ ০৫
লেখকঃ রিয়াজ রাজ
প্রকাশকালঃ জুলাই-২০২০
বিভাগঃ ভুতের গল্প


---------------------------
আয়নার ভিতর থেকে সেই বৃদ্ধ মহিলাটি বলে উঠলো, " তোকে বলেছিলাম এদের সাহায্য করিস না। এইবার মরার জন্য প্রস্তুত হয়ে যা"। রিয়াজ চোখ বড় করে ফেলে। আয়নার ভিতর থেকে মহিলাটা হাত বের করে রিয়াজের গলা চেপে ধরে। এতো শক্ত করেই ধরেছে,রিয়াজের মুখ দিয়ে লালা বের হতে লাগলো। নিজের জীবন বাচানোর জন্য রিয়াজ ছুটতে চেষ্টা করে। তখনি রিয়াজের কানে একটি আওয়াজ ভেসে আসে। আওয়াজটা রাকিবের। রিয়াজ মনে মনে ভাবতে লাগলো,আজকে আর তাদের রক্ষা নেই।

রিয়াজ আয়নার ভিতর সেই মহিলার দিকে তাকিয়ে আছে। মহিলার ভয়ংকর রুপটা রিয়াজকে মারার জন্য যথেষ্ট। একদিকে চেহারা দেখে ভয় পাচ্ছে,অন্যদিকে নিশ্বাস বন্ধ হচ্ছে। মৃত্যু খুব কাছে চলে আসে রিয়াজের। ওয়াশরুমে চটপট করতে থাকে। চোখ দুটো লাল বর্ণের আকার ধারণ করেছে।রিয়াজ নিশ্বাস রাখার চেষ্টা করেও সম্ভব করতে পারছেনা। সেই মুহূর্তে রিয়াজ শুনতে পায় আরো একটি আওয়াজ। একটা আওয়াজ ভেসে আসে ড্রইংরুম থেকে। কোন দেশের ভাষায় কথা বলছে তা বুঝতে পারছেনা রিয়াজ। আওয়াজটা ফিস ফিস করে আসলেও, পুরো বাড়ি শুনা যাচ্ছে। তার ভাষাগুলো কিছুটা এরকম,"হাসখুস সিয়াহচ্রি আহাসিয়াহ শাসিহা হুমুস শাহহ"। কানে মুখে কথা বলার সময় যেরকম ফিসফিস করে কথা বলা হয়,তেমন ভাবেই উচ্চারণ হচ্ছে ভাষাগুলো।আওয়াজটা রিয়াজের কান অব্দি পৌছানো মাত্র গলা হালকা হয়ে যায়। আয়নার সেই বৃদ্ধা মহিলা রিয়াজের গলা ছেড়ে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো। রিয়াজ ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে,টেবিল থেকে তৈরিকৃত কাঠিটা হাতে নেয়। শার্ট পড়েনি,খালি দেহে রিয়াজ ড্রইংরুমে আসে। এসে দেখে একজন পাঞ্জাবি পরিহিত লোক দাঁড়িয়ে আছে ড্রইংরুমে। উনার গলায় আর হাতে তসবিহ পড়ানো।খ্রিষ্টান ধর্মের ফাদারের মতো পোশাক পড়ে আছে। মাথায় পাগড়ী, হাতে তসবিহ, গায়ে পাঞ্জাবি আর উনার উজ্জ্বল চেহারা বিশিষ্ট একজন লোক। রিয়াজ বুঝতে পারেনি,উনি মুসলিম নাকি খ্রিষ্টান।উনার ভাষা শুনতেও অদ্ভুতরকমের। এদিকে রনি,রবি,জুয়েল আর রাকিব ফ্লোরে পড়ে আছে। জীবিত নাকি মৃত,সেটাও রিয়াজের অজানা। রিয়াজ লোকটির উদ্দেশ্যে বলল,

- কে আপনি। নাম কি আপনার? আমার বাসায় প্রবেশ করলেন কিভাবে।
- আমাকে চিনবেনা। আমার নাম রাসেল মজুমদার। দরজা বন্ধ ছিলো তাই দরজার ছিদ্র দিয়ে ঢুকতে হলো।
- অদ্ভুত তো! দরজার ঐটুকু ছোট একটা ছিদ্র দিয়ে আপনার মতো একজন মানুষ কিভাবে ঢুকবে। ওখান দিয়ে তো আঙ্গুল ঢুকানোও পসিবল না। আর তাছাড়া ছিদ্রের দুইপাশ কাচ দিয়ে লাগানো।
- আমাকে তুমি চিনো,কিন্তু দেখেছো এই প্রথম।মনে করে দেখো তো? কিছু মনে পড়ে?
- কি মনে পড়বে। এই ২৪ বছরের জীবনে কত কিছু করেছি। কোনটার কথা জিজ্ঞেস করছেন।
- একটা মহিলা কোনো এক জঙ্গলের মাঝে চিৎকার করছিলো। তুমি গিয়ে সেই মহিলার সাহায্য করছিলে।মহিলা প্রেগন্যান্ট ছিলো। তুমি সেই মহিলার গর্ভে থাকা শিশুটির জীবন বাচিয়ে ছিলে।
- হ্যা মনে পড়েছে। ঐ মহিলা ছিলো একটা জ্বীন। জ্বীনরাজ্য থেকে নাকি তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তার স্বামীকে নাকি কেও হত্যা করে,সেই মহিলার উপর দোষারোপ করেছিলো। কিন্তু আপনি জানলেন কিভাবে?
- আমি সেই মহিলার গর্ভে থাকা বাচ্চা জ্বীন। যাকে তুমি এই পৃথিবীতে আগমন করাতে সাহায্য করেছিলে।
- অদ্ভুত, আপনি তো অনেক বড়। বয়সেও আমার ছোট থাকার কথা। কিন্তু দেখতে তো আমার বাপের বড় দেখাচ্ছে।
- জ্বীন জাতির নিয়মটাই এমন।সেদিন আমার মা তোমাকে বলেছিলো, যেদিন তুমি মারাত্মক কোনো বিপদে পড়বে,সেদিন তোমাকে সাহায্য করবে। তাই আজ মায়ের হয়ে আমি আসছি।
- কোথায় এখন তোমার মা।
- মারা গেছে।
- ওহ,সো স্যাড। ওহহ সরি,মানে আমি দুঃখিত।
- আমার মায়ের খুনি কে জানো?
- তোমার মা কে হত্যা করা হয়েছিলো?
- হ্যা, আর সেই হত্যাকারী তুমি নিজে।( কথাটা শুনে রিয়াজের মাথায় যেনো আকাশ উপচে পড়লো।রিয়াজ কাপা গলায় বলল)
- আ,আপনার মামম মাকে আমি মারতে যাববো কেনো।
- ভয় পাচ্ছো কেনো। মায়ের ওয়াদা ছিলো তুমি মারাত্মক বিপদে পড়লে তোমাকে বাচাবে। আমি সেই ওয়াদা পূরন করেছি। কিন্তু এখন আমি মায়ের হত্যাকারীকে হত্যা করবো। এইটা আমার ওয়াদা। ভয়ের কিছু নেই,আমি তোমাকে ধীরে ধীরে মারবো। এতো সহজে মারবোনা। প্রতি মুহূর্তে ভয় দেখিয়ে মারবো।
- আরে আগে তো বলুন আমি কবে,কিভাবে হত্যা করেছি। সেদিনের পর তো তোমার মায়ের সাথে আমার দেখা হয়নি। কথাও হয়নি। তাহলে কিভাবে কি।
- সময় বলে দিবে কিভাবে কি হয়েছে। প্রস্তুত থাকো রিয়াজ সাহেব। ভয়ংকর মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিও।

কথাটা বলে জ্বীন অদৃশ্য হয়ে গেলো। রিয়াজ হাবার মতো দাঁড়িয়ে রইলো। যেখানে সে কিছু জানেনা,সেখানে এরকম শত্রু এলো কিভাবে। উপকার করে এই প্রতিদান? রিয়াজ ক্লান্ত হয়ে ফ্লোরে বসে পড়ে। মাথায় হাত দিয়ে চিন্তায় হারিয়ে যায়। ভাবতে ভাবতে এদিকে ফজরের আযান হয়ে গেছে। রিয়াজ মাথা উপরে তুলে রবির দিকে তাকায়। তাকিয়ে বুঝতে পারে, কেনো আত্মারা এই বাসায় প্রবেশ করতে পেরেছে। রবির দেহের রক্তটা জ্বলজ্বল করছে। তারমানে এসব অশুভ শক্তির রক্ত। সুমাইয়া মেয়েটিকে রিয়াজ আগে থেকেই চিনে। বেচে থাকতে মেয়েটি এক প্রকার ডাইনি ছিলো। মরার পরেও অশুভ হয়ে রয়েছে। এই অশুভ আত্মার রক্ত বাসায় ঢুকেছে বলেই,আত্মারা প্রবেশ করতে পেরেছে। মন্ত্র দিয়ে বাধা বাড়িটির সব বাধা নষ্ট হয়ে যায়।রিয়াজ বসা থেকে উঠে। এরপর সোজা রবির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। রিয়াজ কাঠির সাহায্যে রবির দেহের সকল রক্ত শুভ করে দেয়। এরপর দরজার সামনে গিয়ে দরজাটা খোলে। বাহিরে এখনো অন্ধকার। হালকা হালকা সাকালের আভাস ফুটে উঠছে। রিয়াজ দরজার বাহিরে গিয়ে বাসার সামনে বাগানে যায়। সেখানে একটি গোলাপ গাছ আছে,সেই গোলাপ গাছের ঠিক নিছে মাটির উপর একটি প্লাস্টিকের ঢাকনা আছে। ঢাকনাটা সরিয়ে রিয়াজ মাঠি খুড়তে লাগলো।মাটি নরম,তাই হাত দিয়েই খুড়া সম্ভব। মাটি খুড়ার পর একটি মাটির পাত্র বের করে। মাটির পাত্রটি হাতে নিয়ে রিয়াজ চোখের পানি ছেড়ে দেয়।এরপর সেই মাটির পাত্রের দিকে তাকি রিয়াজ আস্তে আস্তে বলতে লাগলো, " তোমাকে আমি মুক্তি দিতে পারিনি। আর আমি দুঃখিত, না জেনে বাসায় অপবিত্র জিনিষ প্রবেশ করিয়েছি।আমি বুঝতে পারিনি সুমাইয়ার রক্তের কারণে তুমি কষ্ট পাবে। আমি বুঝিনি,তুমি মৃত্যুর পরেও আমার সঙ্গে অভিমান করে চলে যাবে। আমি সত্যিই দুঃখিত। এমনটা আমি কখনো চাইনি।কিন্তু হয়ে গেলো।বিশ্বাস করো,এইটা সম্পুর্ন আমার অজান্তে হয়ে গেছে। আজ তুমি পাশে নেই বলে আত্মারা আমার গলা চেপে মারতে চেয়েছে।আজ তুমি নেই বলে জ্বীনের বাচ্চা আমাকে মারার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।আজ তুমি নেই বলে অন্য জগতের অশরীরা আমাকে জ্বালাতন করছে"। কথাগুলো বলেই রিয়াজ কান্না করতে লাগলো। আর তখনি রিয়াজের পিছন থেকে জুয়েল বলল,

- কে তুমি? কি উদ্দেশ্য তোমার? আর আমাদের তুমি ব্যবহার করছো নাতো?

জুয়েলের কন্ঠ শুনে রিয়াজ ঘাবড়ে যায়। মাটির পাত্রটি পিছনে লুকিয়ে রিয়াজ জুয়েলের সামনে দাঁড়ায়। এরপর বলল,

- এইটা কেমন প্রশ্ন?
- তোমার সব কথা শুনেছি আমি। তানিয়াকে হত্যা করেছি আমরা।কিন্তু আমাদেরকে তানিয়ার আত্মা কিছু করছেনা,আমাদের পিছনে অন্য আত্মারা লেগেছে। তোমার কথার দ্বারা আমি বুঝতে পারছি তোমার অতীতে এমন কিছু হয়েছে,যার জন্য তুমি অনেক বেশি চিন্তিত। তোমার সাথে অন্য জগতের মানুষদের সঙ্গে একটা লড়াই নিশ্চয় আছে। তুমি আমাদের ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করে যাচ্ছো। সত্যি করে বলো তুমি কি চাও। আর সে কে,যার সঙ্গে তুমি এখন কথা বলেছো।
- চুপ যাও।অনেক বলেছো,আর নয়। আমার ব্যাপারে কিছু জানার চেষ্টা করবানা। আমি তোমাদের কারো ক্ষতিও চাইনা।আমি তোমাদের উপকার করার জন্যেই কাজ করছি। আর আমি তোমাদের ব্যবহার করছিনা মোটেও।ভুল ধারণা থেকে বের হও। ( এমন সময় জুয়েলের পিছন থেকে রনি,রবি আর রাকিব বের হয়ে আসে।রনি জুয়েলের পাশে এসে বলল,)
- বাহহ রিয়াজ সাহেব বাহ। কিছু সময় পূর্বেও আমরা আপনি ছিলাম,আর এখন আপনি থেকে তুমি হয়ে গেলো? তুমি তো মনে হচ্ছে সত্যিই কোনো গেম খেলছো।এমনটা নয়তো? সেই আত্মাদের তুমি নিজে আমাদের পিছনে লাগিয়েছো?
রাকিব বলল,
- ঠিক বলেছিস রনি। এর উপরে আমার তখনি সন্দেহ হয়েছিলো,যখন সে শর্ত হিসেবে আমাদের কবরস্থান পাঠায়। হতে পারে এই রিয়াজ সাহেব আমাদের পিছন আত্মা লাগিয়ে দিয়ে ভয় দেখাচ্ছে।আর এখন নিজের কাজ সম্পুর্ন করছে।
রবি বলল,
- এই মাটির পাত্রে কি আছে? তুমি কার সাথে কথা বলছো এতক্ষণ?
রিয়াজ বলল,
- কিছু নেই এই মাটির পাত্রে। খবরদার কেও হাত লাগাবেনা এখানে।

রবি রিয়াজকে ধাক্কা দিয়ে মাটির পাত্রটি হাতে নিয়ে নেয়। রিয়াজ ধাক্কার সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যায়। মাটি থেকে উঠে রিয়াজ পাত্রটি নিতে আসলে, জুয়েল রিয়াজের নাকে ঘুষি মেরে দেয়। রিয়াজের নাক ফেটে রক্ত বের হতে লাগলো। রিয়াজ আবার পড়ে গেলো মাটিতে। রবি মাটির পাত্রটি খুলতে চাচ্ছে,রিয়াজ মাটি থেকে কান্না করতে করতে বলল," প্লিজ,পাত্রটি খুইলোনা কেও। নাহলে অনেক বড় বিপদ হয়ে যাবে। দয়া করে পাত্রটি খুইলোনা কেও,প্লিজ আমার অনুরোধটা রাখো"। রবি রিয়াজের কথায় কান না দিয়ে পাত্রটি মাটিতে জোরে ছুড়ে মারে। পাত্রটি ভেঙ্গে যায় তখনি। রিয়াজের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। জুয়েল,রনি,রবি আর রাকিব পাত্রটির দিকে তাকিয়ে রইলো। পাত্রের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে কিছু মাটি আর মানুষের ছোট ছোট হাড়। হাড় আর মাটি ছাড়া পাত্রে কিছু নেই। রিয়াজ রাগে মাটি থেকে উঠে রবির কলার চেপে ধরে। রবি উল্টো রিয়াজের পেটে লাথি মেরে দেয়। রবির পর রনি এসে রিয়াজের বুকে ঘুষি মারে ২টা। রিয়াজ বুক ধরে দুই তিন হাত পিছন চলে যায়, এরমধ্যে আবার জুয়েল এসে রিয়াজের বুকে লাথি মারে। রিয়াজ উড়ে গিয়ে সেই গোলাপ গাছের উপর পড়ে। গোলাপ গাছ সঙ্গে সঙ্গে ভেঙ্গে যায়।রিয়াজ গোলাপ গাছ ধরে আরো জোরে কান্না করতে লাগলো। বুকের মধ্যে এরা অনেক বেশি আঘাত করে ফেলেছে। বুকের ব্যাথায় রিয়াজ উঠে দাড়াতেও পারছেনা। জুয়েল বলল,
- তুই চিপায় আমাদের দিয়ে কাজ সারতে চেয়েছিলি। নে এবার কাজ কর। আজ থেকে আমার চোখের সামনে আসবিনা।নয়তো খুন হয়ে যাবি।

এইটা বলে জুয়েল আবার রিয়াজের পেটে লাথি মারে। রিয়াজ পেটে হাত দিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লো। এদিকে সূর্য উঠে গেছে। চারদিক পাখিদের গান শুনা যায়।রবি গিয়ে বাড়ির গেট খেলে,এরপর ওরা চারজন রিয়াজের বাসার সামনে এসে ওদের গাড়িতে উঠে। আর সোজা রিয়াজের বাড়ি ছেড়ে চলে গেলো। রিয়াজ মাটিতে শুয়ে সেই হাড়টা বুকে জড়িয়ে শুয়ে আছে। চারদিক ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে রিয়াজের। মুখ দিয়ে পানি বের হচ্ছে। চারদিক ঝাপসা হয়ে আসছে। অবশেষে জ্ঞান হারালো রিয়াজ সেখানেই।

এদিকে জুয়েল,রবি, রনি আর রাকিব গাড়িতে করে বাসায় আসছে। সকাল সকাল পুলিশের ঝামেলা নেই। তাই নির্ভয়ে বাসায় এসে পৌঁছায় ওরা। জুয়েল বাসায় গাড়ি রেখে বাকিদের বলল," কাল সারারাত তো ঘুমাইনি কেও।সবাই একটা ঘুম দে,বিকেলে দেখা হবে"। জুয়েল তার বাসায় উঠে যায়।ওদিকে রনি,রবি আর রাকিব যে যার বাসায় হেটে চলে গেলো। রাকিব বাসায় গিয়ে ফ্রেস হতে যায় ওয়াশরুমে। ভালোভাবে ফ্রেস হয়ে রাকিব নিজের রুমে আসে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিপাটি করলো। এরপর তার আম্মুকে বলল খাবার দিতে। বড়লোকের ছেলে। জবাব দিতে হয়নি কোথায় গিয়েছিলো। তার আম্মু কাজের মেয়ের হাতে খাবার পাঠিয়ে দেয়। রাকিব খাবার খেয়ে দরজা বন্ধ করে ফেলে। এরপর বিছানায় গিয়ে লম্বা একটি ঘুমের জন্য প্রস্তুতি নেয়। চোখ লেগে আসবে আসবে,এমন সময় রাকিবের মনে হলো তার রুমে কেও আছে। রাকিব লাফ মেরে উঠে বসে বিছানায়। বালিশের নিচ থেকে ফোনটা বের করে রাকিব রনিকে কল দেয়।রনি কল রিসিভ করতেই রাকিব বলল,

- রনি, আমরা রিয়াজকে ছেড়ে এসেছি এইটা ঠিক। কিন্তু রিয়াজের কাছে আমরাই গিয়েছিলাম প্রথম। রিয়াজের সঙ্গে দেখা হবার আগেও কিন্তু ভৌতিক ঘটনা ঘটেছিলো। এখন যে হবেনা,তার কি গ্যারান্টি?
- টেনশন নিস না বন্ধু। রিয়াজকে আমি যতদূর চিনি,ছেলেটা কারো ক্ষতি চায়না।হয়তো নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য আমাদের ব্যবহার করেছে। কিন্তু এমন ঘটনার পর আর আমাদের ডিস্টার্ব করবেনা।
- এই কথার ভিত্তি কতটুকু? দেখ,আমি তোদের মতো জ্ঞানী নয়। কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে আমরা ভুল কিছু করে ফেলেছি।
- এমনটা মনে হচ্ছে কেন?
- একটু আগে মনে হয়েছিলো আমার রুমে কেও একজন ছিলো। তবে রুমে কেও নেই।কিন্তু আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি আমার রুমে কেও হাটাচলা করেছে।
- এতো এতো ঘটনা ঘটেছে তো? তাই হয়তো এমন মনে হচ্ছে। এরকম কিছু নয়।
- ও,আচ্ছা ঠিক আছে।
- হুম।এখন আমি ঘুমাবো। তুইও ঘুমিয়ে পড়।
- হুম।

রাকিব কল কেটে আবার ঘুমের জন্য প্রস্তুতি নেয়। চোখ বন্ধ করতেই আবার রাকিবের রুমে কেও হাটাচলা করছে।রাকিব আবার লাফ মেরে বিছানায় বসে। তখনি রাকিব অনুভব করে খাটের নিছে কিছু একটা ঢুকে পড়েছে। রাকিব ভয়ে এক চিৎকার মারলো। সাথে সাথে রাকিবের মা বাবা ওর রুমে ছুটে আসে।ওর মা বাবা দরজা ধাক্কাচ্ছে।রাকিব দৌড়ে গিয়ে দরজা খোলে। উনারা রাকিবের রুমে আসতেই রাকিব আবার দৌড় মেরে খাটের নিছে তাকায়।রাকিব দেখে খাটের নিছে কিছু নেই। পুরো ফাকা।ওর মা বাবা জিজ্ঞেস করাতে রাকিব বলল," খারাপ স্বপ্ন দেখেছিলো।তাই ভয় পেয়েছে। রাকিবের মা বাবা ওর কথায় আর পাত্তা না দিয়ে চলে যায়। রাকিব কাজের মেয়েকে রুমে ডাকে। কাজের মেয়ে রাকিবের রুমে এসে হাজির হয়। রাকিব কাজের মেয়েকে বলল,

- তুই সোফায় বসে থাকবি। আমি ঘুম থেকে না উঠা অব্দি রুম থেকে বের হবিনা।
- কিন্তু সাহেব এহনো তো আমার বাইরে কাজ বাকি রইয়া গেছে।
- একটা থাপ্পড় মেরে তোর সব কাজ ভুলিয়ে দিবো। যা করতে বলেছি সেটাই কর।
- জ্বী আচ্চা,আমি এইহানে বইসা থাকুম।
- হুম।

রাকিব দরজা বন্ধ করে আবার খাটে শুয়ে পড়ে। কাজের মেয়ে মিতু সোফায় বসে আছে। এদিকে কাজের মেয়ে মিতু থাকা শর্তেও রাকিবের ভয় কাটছেনা। রাকিব মিতুর দিকে একবার তাকায়,আরেকবার চোখ বন্ধ করে। কিছুতেই রাকিবের ঘুম ধরছেনা।অবশেষে রাকিব আবার বিছানা থেকে নেমে মিতুর কাছে এসে বলল,

- এই,তুইও আমার সাথে বিছানায় আয়।
- ছিহ সাহেব,আপনে এইডা কি কইলেন। আমি বাহিরে চইলা যামু।ছাড়েন আমারে।
- এই,তোকে বিছানায় যেতে বলছি। বেশি কথা বললে ব্যলকনি থেকে ফেলে দিবো।
- দয়া কইরা এমন কাজ কইরেন না সাহেব। আমার এহনো বিয়া হয়নাই। মাইনষে হুনলে আমার চরিত্রে কলঙ্ক লাইগা যাইবো।
- তুই বিয়ে করিস নি? তোর বফ আছে?
- না সাহেব।আমরা গরিব মানুষ। আমাগো এসব করার সময় কই।পেট চালাইতে তো দিন চইলা যায়।
- তুই ভার্জিন?
- এগুলা কি কন সাহেব।
- এই শুন,তোকে আমি ১ হাজার টাকা দিবো। চল বিছানায়।
- না সাহেব,আমরা গরিব হইবার পারি।তবে বেশ্যাগিরি কইরা খাইনা।
- ৫ হাজার দিবো।
- এসব বইলেন না সাহেব।টাহা দিয়া লোভ দেখাইয়া লাভ নাই।আমি পারুম না।
- যাহ,৫০ হাজার দিবো। এইবার তো আয়।
- সাহেব,আমারে যাইতে দেন।আমি পারুম না কিছু করতে।
- তোকে কিভাবে সোজা করতে হয়,তা আমার জানা আছে।

এইটা বলেই রাকিব মিতুর ওড়না টেনে নিয়ে যায়। মিতু বুকে হাত দিয়ে দৌড় দিতে যাবে,তখনি রাকিব মিতুকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় ফেলে দেয়। মিতু বিছানার এক কোনায় গিয়ে গুজে বসে বসে কান্না করছে। আর অনুরোধ করে যাচ্ছে," সাহেব আমার এমন সর্বনাশ কইরেন না।আমি আপনাগো বাসা ছাইড়া দিমু।তবুও আমারে ছাইড়া দেন"। রাকিব মিতুর কথা কানেও তুললো না। বিছানার নিছে দাঁড়িয়ে প্যান্ট খোলার জন্য প্রস্তুতি নিবে,ওমন সময় রাকিবের পেট দিয়ে বিশাল বড় একটা নখ বের হয়। মিতু হা করে তাকিয়ে আছে। মিতু দেখে,রাকিবের পিছনে একটা যুবক ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ংকর মুখ,তার উপর পুরো দেহ রক্তাত্ব।মিতু ছেলেটিকে দেখেই জোরে একটা চিৎকার দেয়। এদিকে রাকিবের পিঠে আত্মাটা নখ ঢুকিয়ে পেট দিয়ে বের করে। রাকিবের মুখ থেকে গরগর করে রক্ত বের হতে থাকে।আত্মাটা রাকিবের পেট থেকে নখ বের না করে,পুরো পেট কেটে দেয়। রাকিবের পা থেকে কোমর অব্দি ফ্লোরে পড়ে যায়,আর পেট থেকে উপরের অংশ ঢুলে বিছানায় পড়ে গেলো।এদিকে মিতুর চিৎকারে রাকিবের মা বাবা দরজা ধাক্কানো শুরু করে। মিতু দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলতেই রাকিবের মা বাবা দেখে,তাদের সন্তানের দেহ ২ভাগ হয়ে আছে। মিতু মাথা ঘুরিয়ে দেখে,রাকিবের হত্যাকারী সেই যুবক ছেলেটি ওখানে নেই।

বিকেল ঘনিয়ে এসেছে। মিতুকে কারাগারে বন্দি করেছে পুলিশ। রাকিবের হত্যাকারী মিতু, এইটা সবাই শিওর হয়ে আওয়াজ তুলছে। রনি,রবি আর জুয়েল রাকিবের মৃত্যুর খবর শুনেই দৌড়ে আসে। এসে দেখে রাকিবের দেহ দুই টুকরো হয়ে আছে। ওরা রাকিবের লাশ এক পলক দেখেই কান্না করতে করতে ছাদে চলে যায়। ছাদে গিয়ে রনি বলতে লাগলো,

- আমি শিওর। আমি ১০০% শিওর এইটা আত্মাদের কাজ।মিতু এই খুন করেনি। বেচারির উপর খুনের দায়ভার দিয়ে গেছে আত্মা গুলো।
জুয়েল বলল,
- তাহলে মিতু রাকিবের রুমে কি করছিলো।তাও দরজা বন্ধ করে।
রনি বলল,
- ওর মৃত্যুর আগে সে আমাকে কল দিয়েছিলো।তার রুমে নাকি কেও হাটাচলা করছিলো।হয়তো ভয় পেয়ে মিতুকে রুমে রেখেছিলো।

তাদের কথোপকথনের মাঝে ইন্সপেক্টর মিজান সাহেব ছাদে হাজির হয়।এসেই ওদের উদ্দেশ্যে বলল,

- কি নিয়ে কথা বলছো? তোমরা বলতে চাচ্ছো মিতু এই খুন করেনি? তাহলে কে করেছে? ( রনি থতমত খেয়ে উত্তর দিলো)
- না স্যার। তেমন কিছু না। না মানে আমরা হিসেব মিলাতে পারছিনা। মিতু রাকিবকে কিভাবে খুন করবে।আর কেনো বা খুন করবে।রাকিবের রুমে হত্যা করার মতো কোনো অস্র নেই। এরকম কোনো কিছু নাকি পাওয়া যায়নি। তো আমরা ভাবছি আরকি,এইটা অন্য কারো কাজ নয়তো?
ইন্সপেক্টর মিজান সাহেব বলল,
- আমিও তো সেটাই জিজ্ঞেস করছি। কে করেছে। নিশ্চয় তোমরা কাওকে সন্দেহ করছো। সে কে?আমি জানি তোমরা কাওকে নাতো কাওকে সন্দেহ করছো। আমাকে বলো কাকে।আমি রাকিবের খুনিকে অবশ্যই ধরবো।
- তুই আমার বাল ধরবি। আত্মাকে কিভাবে ধরবি। উল্টো আত্মা তোরে কাইটা দুই টুকরো বানাইবো( কথাটা রবি মনে মনে বলল)
জুয়েল বলল,
- দেখুন স্যার, আমরা কাওকে সন্দেহ করছিনা। আমরা যাষ্ট মিতুর ব্যাপার ভাবছি। মেয়েটি যে খুন করেছে এমন কোনো প্রুভ নেই। তবে এইটা কিভাবে হলো।ওটা নিয়ে কথা বলছিলাম।
- তারমানে তোমরা কিছু বলবেনা। ঠিক আছে,একদিন না একদিন তো আমি সব রহস্য বের করবোই। ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করো সোনামণিরা।

মিজান সাহেব চলে গেলেন। রনি,জুয়েল আর রনি হাফ ছেড়ে বাচলো। জোরে একটা নিশ্বাস নিয়ে স্থির হয়। এরপর রনি বলল,
- আচ্ছা, রাকিবের কথা সত্য নয়তো?
জুয়েল বলল,
- কোনটা?
- সে কল দিয়ে বলেছিলো আমরা কোনো ভুল করেছি। রিয়াজ হয়তো সত্য ছিলো। আমরা শুধু শুধু তাকে মেরে চলে এসেছি। আর পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ক্রমে গেছে,রিয়াজ ছাড়া কেও আমাদের হেল্প করতে পারবেনা।
রবি বলল,
- আমরা কি এখন রিয়াজের কাছে আবার যাবো?
জুয়েল বলল,
- আমরা তাকে যেভাবে মেরেছি। মনে হয়না সে আমাদের ক্ষমা করবে। তবে আমার কি মনে হচ্ছে জানিস?
- কি?
- রবি রিয়াজের যে মাটির পাত্রটি ভেঙ্গেছে,ওটা হয়তো রিয়াজের বিশেষ কিছু একটা ছিলো। আর এই আত্মারা এখনো আমাদের পিছনে লেগে আছে। হতে পারে সত্যিই এই আত্মাদের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক আছে। রিয়াজ তার স্বার্থ পূরন করুক আর না করুক।হতে পারে এর মাঝে সে আমাদের সত্যিই সাহায্য করছে। নয়তো কবরস্থানে গিয়ে আমাদের কেনো বাচালো। ওয়াশরুমে আমাদের আত্মারা ঘেরাও দিয়েছিলো। সেখানেও নিশ্চয় রিয়াজ আমাদের উদ্ধার করেছে। আমরা তো অজ্ঞান ছিলাম,তাই দেখিনি কিছু। কিন্তু রিয়াজ ছাড়া তো ওখানে কেও নাই। তাকে এইভাবে মারা উচিৎ হয়নি আমাদের। এমন না করলে হয়তো আজ রিফাত আমাদের ছেড়ে যেতো না।
রনি বলল,
- এখন কি ভাবছিস। ওর কাছে যাবি?
- হ্যা,দরকার হলে পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইবো। তাও আমাদের জীবন বাঁচাতে হবে। আর উপায় পাচ্ছিনা আমি।

এদিকে আকাশে মেঘ জমেছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। চারদিক অন্ধকার নেমে আসছে। রিয়াজ সেই বাগানের মাটিতে এখনো অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। বুকের মধ্যে সেই হাড়টি জড়িয়ে শুয়ে আছে।মেঘের গর্জন বাড়তে বাড়তে একসময় বৃষ্টি নেমে আসে। বৃষ্টির পানির ফোটায় রিয়াজের জ্ঞান ফিরে। বুক আর পেট খুব যন্ত্রণা দিচ্ছে তার। চোখ দিয়ে অজস্র পানি বের হচ্ছে।পানির ফোটা রিয়াজের পুরো দেহ ভিজিয়ে দিয়েছে। যন্ত্রণায় নড়তে পারেনা রিয়াজ। এক সাইড হয়ে শুয়ে আছে বাগানে। সারাদিন পেটে এক ফোটা পানি পড়েনি। তার উপর পেটে লাথি মারায়,প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব হচ্ছে। তখনি রিয়াজ দেখতে পায়,একটা বাচ্চা হেটে হেটে তার দিকে আসছে। রিয়াজ বাচ্চাটির দিকে চোখ দিতেই বুঝতে পারে,এইটা সাধারণ কোনো বাচ্চা নয়। সম্পুর্ন একটা অশরীরী। বাচ্চাটির হাতে ইয়া বড় বড় নখ। দাত অনেক বিশ্রী রকমের ভয়ংকর। বাচ্চাটির চোখ নেই,কেও যেনো উপড়ে ফেলেছে। রিয়াজ শুয়ে সেই বাচ্চাটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কারণ এখন এই বাচ্চার সাথে মোকাবিলা করার মতো শক্তি তার দেহে নেই। এখন সে এসেই,তাকে মেরে ফেলবে। রিয়াজ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেয়। পেটের মধ্যে হাত দিয়ে,চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলে। আর চোখের কোনা দিয়ে, টপটপ করে পানি ঝড়ছে। কিন্তু বৃষ্টির পানির কারণে,চোখের পানিটাও মুছে যাচ্ছে।



চলবে..........


গল্প- #ভয়ংকর_রহস্য ( পর্ব-৫)
লেখক- Riaz Raj

কি বুঝলেন। রহস্য কি বেড়ে গেলো? রিয়াজের সাথে অতীতে এমন কি হয়েছিলো,যা আজো আমাদের কাছে রহস্য? রনি,জুয়েল,রবি তাদের পিছনে যারা লেগেছে,এইটার সাথে কি সত্যিই রিয়াজ লিপ্ত ছিলো? নাকি ওটা শুধুই তাদের মনের ভুল? সেই জ্বীন রাসেল মজুমদার এমন কথা শুনিয়ে গেলো কেনো? রিয়াজ কি অজান্তেই তার জ্বীন মাকে মেরেছে? নাকি ওটা অন্য কোনো কারণ? রিয়াজকে এইভাবে মারার পিছনে কি জ্বীন রাসেল মজুমদারের হাত ছিলো? নাকি ওদের কেও যেভাবে চালাচ্ছে,তারা সেইভাবে চলছে? রিয়াজ মাটির হাড়ির সঙে কথা বলেছে,কিন্তু কাকে ইঙ্গিত করে? আর সুমাইয়া এবং শিশিরের সাথে রিয়াজের কি কোনো সম্পর্ক ছিলো? রিয়াজকে এইভাবে মেরেছে ওরা, এর শাস্তি কি ওরা পাবে? সব অশরীরী রিয়াজের বিরুদ্ধে,এখন কি মৃত্যুর পথটাই বেচে নিবে রিয়াজ? এই গল্পের কি সমাপ্ত এখানেই? রহস্য, ভয়ংকর রহস্য।


ঘটনামূলক মন্তব্য করবেন।আপনারা গল্প পড়ে মজা নেন,আর আমি কমেন্ট পড়ে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।