শঙ্কা - পর্বঃ ০৩ ও শেষ

শঙ্কা - পর্বঃ ০৩ ও শেষ - রিয়াজ রাজ
শঙ্কা - পর্বঃ ০৩ ও শেষ - রিয়াজ রাজ


গল্পঃ শঙ্কা
পর্বঃ ০৩ ও শেষ
লেখকঃ রিয়াজ রাজ
বিভাগঃ থ্রিলার গল্প

পর্ব ০২ পড়ুনঃ
--------------------------------------

বুড়ি ডাইনি আমার বুকে বসে,চেপে ধরে আমার গলা। তার থেকে রক্ষা পাবার জন্য,আমিও তার দুই হাত ধরে ধস্তাধস্তি শুরু করেছি। ততক্ষণে এইটাও বুঝে যাই, তার হাত দুটি অনেক চিকন।তবে হাতে কিছু লোম রয়েছে।বড় বড় লোম। যেনো কোনো বিড়ালের পা ধরেছি। চিকন আর ছোট হলেও,সেই হাতে অনেক শক্তি। আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে তার সাথে ধস্তাধস্তি করে যাচ্ছিলাম।

ধস্তাধস্তির একটা পর্যায়ে আমার হাত পিছলে যায়। অর্থাৎ চোখের সামনে বুড়িটা বাতাসে মিশে যায়। আমার সারা অঙ্গ বেয়ে ঘাম ঝরে যাচ্ছে। মনে হলো যুদ্ধ করেছি কিছুর সাথে। মনে হবার কি আছে আবার,এটি যুদ্ধের চেয়েও কম কিসে। আমি আমার জান বাঁচাতে যুদ্ধ করেছি। কিছুক্ষণ শ্বাস স্থীর করতে কেটে যায় আমার। পরক্ষণে কানে বেজে উঠে আযানের ধ্বনি। আমি বিছানা ছেড়ে অজু বানাতে চলে যাই।

সকালে আমি স্কুলে চলে যাই ক্লাস করানোর জন্য। মাথায় তৃপ্ত চিন্তা। রাতের ঘটনাটা যেনো আমাকে বেশিই হতাশায় ফেলেছে।

স্কুল ছুটি হবার পর আমি শরণাপন্ন হই মসজিদের হুজুরের। তিনি আমাকে ঝাড়ফুঁক দিয়ে বললেন," দোয়াদরুদ পড়ে বের হোন বাসা থেকে। হয়তো কোনো পিশাচের নজরে পড়েছেন। তাই পিছু নিয়েছে। আজকেও যদি অস্বাভাবিক কিছু হয়। তবে ফজরের সময় আমাকে জানাবেন"। হুজুরের কথামতো সেদিনের জন্য বাড়িতে চলে আসি। শ্যামলতা এখনো কলেজ থেকে আসেনি। বুলবুলিকে দেখেও আমার খুব একটা সুবিধার লাগেনি। তার চোখের চাহনী বলে দিচ্ছে,তার কিছুর চাহিদা রয়েছে। উঠোনের মাঝ বরাবর আসার আগে বুলবুলি কর্কশ স্বরে বলে উঠে," কাল মাছ আনেন নি। মেয়েটা সকালে না খেয়ে চলে গেছে কলেজে। আপনি আলু দিয়ে সেরে যান।আমাদের কথা তো ভাব্বার সময় নেই। এ ধরেন ব্যাগ, তেল আর মাছ নিয়ে আসেন"। কথাটা বলতে বলতে বুলবুলি আমার কাছে আসে।আর হাতে ধরিয়ে দেয় বাজারের ব্যাগ। গোসল করার সময়টুকু পাইনি। খাবার নিয়ে চিন্তা করবেনা অবশ্যই,কারণ দুপুরের খাবার আমি নিয়ে গিয়েছিলাম। খাবারের বক্সটা উঠোনে রেখে আমি বললাম," বাজার তো কাল শেষ। আজ মাছ পাবো কোথায়"। আমার প্রতিউত্তরে বুলবুলি ফের কর্কশ স্বরে বলে," কেনো,নদীতে কি মাঝিরা মাছ পূজা করে? নদীর কিনারায় যান। কাচা মাছ নিয়ে আসেন। ওসব আলু দিয়ে আমার ও খেতে ইচ্ছে করেনা"।

নিরুপায় হয়ে আমি উঠোন থেকেই ফিরে আসি বাজারে। আমার বন্ধু হেলাল আর নজরুলের সাথে চায়ের আড্ডা মেরেছি কিছুক্ষণ। বাড়িতে বউয়ের ঘ্যানঘ্যান শুনতে আর ভালো লাগেনা। পুরুষ মানুষের এই জীবনটা কত বৈচিত্র্যময়। কষ্ট করলেও নষ্ট। নষ্ট করলে ভ্রষ্ট। কূল পাওয়া বড় দায়। এই অত্যাচার অহস্য হয়েছে বলেই হয়তো নারীদের কর্মস্থল বানানো হয়। কিন্তু তাতেও পুরুষের কত জ্বালা। চায়ের আড্ডা দেওয়ার ফাঁকে নজরুল বলে,'

- গিয়াস উদ্দিনের বউ শুনলাম ভেগে গেছে।
- আস্তাগফিরুল্লাহ। বলিস কি। কত সুন্দর সম্পর্ক ছিলো তাদের।
- আর বলিস না গফুর। ঢাকায় গিয়ে বউকে চাকরি ধরিয়ে দিয়েছে। দুইজনের ইনকামে সন্তানদের ভবিষ্যৎ কত সুন্দর হয়ে যেতো। অথচ,যে শো রুমে গিয়াসের বউ চাকরি করতো।সেই শো রুমের ম্যানেজারের সাথে পালিয়ে গেছে। গিয়াস পরে জানতে পারে,কাজের সময়তেও তাদের মধ্যে কিছু চলতো। মাঝে মাঝে গিয়াসের বউ এক ব্যাগ হিসেবের খাতা নিয়ে যেতো ম্যানেজারের বাসায়। তখনি হয়তো কিছু ঘটে গেছে।

দেড় টাকার চা কাপে রেখে উঠে গিয়েছি। এইটুকু লস হলেও অশান্তি লাগবেনা,যতটা লাগছে গিয়াসের ঘটনা শুনে।বেচারা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে এখন কোন বিস্তীর্ণ বিপদে পড়ে।চায়ের বিল'টা সেরে আমি চলে যাই নদীর কূলে। ঘরে তো বউয়ের কাছে কূল পাইনা,অন্তত নদীর কূলে বাতাস খাই। বাতাস খাওয়া যায়? না,যায়না। সারাদিন'ই তো এটি আমরা গ্রহণ করি। এই গ্রহণ করাতেও কত লীলাগান। যে বাতাস গ্রহণ করি,তা অবশ্যই অক্সিজেন হতে হবে। যদি কার্বন মনোক্সাইড গ্রহণ করি। তবে নাশ হতে কতক্ষণ। অথচ এটির সৃষ্টিও হয় পরস্পরের একসঙ্গে । এক কাজে এসে আরেক ধ্যানে চলে যাওয়া হয়তো আমার বদ-অভ্যাসে পড়ে। আমার ধ্যানে থাকা অবস্থায় কাসেম মাঝি আমাকে ডাক দেয়। আমি সাড়া দেওয়ার পর সে গলা ফাটিয়ে বলে,"আরে গফুর কাকা যে। মাছ নিবেন?"। কাসেম মাঝির মুখে আমার উদ্দেশ্য শুনে ভালোই লাগলো। এদের মতো যদি আমার বউটা বুঝতো আমাকে। চেহারা দেখলে বুঝতে হবে মনে কতো বাক্য।

কাসেম মাঝির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে তিনিও নামলেন নৌকা থেকে। মিশ্রণ জাতের কিছু মাছ ব্যাগে ঢুকিয়ে বলে, " ৬৪০ টাকা"। হাবা হয়ে দাবা খেলতে মন চাচ্ছে। বুদ্ধির খেলা কি সে আমার থেকে বেশি জানে? পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়ে বের করেছি ৫০০ টাকার নোট। ওটা হাতে দিয়ে বললাম," সন্তুষ্ট থাকো। আর বেশি বেশি মাছ ধরো"। আমার হাত থেকে টাকা নিয়ে সে মহা-খুশিতে আবার নৌকায় ফিরে গেলো। তার মুখের হাসি জানান দিচ্ছে,আমি ঠকেছি। এখানে হয়তো ৫০০ টাকারও মাছ নেই। কি করবো আর,ব্যাগ হাতে নিয়ে রওনা করেছি ঘরের উদ্দেশ্যে।

লোকে বলে, ভুল মানুষের হয়ে যায়। চায়ের আড্ডা আমার জন্য মানসিক প্রশান্তি এনে দিলেও, সন্ধার ছায়া ভয় এনে দিচ্ছে। নদী আর বাজারের মাঝে আছি। এখনি চারদিকে মাগরিবের আযান পড়ে গেলো। আজ আবার না কিছু ঘটে যায়।তা ভেবেই ভয় পাচ্ছি। উদ্দেশ্য আমার দ্রুত বাজারে গিয়ে একটা সাথী বেচে নিবো। এরপর তার সাথে বাড়ি ফিরবো। কিন্তু.. আমি যে মাটির রাস্তা বেয়ে যাচ্ছি,সেই রাস্তার পাশে সিরিয়াল করা তালগাছ অনেক।

রাস্তাটা নদীর কিনারা বেয়ে শুয়ে আছে। আমি একা হেটে যাচ্ছি বাজারে। কিন্তু আমার দুই পায়ের শব্দ না হয়ে,চার পায়ের শব্দ ভেসে আসার কারণ কি? মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে চারপাশে একটু খেয়াল করলাম।তেমন কিছু চোখে পড়লোনা। আবার যখন পা চালিয়েছি,তখনি তালগাছের পাতাগুলা নড়ে উঠলো।

ভয়ে মানুষ বোকাও হয়,এটি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। নদীর পাড়ে বাতাস অনেক। বাতাসে পাতা নড়বেই। এতে আমি ভয় পাচ্ছি কেনো। তখনি তালগাছের ডাল ছুটে আমার উপর পড়ে গেছে।
কোনোভাবে গা বাঁচিয়ে আমি সরে দাঁড়িয়েছি। আর একটু হলে মা'থা যেতো। স্বাভাবিক কিছু হচ্ছেনা। দ্রুত আবার পা চালিয়ে যেতে শুরু করেছি।

এইবার আমার পিছু পিছু ২-৩ জনের আসার শব্দ শুনা যায় স্পষ্ট। আমি থমকে দাড়াই,আর পিছন ঘুরে তাকাই। রাস্তা খালি। তবে ওরা যে আমার পিছু নিয়েছে। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পায়ের গতি বাড়িয়ে আমি আবার হাটতে শুরু করি। কিছুদূর গিয়েই নাকের ডগায় শ্বাস ফিরে আসে। বন্ধু নজরুলও আমার দিকে আসতেছে। ওর বাড়ি পিছনে ফেলে এসেছি। অবশেষে তার সাহায্য নিয়ে বাজারে যেতে পারবো। আমার কিছু বলার আগে নজরুল এসে আমাকে বলে," কিরে,মাছ কিনতে গিয়েছিলি নাকি"। আমি নজরুলকে সবটা খোলসা করে বলি। সেও আমাকে বাজার অব্দি এগিয়ে দিতে রাজি হয়। দুজন মিলে কথা বলতে বলতে বাজারের প্রায় কাছে চলে এসেছি। তখনি নজরুল বলে," বাজারের মসজিদে নামাজ পড়ে যা একেবারে। অজু আছে?"। সারাদিনে এতো কিছু করে অজু থাকেও বা কিভাবে। রাস্তার পাশে একটা পুকুর আছে। যা পথচারীরা ব্যবহার করে বহু। নজরুল ঘাটে নেমে অজু বানাচ্ছে। আমিও ব্যাগটা রাস্তার কিনারায় রেখে অজু করতে নেমেছি। যে'ই আমি নজরুলের কাছে এসেছি। তখনি নজরুল আমার হাত ধরে টেনে পুকুরে নামিয়ে ফেলে।

পানির নিচে আমি নজরুলের থেকে ছুটার চেষ্টা করতে যাই।কিন্তু এখন আমার কাছে স্পষ্ট হয়, এটি নজরুল নয়। তার গায়ে বড় বড় লোম রয়েছে।যা আমি স্পষ্ট ধরে আছি।

১ ঘন্টা পর.....
ঘাটে আমি শুয়ে আছি। আমার আশেপাশে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। তখন জানতে পারি,পানিতে যখন আমি ডুবে যাচ্ছিলাম।তখন রাস্তা দিয়ে একজন এলাকার লোক যাচ্ছিলো। সে আমাকে দেখে,উপরে তুলে আনে।কিন্তু আমি কখন জ্ঞান হারিয়েছিলাম।তা মনে নেই। পাশে তাকিয়ে দেখি,আমার ব্যাগ পড়ে আছে। কিন্তু ব্যাগে মাছ নেই। কে নিয়েছে তা বলতে হবেনা। সবাই জানে।

মসজিদের হুজুর পরে আমার বাড়িতে এসে আমাকে ঝাড়ফুঁক করে। একটা কালো ছাগল জ"বাই করে দেয় সেই ডাইনির জন্য। হুজুরের ভাষ্যমতে, " আপনাকে এই ডাইনি ধরেছে বিল থেকে। শুধু মাছ না,সে আপনাকে হ/ত্যাও করতে চেয়েছে। বিলে নামার আগে যে রাস্তায় আপনি হেটেছেন। সেই রাস্তায় এই ডাইনি থাকে। ভুলে আপনি তার চুলে পা দিয়ে ফেলেছেন।যদিও ভুলে না,আপনি তো আর তাকে দেখেন না। কিন্তু ডাইনি যায় রেগে। ঐদিন দোয়া পড়ে বেচে গেলেন,তাই শুধু মাছ নিয়েছে। রাতে আবার ফজরের সময় হয়েছিলো।তাই ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু সুরেলার রুপ ধরে যখন দেখা দিয়েছে,তখন যদি গাবগাছের নিচে যেতেন। সে আপনাকে সেখানেই মে/রে ফেলতো। আর আজ তো পানিতে পুরো চেষ্টা চালিয়েছে। এখন সে নেই। চলে গেছে। ছাগল দেওয়ায় মাফ করে দিয়েছে"।

হুজুরের কথা শুনে,সেদিন থেকে আর ঐ পথে আসিনি আমি। বাজারে যেতাম পাটোয়ারি বাড়ির রোড় বেয়ে।

- আর সে দেখা দেয়নি আপনাকে?
- না'রে নাতি। আর আসেনি।
- যাক,এইবার আমার অডিয়েন্সদের উদ্দেশ্যে কিছু বলেন।
- কি বলবো আর।মাগরিবের পর যাতে নিরিবিলি পথে না হাটে।ওরা বাতাসে মিশে বসে থাকে। গায়ে গা লাগলেই পিছু নিবে।
- আর আমার পেজে লাইক কমেন্ট শেয়ার করতে বলবেন না?
- হ্যাঁ,সবাই করে দেন। নাতি আমার ভালো ভুতের গল্প লিখে। বন্ধুদেরও মেনসন করে দেন সবাই।



******** সমাপ্ত ********



গল্প- #শঙ্কা ( পর্ব-০৩ ও শেষ)
লেখক- #রিয়াজ_রাজ




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।