শঙ্কা - পর্বঃ ০২

শঙ্কা - পর্বঃ ০২ - রিয়াজ রাজ
শঙ্কা - পর্বঃ ০২ - রিয়াজ রাজ


গল্পঃ শঙ্কা
পর্বঃ ০২
লেখকঃ রিয়াজ রাজ
বিভাগঃ থ্রিলার গল্প

পর্ব ০১ পড়ুনঃ
  1. শঙ্কা - পর্বঃ ০১
---------------------------------------

যখন বালতিতে মগ দিবো,তখনি শুনতে পেয়েছি বাচ্চা মেয়ের হাসি। আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের স্রোত নেমে আসতেই,বউ চিৎকার দিয়ে বলে, " ও শ্যামলতার বাপ, ব্যাগে মাছ কোথায়"।

বুলবুলির কথা শুনে ভয় পাচ্ছিলাম আরো। কলঘাটে দাঁড়িয়ে এদিকে-সেদিক তাকাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে আশেপাশে রয়েছে কেও। বিল থেকে পেত্নিটা আবার আমার পিছু নিয়ে চলে আসেনি তো? বলে রাখি, কাচা রাস্তা( মাটির রাস্তা) থেকে আমার বাড়িতে প্রবেশ করলেই উঠোন। উঠোনের সামনেই আমার ঘর। ঘরের বাম পাশে কলঘাট, আর ডান পাশে একটা খাল । কিন্তু ঘরের পিছনে রয়েছে একটি বাগান।যেখানে গাবগাছ, আম গাছ,আর তেতুল গাছে ভরা। ঐ বাগানটা আমার না। আমার বড় ভাই ইলিয়াসের বাগান।পরিবার নিয়ে তারা ঢাকায় থাকে। গ্রামের এই জায়গাটা তার। বহুবার আমাকেও বলেছে ঢাকায় যাবার জন্য। কিন্তু এই গ্রামে শিক্ষকতার বয়স আমার ৬ বছর। এই চাকরি দিয়ে আমার সংসার চলে অনায়াসে।

কলঘাটে দাঁড়িয়ে যখন আমি এদিকে-সেদিক তাকিয়েছি। আমার অক্ষি তখন আটকে যায় গাবগাছ এর নিচে। চাঁদের আলোতে তেমন স্পষ্ট দেখা না গেলেও,একটা বাচ্চা মেয়েকে আমি দেখতে পাচ্ছি। চুলগুলা তেমন বড় না। দেখে মনে হচ্ছে আমার ছাত্রী সুরেলার মতো। কিন্তু সুরেলা এতো রাতে এখানে আসার কথা নয়। তাছাড়া মেয়েটার বয়স সবেমাত্র ৮ বছর। ৮ বছরের মেয়েটা আমার বাড়িতে এসে বাগানে দাঁড়ানোর প্রশ্নই আসেনা। তবে কি সুরেলার চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে? যদিও আমি চেহারা দেখতে পাচ্ছিনা। গায়ের গঠনরূপ দেখে তেমনি মনে হচ্ছে। ভীরু স্বরে চেঁচিয়ে বললাম," বুলবুলি দিয়াশলাই নিয়ে এদিকে আসো তো"।

আমার ডাকে বুলবুলি দিয়াশলাই নিয়ে কলঘাটে চলে আসে। বুলবুলির থেকে দিয়াশলাই নিয়ে আমি চেরাগে আগুন ধরাই। এরপর গাবগাছ এর দিকে তাকিয়ে দেখি,জায়গাটা ফাঁকা রয়েছে। কেও নেই সেখানে।

বুলবুলিকে আর কিছু বলিনি। মাছ তো আমি এনেছি। পথে যে ভুতে তাড়া করেছে,এইটা বললে এখন আবার ভুতকে ধুয়ে দিবে। বিছানায় বসে বসে বুলবুলির ঘ্যানঘ্যান শুনছি আর ভাবছি।আমাদের যুগে মেয়েদের চাহিদা কত কম ছিলো। আমার মা'কে দেখতাম।বাবা এলে একেবারে মাথায় কাপড় দিয়ে সালাম করতো। বাবা বাহির থেকে এলে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি হাতে ধরিয়ে দিতো। শহর থেকে এলে বাবা মায়ের জন্য ফুলের মালা এনে খোঁপায় বেঁধে দিতো। তাদের চাহিদা ছিলো শুধু সম্মান আর ভালোবাসা। বাড়িতে সংকট পড়ায় মা তার বালা বিক্রি করে বাবাকে দিয়েছিলো।বাবা আমার মা'য়ের চেহারায় তাকিয়ে এক ফোটা জল ফেলেছিল অক্ষি থেকে। এই জলের দাম হয়তো আমার মা'য়ের কাছে অনেক ছিলো। ঐ ছোট্ট বালার চেয়েও দামি। আবার যখন বাবা ব্যবসায় লাভ করে,মায়ের জন্য ৪ জোড়া বালা এনেছে। কত সম্মান,কত ভালোবাসা,কত যত্ন জুড়ে সংসার চলতো। দিন যত সামনে আসে,চাহিদা তত বৃদ্ধি হতে থাকে। কেও সন্তুষ্ট না। স্ত্রী'র হরেক চাহিদা দিতে না পারলে অশান্তি।স্বামীকে শশুর বাড়ি থেকে টাকা দিতে না পারলে অশান্তি।চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পেতে ডিভোর্স হয়ে গেছে সমাজের চাহিদা। এই সমাজ ডিভোর্স চায় শুধু। সমাজের চাহিদা মিটানোর জন্য বৃদ্ধি পেয়েছে ডিভোর্স এর হার। বিচ্ছেদ আর বিচ্ছেদ ঘটে। সম্মান,ভালোবাসা, যত্ন সব মরে গেছে।

- নানা। আপনি তো ভুতের ঘটনা থেকে ভালোবাসার ভিতরে ঢুকে যাচ্ছেন।
- আহা! আমার নাতি কি শুধুই ভুতের গল্প শুনবে? ভালোবাসাও তো শুনা দরকার।
- আমার ফেসবুকে সব ভুতের গল্প শুনার অডিয়েন্স। ভালোবাসার গল্প বললে আমার পেজ আনফলো করে দিবে। ভুতের শুনান না।
- পেজের নাম কি তোর।
- গল্পপাতা - বাংলা গল্পের ডিজিটাল লাইব্রেরী কেনো,আম্মা আপনাকে বলেনি?
- বলবে কেনো। তোর মা শ্যামলতাকে আমি বুঝিইনা। তোর বাবার কাছে বিয়ে দেওয়ার পর থেকে আর কিছুই বলেনা আমাকে।
- আচ্ছা,আমি তো বললাম।এখন বলেন। বিলের ভুত মাছ কি দিয়ে গেছিলো?
- ওও আচ্ছা,মাছ অব্দি এসেছিলাম তাইনা। ওকে, শুন পরেরটা।

মাছ বাদে যা যা তরকারি এনেছিলাম। তা দিয়ে বুলবুলি রান্না করেছে। রান্নার অপেক্ষা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে গেছি। তা বুঝে উঠতে পারিনি।

কিন্তু কারো ডাকে আমার ঘুম হালকা হতে থাকে। আমার নাম ধরে ডেকে বলে," গফুর, উঠ"। অনেক শঙ্কা ( ভয়ানক) সেই ডাক। ডাকে আমি চোখ খুলে দেখি,ঘরে শ্যামলতা আর বুলবুলি নেই। চেয়ারের স্থানে চেয়ার পড়ে আছে। শ্যামলতার বই টেবিলে খোলা।শোয়া থেকে উঠে গেলাম রান্না ঘরে।গিয়ে দেখতে পাই, চুলায় ধাউধাউ করে আগুন জ্বলছে। কিন্তু বুলবুলি নেই। পায়চারি করার মাঝে আবার একটা ভারি কন্ঠ শুনতে পাই আমি। উঠোন থেকে কেও ডেকে বলে," গফুর।ও গফুর"। ভয় পেয়ে যাই আমি প্রচুর। বুলবুলি আর শ্যামলতা ও বা যাবে কোথায়। শঙ্কা কিছু ঘটে যায়নি তো? রান্নাঘর থেকে হেটে হেটে আমি দরজার কাছে আসি। দরজা খুলে উঠোনে তাকিয়ে দেখি,চারদিকে চাঁদের আলোয় চকচক করছে।কিন্তু কারো অস্তিত্ব নেই। আমার নাম ধরে ডাকে কে। ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম দুয়ারে। কেও নেই। একবার ডাক দিয়ে বললাম," বুলবুলি? কোথায় তোমরা। শ্যামলতা? ও শ্যামলতার মা"। আমার ডাকে দিচ্ছেনা কেও সাড়া। ভিতরে একটা ভয় এইবার চেপে ধরেছে। গ্রামে থাকি।ভৌতিক ঘটনা প্রায়শই ঘটে। কখনো রাস্তায় দেখি,কখনো বিলে দেখি। তবে এইরকম ভয়ানক কিছু এর আগে ঘটেনি। উঠোনে এসে চারদিকে তাকাচ্ছি। কেও নেই। আবারো দেখাদেখির মাঝে আমার চোখ যায় গাবগাছের তলায়। সেই বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে। সুরেলার মতো দেখতে মেয়েটা। আমি জানি এইটা সুরেলা নয়। কিন্তু সে কি বুঝাতে চাচ্ছে। আর আমার বউ বাচ্চা কোথায় গেলো আচমকা।

গাবগাছের নিচে থাকা মেয়েটাও বড্ড অদ্ভুত। তার দিকে তাকালে একটা প্রমত্তা কাজ করে। যেনো নেশা ধরে যায়। শব্দ এবং ইঙ্গিত ছাড়া মনে হয় সে ডাকছে। আনমনে বা অজান্তে আমিও সেদিকে হেটে যাচ্ছি। আমি বুঝতে পারছিলাম না,আমার যাওয়া ঠিক হবে কি হবেনা।কিন্তু ভাবতে ভাবতে কখন যে আমি কলঘাট অব্দি চলে এসেছি টেরও পাইনি। আচমকা আমার পিঠে কেও হাত রাখতেই,চমকে উঠি আমি।

" শ্যামলতার বাপ? যাচ্ছেন কোথায় ওদিকে।কখন থেকে ডাকছি"।

বুলবুলির শব্দে আমি পিছন ঘুরে তাকাই। দেখতে পাই,বুলবুলি দাঁড়িয়ে আছে।সাথে আমার মেয়ে শ্যামলতাও আছে।এক নজরের জন্য আবারো গাবগাছের দিকে তাকাই।কিন্তু সুরেলার মতো দেখতে মেয়েটি আর নেই।ধোকা খেয়ে আমি বুলবুলিকে বলি," কোথায় চলে গিয়েছিলে তোমরা। এতক্ষণ ধরে যে ডাকছি।শুনোনা?"। আমার কথায় বুলবুলি আর শ্যামলতা, কেমন একটা বিচিত্র নজরে আমার দিকে তাকায়। কৃশ সময় বাদে বুলবুলি আমাকে বলে," আপনি আমাদের ডাকছেন নাকি আপনাকে আমরা ডাকছি। ঘুম থেকে উঠে, কাওকে কিছু না বলে গেলেন রান্নাঘরে।এরপর দরজা খুলে আপনি বের হচ্ছেন। এতো করে যে বলে যাচ্ছি কোথায় যাচ্ছেন।কোনো উত্তর তো দিচ্ছিলেন না। এখন বলছেন আমরা সাড়া দিচ্ছিনা?"। বুলবুলির কথায় আমি স্পষ্ট বুঝলাম কাহিনি কি। স্বপ্নে আমাকে সে বশীভূত করে নিয়ে যাচ্ছিলো।তারমানে সে আমাকে নিয়ে যেতে চায়? চারবাঙ্গি গ্রামের আলী মিয়াকে নাকি একটা পরী নিয়ে গিয়েছিলো। পাক্কা ১৬ দিন আলী মিয়াকে রেখে,১৭ দিনের অস্কুর দিয়ে যায় গ্রামে। তবে কি আমাকে কোনো পরী নিয়ে যেতে চায়? সর্বনাশ, কাল সকালে হুজুর দেখাতে হবে।

মনে মনে আমাকে ভাবতে দেখে শ্যামলতা বলে," বাবা? আপনার কিছু হয়েছে?"। শ্যামলতার জবাব দেওয়ার আগে আমার স্ত্রী বলে উঠে," হবেনা কেনো।হবে তো। গ্রামে মাস্টারি কেন করে আমি তো জানি। স্কুলের পাশে যে বাড়ি আছে। ওখানের মহিলাগুলার সাথে দেখা করতে হবে তো। তারা তাদের সন্তানকে নিয়ে আসে।দেখেছি আমি,উনাদের সাথে ঠোঁটের কোনায় হাসি রেখে কথা বলে। তাই এখন ঘুমের তালেও হয়তো তাদের দেখে। ঘরে চল,তোর বাবা লঘুভার হয়ে গেছে।গেলো গেলো, আমার সংসারটা উচ্ছন্নে গেলো"। নিজে নিজে একটা গল্প বানিয়ে,সেই গল্প শ্যামলতাকে শুনিয়ে ঘরে চলে গেলো।সাথে আমার সংসারকেও একটু কন্টক করে দিলো। যাইহোক, খেয়ে ঘুমাতে হবে। কাল হুজুরকে ব্যাপারটা বলা লাগবে।

রাতের খাবারটা তেমন ভালো হয়নি। আমি বুঝতে পারছি যে বুলবুলি রেগে আছে। এখন যদি আমি দুই কথার জবাব দিতে যাই।তবে ১৬ কথা বেড়ে যাবে। তরকারিতে ঝাল বাড়িয়ে দিয়েছে বুলবুলি। সে জানে,আমি ঝাল খেতে পারিনা। তার উপর মুখে ঘাঁ হওয়ায়,প্রচুর জ্বালাপোড়া করছে। কোনোভাবে পেট ভরাতে দুই মুঠ খেয়ে উঠে যাই। বিছানায় এসে চশমা খুলে শুয়ে পড়েছি। কিছু সময় পরে বুলবুলিও এসে শুয়েছে। কয়েকবার তার রাগ ভাঙ্গাতে জোক্স শুনিয়েছিলাম।কিন্তু রাগ ভাঙ্গেনি। উল্টে আমাকে বলে," আপনার এসব গল্প ছাত্রীদের মা'দের শুনান"। উত্তপ্ত আগুনে কেরোসিন দিলে আগুন বেড়ে যাবে এখন। তাই চোখ বন্ধ করে আমিও নিদ্রাজড় হই।

না,আমাকে সমাহিত থাকতে দেয়নি। চোখ বন্ধ অবস্থায় অনুভব করলাম,আমার পায়ের উপর কেও বসে আছে। যদিও আমি সোজা হয়ে শুয়েছি( লা"'শের মতো)। দুই পা একটার সাথে আরেকটা লেগে থাকায়,সে আমার দুই পা দখল করে বসেছে। স্পষ্ট তা অনুভব করতে পেরে চোখ খুলি আমি। আর দেখতে পাই,দেহের গঠনরূপ সুরেলার মতো হলেও,মেয়েটার চেহারা সুরেলার মতো নয়।একদম কালো কুচকুচে একট বিশ্রী চেহারা। টিনের ফাক দিয়ে আসা চাঁদের আলোয়, তার চেহারা ওতটুকুই দেখতে পাচ্ছি। বুলবুলিকে ডাকবো নাকি দোয়া পড়বো।এই মননে রয়ে গেলাম।

এদিকে বাচ্চা মেয়েটি হটাৎ পা থেকে লাফ দিয়ে আমার বুকের উপর চলে আসে। কিন্তু যখন সে বুকের উপর আসে,তখন কোনো বাচ্চা ছিলো না। একটা ডাইনির স্পষ্ট চেহারা আমি দেখতে পাচ্ছি। রক্তহীনতায় মানুষ যেমন রোগা হয়ে যায়। তেমনি একটা বুড়ি মহিলা আমার বুকের উপর।চেহারা কালো হলেও,তার দুটি চোখ সাদা লাইটের মতো। এতো ভয়ানক চেহারা হয়তো এর আগে আমি দেখিনি। হয়তো হবেনা,সত্যিই দেখিনি। এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো,চোখের সামনে আজরাইল দেখতে পাচ্ছি। বুড়ি ডাইনি আমার বুকে বসে,চেপে ধরে আমার গলা। তার থেকে রক্ষা পাবার জন্য,আমিও তার দুই হাত ধরে ধস্তাধস্তি শুরু করেছি। ততক্ষণে এইটাও বুঝে যাই, তার হাত দুটি অনেক চিকন।তবে হাতে কিছু লোম রয়েছে।বড় বড় লোম। যেনো কোনো বিড়ালের পা ধরেছি। চিকন আর ছোট হলেও,সেই হাতে অনেক শক্তি। আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে তার সাথে ধস্তাধস্তি করে যাচ্ছিলাম।




পর্ব ০৩ পড়ুনঃ











গল্প- #শঙ্কা ( পর্ব-০২)
লেখক- #রিয়াজ_রাজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।