হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে- পর্ব ২০

হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ২০
হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ২০


গল্পঃ হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে
পর্বঃ ২০
লেখিকাঃ গল্পকন্যা
প্রকাশকালঃ মে-২০২৩
ক্যাটাগরীঃ প্রেম কাহিনী, জুনিয়র সিনিয়র গল্প



ড্রয়িংরুমে পিনপতন নীরবতা।যেন বাজ পড়ার আগ মুহুর্ত।প্রত্যেকটা সদস্য অবাকের শেষ সীমানায় বিরাজমান করছে।
কিছুক্ষণ আগে রাত ওর পরিবারের সবাইকে পাপড়ির কথা জানিয়েছে।

এটাও জানিয়েছে মেয়ে ওর চেয়ে সিনিয়র।তবে মেয়েটাকে ও অনেক ভালোবাসে, নিজের জীবনের চাইতেও বেশি।পাপড়ির বাবার নাম-ধাম সব জানানোর পর বলে,"আমি চাই আপনারা ওর বাড়িতে বিয়ের প্রোপোজাল নিয়ে যান।"

আকস্মিক এমন কথা কেউ হজম করতে পারছে না।মেয়েটা বয়সে বড়ো এটা কিভাবে মেনে নেয়া যায়?সকলের একি কথা,"নাহহ...!এ কিছুতেই সম্ভব না।"

কর্নেল মোঃ আসাদুজ্জামান হাবিব ও আয়েশা বেগম একমাত্র ছেলের এমন কথা মেনে নিতে পারছে না।ছেলে যে তাদের অনুমতি চাইছে না,সরাসরি আদেশ সরূপ তার ইচ্ছে জানাচ্ছে।তার মানে বিষয়টা অনেক দূর গড়িয়ে গেছে।

রাতের বাবা সরাসরি বলে দেয়,"এ মেয়ের সাথে তোমার বিয়ে হবে না।তোমার বিয়ে আমি তোমার ছোটো খালার মেয়ে দিনার সাথে ঠিক করে রেখেছি।আরো অনেক আগেই।সেখানে আমার কথা দেয়া আছে।আর দিনার বয়স কম,তোমার সাথে মানানসই।কিন্তু এ মেয়ের বয়স বেশি তোমার সাথে মানায় না।ওর বাবা যতই ধনী হোক না কেন, আমি জেনে শুনে একটা বয়স্ক মেয়ের সাথে তোমাকে সাংসার পাতিয়ে দিতে পারি না।ইন ফিউচারে তুমি আমার সামনে ঐ মেয়েকে নিয়ে অশান্তিতে ভুগবে,তা আমি দেখতে পারবো না।"

রাত বলে,"বাবা সে কেমন তা না জেনেই কিভাবে এসব বলছো?আর সব কথার চেয়ে বড়ো কথা আমি পাপড়িকে ভালোবাসি।"

রাতের মা আয়েশা বেগম বলেন,"রাত বড়ো হয়েছো বলে এই নয় যে,এখন তোমাদের ডিসিশন আমাদের মেনে নিতে হবে।বাবার মুখে মুখে তর্ক করো না,যা বলছে তোমার ভালোর জন্যই বলছে।আশা করি আমাদের নাক কান কাটাবে না।"

রাত ওর মায়ের কথা শুনে বিস্মিত।এই তার সেই বন্ধুর মতো মা!
"মা তুমি ও আমার কথা বোঝার চেষ্টা করছো না?"

"এখানে বোঝার কিছু নেই,তুমি এখন বুঝতে পারবে না,একটা বয়স্ক মেয়ে নিয়ে ভবিষ্যতে তোমাকে কি কি ফেস করতে হবে।তাই আমরা তোমার ভালোর জন্য তোমার কথায় সায় দিতে পারবো না।তোমার ছোটো খালার সাথে কথা বলে দ্রুতই আমরা দিনার সাথে তোমার বিয়ের ডেট ফাইনাল করছি।"

সবাই একে একে যার যার রুমে চলে গেছে।রাত দু'হাতে কপালের দুপাশের রগ চেপে ধরে,আশাহত হয়ে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে।

রাতের মনে হচ্ছে টেনশনে মাথার রগ ছিঁড়ে যাবে।হঠাৎ পাপড়ির ফোন আসে।স্ক্রিনে নামটা দেখে রাতের ভিতর কষ্টেরা দলাপাকাতে শুরু করে।মেয়েটা যে আশা নিয়ে আছে।এখন কিভাবে এসব বলবে।

ফোন বেজে কেটে যায়।আবারও বেজে উঠে।রাত ফোন রিসিভ করে নিজের রুমে যায়।

"কি করো সোনা?"
"কিছু না!"

"খেয়েছো?"
"নাহহহ!"

" মন খারাপ কি? "
------

"কি হয়েছে? বলো আমায়?"
"কিছু না।"

"আচ্ছা তাই!তা হলে এভাবে কথা বলছে কেন আমার রাত সোনা?"
"এমনি ভালো লাগছে না।"

"বলবে না তো আমাকে?"
"ডিনার হয়েছে?"

"হ্যাঁ।জানো আমি আজকে ডিনার টাইমে বাবাকে বলেছি,তোমার আর আমার কথা।বাবা বলেছে তোমাদের বাড়ি থেকে প্রোপোজাল পাঠাতে।"

"পাপড়ি আমাদের বাড়ি থেকে যদি প্রোপোজাল না নিয়ে যায়।তোমার বাবা আমাকে মেনে নিবে তো?তোমাকে আমার হাতে তুলে দিতে আপত্তি জানাবে না তো?"

পাপড়ি নিশ্চুপ।খানিক বাদে বলে,"কি হয়েছে রাত বলো আমাকে?"

রাত কিছুক্ষণ আগের ঘটে যাওয়া সমস্তটা বলে।সবটা শুনে পাপড়ির চোখ বেয়ে অঝোর বর্ষণ হতে থাকে।

"রাত তুমি তাদের কথা অমান্য করো না,বিয়ে করে নেও তাদের পছন্দ সই মেয়েকে।"

রাত গর্জে উঠে বলে,"মাথা ঠিক আছে তোমার?তুমি আমার স্ত্রী।আমার বিয়ে করা বউ।আমার অন্তরাত্মা।তোমাকে ছাড়া অন্য কারো পাশে নিজেকে কল্পনাও করতে পারি না।"

"পারতে হবে,বাবা-মা সন্তানের ভালোর জন্য সব কিছু করে।তারা কখনোই সন্তানের অমঙ্গল চাইতে পারে না।তুমিই তো সেদিন বলেছো।তাদের মনে কষ্ট দিয়ে আমাকে আপন করার মানে হয় না।তারা যেহেতু ভাবছেন আমি তোমার সাথে মানান সই না, তাহলে তাই ঠিক হবে।আসলেই হয়তো আমি তোমার যোগ্য নই...!"

রাত ধমকে উঠে,"পাপড়ি এমনি মেজাজ খারাপ।আর খারাপ করো না প্লিজ।"

রাত পাপড়ির ফোন কেটে দেয়।পাপড়ি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে।আসলেই তো রাত তো ওর স্বামী।ওকে ছাড়া নিজের অস্তিত্ব কল্পনা করতে পারে না।সেখানে কিভাবে অন্য কারো পাশে রাতকে দেখবে।পাপড়ি ঠিক করে ওর বাবাকে মাকে বুঝিয়ে বলবে।সব সময় ছেলেদের বাড়ি থেকেই কেন প্রোপোজাল দিতে হবে,মেয়েদের বাড়ি থেকেও দেয়া যেতে পারে।আর ওর বাবাকে ও তো বলা হয়নি রাত ওর জুনিয়র।

পরের দিন সকালে।

পাপড়ি রেডি হয়ে নিচে নেমেছে।আজিম হোসাইন-ও অফিসের জন্য রেডি হয়ে নিচে নেমেছে।রিনা বেগম ডাইনিং এ খাবার সাজাচ্ছেন।বাবা মেয়ে দুজনেই বসেছে সোফায়।দু'জনে একত্রে নিউজ পেপারে চোখ বুলাচ্ছে।পাপড়ি হেড লাইন গুলোতে চোখ বুলিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়।নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়, এখনি রাতের কথা বলবে।

"বাবা তোমাকে একটা কথা বলার ছিলো।"

আজিম হোসাইন পেপারে চোখ বুলাতে বুলাতে বলে,"বলো...!"

"রাতের কথা বলেছি না তোমাকে,আসলে...রাত আমার জুনিয়র।"

আজিম হোসাইন চমকে উঠে বলেন,"কি বলছো?"

"হ্যাঁ বাবা।"

"তুমি কি আগে জানতে না?"

"জানতাম!"

"তাহলে?কিভাবে বোকামো করলে।এরকম এইজ ডিস্টেন্সে তো সম্পর্ক ভালো থাকে না।টিকে না এই ধরনের সম্পর্ক।এ ছেলে দেখতে এমনি তোমার চেয়ে সুন্দর,দুদিন পরে নির্ঘাত আরেকটা বিয়ে করে নিয়ে আসবে।পরে তোমার জীবন নষ্ট আরকি।না না...,এ হতে পারে না।আমি তোমার জন্য অন্য ছেলে দেখছি...!"

পাপড়ির বুকের ভিতর মুচড়ে ধরে।কিছু বলার জন্য মুখ খুলার আগেই আজিম হোসাইন গজরাতে গজরাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।পাপড়ি অসহায় চোখে মেঝেতে চেয়ে থাকে।

"তাহলে কি রাত আর ও এক হতে পারবে না?"ভিষণ কান্না পাচ্ছে।কিন্তু এতো বড়ো মেয়ে কাঁদাও যাবে না।
———————
বুকে এক ধরনের চাপা কষ্ট থাকে সব সময়।মাথায় প্রচুর প্রেশার।রাতের সময়টা যেন খুবই খারাপ যাচ্ছে।

অফিস টাইমটা এতো দিনকার ন্যায় সুন্দর সুশ্রী মনে হচ্ছে না।মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে।

পাপড়িকে বার কয়েক ফোন করার পরও তোলার নাম নেই।বুঝতে পারছে গত এক সপ্তাহ ধরে পাপড়ি ওকে এড়িয়ে যাচ্ছে।

রাত সব কাজ রেখে অফিস থেকে বেরিয়ে যায় পাপড়ির অফিসের উদ্দেশ্যে।

পাপড়ি অফিস থেকে বের হয়ে রাতকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।একটুও চমকায় না।বরং ওর জানাই ছিলো দুই একদিনের মধ্যে রাতের পাগলামো দেখতে হবে,সহ্য করতে হবে মুখ বুজে।

পাপড়ি রাতকে না দেখার ভান করে ওর গাড়িতে উঠার জন্য অগ্রসর হয়।পাপড়ির কলিগরাও যার যার গাড়িতে উঠে বসবে।ঠিক তখুনি রাতের মেজাজ চরম বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়।

বড়ো বড়ো পা ফেলে পাপড়ির সন্নিকটে যেয়ে পাপড়িকে টেনে এনে গাড়িতে বসায়।গাড়ির গতি বাড়িয়ে একটা নিরিবিলি লেকের পাশে থামায়।

পাপড়ি চুপ করে আছে।মনে কষ্ট থাকলেও রাতের এই পাগলামো গুলো ওর ভালো লাগছে।বরাবরই ভালো লাগে।ছেলেটা এতো ভালোবাসে বলেই ও ছেলেটার প্রতি এতো দুর্বল।

ভাবনার মধ্যেই আকস্মিক হেঁচকা টানে রাতের বুকে লেপ্টে যায়।চোখ জোড়া নামিয়ে রেখে বলে," দুদিন পর বিয়ে করে বউকে এভাবে কাছে টেনো,আমাকে..."বাকি কথা বলার আর সুযোগ হয়ে উঠে না।

দশমিনিট পর রাত বলে,"আমি আমার বউকে ই কাছে টেনেছি।কারো কোনো ওজোর শোনার টাইম নেই।"

পাপড়ির চোখ জোড়া কোথায় সীমাবদ্ধ করবে ধাতস্থ করতে পারছে না।হাতের নখের দিকে তাকিয়ে ভাবছে,"এই ছেলেটাকে ছাড়া ও সত্যি ই বাঁচবে না,ওর অস্তিত্ব বিলিন হয়ে গেছে এই মানবের মাঝে।"ভাবতেই চোখ জোড়া ভিজে আসে।

দু'হাতে মুখ চেপে ধরে কাঁদতে থাকে।রাত গাড়ির ফ্রন্ট মিররে তাকিয়ে ছিলো।পাপড়ির কেঁদে উঠাতে ভরকে যায়।জোর করে কি* করাতে এভাবে কাঁদছে?

"সরি সরি,ভিষন রাগ উঠেছিলো,কন্ট্রোল করার জন্য আর কোনো ওয়ে পাচ্ছিলাম না, সরি জান।"বলেই জড়িয়ে ধরে।

রাতের বুকে মুখ লুকিয়ে বলে," রাত আমাদেরকে কেউে মেনে নেবে না।আমি বাবা-মা কে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি।তারা বোঝেনি।উল্টো আমাকে অন্য কোথাও বিয়ে দিবে বলে ঠিক করেছে।কি করবো এখন কিছুই বুঝতে পারছি না।শুধু এটা বুঝতে পারছি,তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না।"রাত দু'হাতের আঁজলায মুখ টা ধরে কপালে আলতো চুমো খায়।

"এতো ভেবো না।ভুলে যেও না তাদের ইচ্ছেতে কিচ্ছু হবে না।কারণ আমরা আগে থেকেই হাসবেন্ড ওয়াইফ।আমার উপর আস্থা রাখো।"

——————
আজিম হোসাইনের পারসোনাল এসিস্ট্যান্ট জানান তার সাথে দেখা করতে কেউ এসেছে।তার অনুমতি সাপেক্ষে এসিস্ট্যান্ট সাক্ষাতকারীকে নিয়ে আসে তার চেম্বারে।

রাত এসেছে।তিনি খানিকটা অবাক হলেও শান্ত থাকেন।কিভাবে কিভাবে রাতকে অপমান করবে তার ছক কষতে থাকেন মনে মনে।


চলবে....



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।