হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে- পর্ব ১৯

হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ১৯
হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ১৯


গল্পঃ হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে
পর্বঃ ১৯
লেখিকাঃ গল্পকন্যা
প্রকাশকালঃ মে-২০২৩
ক্যাটাগরীঃ প্রেম কাহিনী, জুনিয়র সিনিয়র গল্প


-"রাত ছাড়ো..."

-"না ছাড়লে...?"

-"গরম লাগছে,ঘেমে যাচ্ছি...! "
পাপড়িকে বুকের সাথে চেপে রেখেই গাড়ির এসিটা অন করে বাড়িয়ে দেয়।পাপড়ির কম্পনরত শরীরটা যেন এবার লজ্জাবতির ন্যায় চুপসে যাচ্ছে।
পাপড়িকে বুকের সাথে চেপে রেখেই গাড়ির এসিটা অন করে বাড়িয়ে দেয়।পাপড়ির কম্পনরত শরীরটা যেন এবার লজ্জাবতির ন্যায় চুপসে যাচ্ছে।
রাত পাপড়ির চিবুকে ধরে,মুখটা তুলে।নেশাক্ত কণ্ঠে বলে,"পাপড়ি আই ওয়ান্ট টু কিস ইউর পিঙ্ক লিপস!"
পাপড়ি চোখ বড়বড় করে তাকায়।অনুমতি চাইছে,নাকি নিজের উপদেশ জারি করছে বুঝে উঠতে পারছে না।কেবল ছাড়া পাওয়ার জন্য মোচড়ামুচড়ি করছে।তাই দেখে রাত মুচকি মুচকি হাসছে।এক হাতে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে,অপর হাত গলিয়ে দেয় চুলের মধ্যে।মুহূর্তে দখল করে নেয় একজোড়া গোলাপি অধর।

———————

আর.জে.পি. কোম্পানির একটা মিটিং ফিক্সড করা হয়েছে প্যারাডো ফাইভ স্টার হোটেলের দোতালায়।সেজন্য হোটেলের প্রায় অর্ধেকটা বুকিং দেয়া হয়েছে ।


বিশাল এক ডাইনিং টেবিলে এ ডিনার সার্ভ করা হয়েছে।খাবারে মেন্যুতে রয়েছে সব চাইনিজ,থাই,ইটালিয়ানো খাবার।
মোঃ আজিম হোসাইন মিটিং শেষে পার্টনারদের সাথে ডিনার করছে।তার কথা বলা থেকে শুরু করে খাবার খাওয়ার প্রতিটা ধাপ অতন্ত্য নিখুঁত।যাতে রয়েছে সুচারুতা ।
এ তিন চার মাসে রাত ও পাপড়ির প্রেম গভীর থেকে গভীরে তলিয়ে গেছে।অতি শিঘ্রই রাত ওর পরিবারের সাথে কথা বলে বিয়ের ব্যবস্থা করবে।


বৃহস্পতিবার হওয়ায় দুজনেই আজ অফিস থেকে দ্রুত বেরিয়েছে ।বিকাল থেকেই ঘুরে বেড়িয়েছে।

রাত ন'টায় ঢুকেছে প্যারাডো ফাইভ স্টারে ।

ডিনার সেরে এখানেই দুটো রুম নিয়ে থেকে যাবে।পরের দিন শুক্রবার গুলুইয়া খালি বিচে যাবে ঠিক করেছে।সারাদিন সেখানে প্রচুর ঘুরবে।

রাত দোতালায় উঠে পাপড়ির হাতে ধরে ডান পাশে এগিয়ে যায়।একটা বড়ো ডাইনিং টেবিলের সামনে আসতেই পাপড়ি থমকে দাঁড়ায়।রাত পিছনে তাকাতেই পাপড়িকে কিছুটা অন্য রকম লাগে।পাপড়ির দৃষ্টি নিবদ্ধ সামনের ডাইনিং টেবিলের মূল কেন্দ্র বিন্দুতে থাকা সেই লোকটির দিকে।

মোঃ আজিম হোসানও পাপড়িকে দেখে বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়।আর.জে.পি কোম্পানির মেনেজার বলে,"পাপড়ি মামুনি...!"

পাপড়ি চুপ করে মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে।রাত কিছুই ভেবে পাচ্ছে না।তবে লোকটিকে কোথাও দেখেছে বলে মনে হচ্ছে।

আজিম হোসাইন হেঁটে পাপড়ির কাছে আসে।তখুনি একজন হোটেল স্টাফ এসে রাতকে বলে,"স্যার... সরি স্যার...,এই দিকটা আগে থেকেই বুকিং দেয়া আছে।কাইন্ডলি....! "

আজিম হোসাইন হাত উঁচিয়ে স্টাফকে যেতে বলে।স্টাফ ও সেই কথা অনুযায়ী চলে যায়।

আজিম হোসাইন পাপাড়িকে বলে,"ডিয়ার প্রিন্সেস...!অনেক হয়েছে!আর রাগ করে থেকো না।বাড়ি ফিরে চলো।"

পাপড়ির চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে।মনের তীব্র ক্ষোভ ঝেড়ে বলে,"নাহহহ যাবো না।এখন আমি আত্মনির্ভরশীল।নিজের টাকায় চলি।আপনি আমাকে বড়ো করতে যতো টাকা ব্যয় করেছেন, বলুন?দরকার হলে আমার সারাজীবনের উপার্জন দিয়ে আপনার সব ঋণ শোধ করবো।"

আজিম হোসাইন অনুতপ্ত হয়ে বলে,"সরি ডিয়ার প্রিন্সেস।প্লিজ কাম ব্যাক আওয়ার হোম।আই ফিল সো এ্যলোন।"

পাপড়ি বলে,"এটাই আপনার শাস্তি।"বলেই জায়গাটি ত্যাগ করে।রাত সম্ভিত হয়ে আছে।এতোক্ষণে বুঝতে পারে এই লোকটা ই ভার্সিটিতে আসা সেই লোকটি,যিনি পাপড়ির বাবা।

পাপড়ি চলে যেতেই রাত ভাবে এবার এর একটা সুরহা করার দরকার।

রাত আজিম হোসাইন কে পাপড়ির সাথে ঘটে যাওয়া সব কিছু বলে।সব শুনে আজিম হোসাইন থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে।

রাত বলে,"সব শেষে একটা কথাই বলবো,আপনি এবং আপনার স্ত্রীর মধ্যকার সমস্ত ঝামেলা মিটিয়ে ফেলুন।আপনাদের সন্তানের জন্য মিটিয়ে ফেলুন।দুজন মিলে ওর সামনে দাঁড়ালে,পুনরায় সব কিছু ঠিক করে নিলে, মেয়েটা হয়তো যন্ত্রণাদায়ক জীবন থেকে মুক্তি পাবে।"কথা শেষ হতেই রাত প্রস্থান করে।

গাড়ির মধ্যে পিনপতন নীরবতা।থেকে থেকে পাপড়ির ফুঁপানোর শব্দ আসছে।রাত পাপড়ির মাথায় হাত রাখতেই পাপড়ি রাতের বুকে লুটিয়ে পড়ে।টি-শার্ট খামছে ধরে কাঁদতে থাকে।

রাত দু'হাতে জড়িয়ে ধরে।আদুরে স্বরে বলে,"বাবা-মার ঋণ শোধ করার কোনো উপায় নেই।তাদের স্নেহের কাছে এ পৃথিবীর সব মূল্যবান রত্নও মূল্যহীন।বাবা-মা যে আমাদের ঐশর্য্য।যার নেই সে বোঝে বাবা মা কি।

বাবা-মা সন্তানের সাথে অন্যায় করলে সেটা মনে রাখতে নেই, ভুলে যেতে হয়।তারা যদি তোমাকে এই সুন্দর পৃথিবীর আলো না দেখাতো!পারতে এই সুন্দর পৃথিবী দেখতে?পেতে আমাকে ?আমিও তোমাকে পেতাম না!ভুলে যাও সব কিছু,ক্ষমা করে দেও তাদের।ক্ষমা মহৎ গুণ।"পাপড়ি শান্ত হয়।

সেই হোটেল থেকে বের হয়ে রাত ও পাপড়ি যার যার বাড়ি ফিরে যায়।পরের দিন প্ল্যান মাফিক তাদের দেখা হয় না।ঘুরতেও যাওয়া হয় না।কিন্তু ঘটে যায় এক আশ্চর্য জনক ঘটনা।

পাপড়ির ফ্ল্যাটের দরজায় কেউ নক করছে।বারবার নক করছে।বার কয়েক নক করার পর পাপড়ি দরজা খুলে,কিন্তু সম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

মোঃ আজিম হোসাইন ও রিনা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন।
রিনা বেগম পাপড়িকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন।
পাপড়ি এতোদিন পরে মাকে কাছে পেয়ে কান্না আটকে রাখতে পারেনি।ডুকরে কেঁদে উঠে।

আজিম হোসাইন অশ্রু শিক্ত জলে চেয়ে আছে।বলে,"মামুনি তোর বাবাকে ক্ষমা করে দে।ফিরে চল।আমরা নিজেদের মধ্যে সব কিছু ঠিক করে নিয়েছি।আর কখনো আমাদের মধ্যে কোনো ঝামেলা দেখতে হবে না তোকে।"

রিনা বেগম মেয়েকে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে তোলে।বুকে চেপে ধরে বলে,"চল...মা আমার,আমরা আমাদের সুন্দর সংসারে এক সাথে থাকবো।"

পাপড়ি তখনো সায় জানায়নি।রাত দরজার আড়াল থেকে বের হয়ে আসে।পাপড়ি যেন আরো চমকে যায়।
হ্যাঁ রাতই রিনা বেগমের ঠিকানা জোগাড় করে।তারপর অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে রিনা বেগমকে ও আজিম হোসাইনকে এক সাথে মিলিয়ে দেয়।তারপর সবাইকে নিয়ে একেবারে পাপড়ির ফ্ল্যাটে হাজির হয়েছে।

কৃতজ্ঞতায় পাপড়ির চোখ জোড়া বেয়ে অঝোর ধারায় বর্ষণ হচ্ছে।

আজিম হোসাইন পাপড়ির মাথায় হাত রেখে বলে,"পাপড়ি মা যাবে না আমাদের সাথে?"

রিনা বেগম ও আজিম হোসাইন দুজনেই আকুল হয়ে মেয়ের মতামত জানতে চেয়ে আছে।পাপড়ি রাতের দিকে তাকায়।রাত ঈশারায় হ্যাঁ বলতে বলে।

পাপড়ি ওর মা আর বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,"যাবো।"

মুহূর্তে কয়েকজন লোক এসে পাপড়ির জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে চলে যায় আজিম হোসাইনের বিশাল বাড়িতে।
যাওয়ার আগে আজিম হোসাইন ও রিনা বেগম রাতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে।পাপড়ি রাতের থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে যায় বাবার বাড়ি।

পাপড়ির জীবনের সমস্ত দুঃখ কষ্ট যেন এক নিমিষেই সুখে পরিনত হয়ে গেছে।রাতের সাথে আগের মতো দেখা হয় না তবে নিয়ম করে কথা বলে।দুজনের প্রেমের গভীরতা যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে ।

প্রায় পনেরো দিন পর রাত আর পাপড়ির দেখা হয় পত্যাঙ্গা বিচে।দুজনে বসে আছে একটা বড় পাথরের উপরে।রাত পাপড়ির ফর্সা কোমল হাতের চিকন আঙ্গুল গুলো নিয়ে ব্যস্ত আছে।

পাপড়ি সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,"রাত আমরা বিয়ে করবো কবে?"

রাত পাপড়ির আঙুলের ফাঁকে ওর শক্ত পুরুষ্টু আঙুল গলিয়ে আকড়ে ধরে বলে,"আমাদের বিয়ে তো হয়ে গেছে,আরো ছ বছর আগে।এমনকি বাসর ও... ।"

পাপড়ি রাতের দুষ্টু কথায় রাতের বুকে পেটে বাহুতে দুমদাম মারতে শুরু করে ।রাত হোহো করে হেঁসে উঠে।

রাত পাপড়ির দুহাত নিজের হাতের মধ্যে আটকে ফেলে,তারপর চোখের দিকে নেশাক্ত চোখে চেয়ে ঠান্ডা স্বরে বলে,"সত্যি তো বলেছি।আমাদের বিয়ে ও বাসর দুটোই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে হয়ে গেছে।সে দুটো রাতই এই রাতের জীবনের শ্রেষ্ঠ রাত।"

পাপড়ি লজ্জায় রাঙা হয়ে বলে,"আমার যে সে অনাকাঙ্ক্ষিত রাত চাই না,সজ্ঞানে তোমাকে চাই।সর্ব সম্মুখে তোমার স্ত্রী হয়ে তোমাকে চাই।যতদিন পৃথিবীর বুকে থাকি ততোদিন প্রতিটা দিন,প্রতিটা রাত তোমাকে চাই।"

রাত পাপড়ির কথায় মনে তীব্র প্রশান্তি অনুভব করে।শক্ত করে কোমল নারী দেহটিকে আলিঙ্গন করে।

মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় এ বিষয়ে আজই বাড়িতে কথা বলবে ।ও নিজেও যে পারছে না আর, এত দুরত্ব সইতে।


চলবে....




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।