হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে- পর্ব ১৮

হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ১৮
হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ১৮


গল্পঃ হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে
পর্বঃ ১৮
লেখিকাঃ গল্পকন্যা
প্রকাশকালঃ মে-২০২৩
ক্যাটাগরীঃ প্রেম কাহিনী, জুনিয়র সিনিয়র গল্প


৫০ বছর পরিয়ে আজ পুর্নমিলনি অনুষ্ঠিত হচ্ছে চবি ক্যাম্পাসে।

অনেক পুরনো বন্ধুদের সাথে সাক্ষাৎ হচ্ছে ইউনিভার্সিটি প্রাঙ্গনে।সকলেই যেন পুরনো জীবন ফিরে পেয়েছে।তাদের ছাত্রজীবনের তারুণ্য যেন পুনরায় নবীন হয়ে উঠেছে।প্রত্যেকেই খুশির সাগরে ভাসছে।

অডিটোরিয়ামের এক সাইডে বসে আছে সুমন,জাহিদ,কায়সার,তুলি আরো কয়েকজন পুরোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু।পাপড়িও আছে তাদের সাথে।তবে সবার মধ্যে রাত এখনো এসে পৌঁছায়নি।

পাপড়ির বুকের ভিতরটা কেমন যেন ঢিপঢিপ করছে।ভেতরটা যেন আকুল হয়ে আছে রাতকে দেখার জন্য।দুশ্চিন্তা ও হচ্ছে।রাত কি আসবে না।
পরক্ষনেই আসবে না ভেবে হৃদয়টা ব্যাকুল হয়ে উঠছে।তবুও নিজেকে,নিজের অনুভূতিকে সংযত রাখার চেষ্টা করছে।

জাহিদ বেশ কয়েকবার রাতকে ফোন দিয়েছে।কিন্তু ফোন তোলার নামই নেই।সবাই ভেবে নেয় রাত হয়তো আসবেই না।আসলে ফোনটা ধরতো।সেজন্য সকলের ফুরফুরে মনটা বিষন্ন হয়ে যায় ।

অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ।
প্রবীন কৃতি শিক্ষার্থীরা একে একে তাদের মূল্যবান বক্তৃতার মধ্যে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছে।

কেউ কেউ নিজেদের স্মৃতি হাতরিয়ে নিজেদের করা কিছু ছেলেমানুষীর কথা সকলের সামনে প্রকাশ করে কেঁদে ফেলছে।

অনেকে গান গাইছে,কেউ আবার কবিতা আবৃত্তি করছে।এভাবেই মঞ্চে একের পর একজন সবার মাঝে আনন্দ ছড়িয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

কিন্তু এতো আমোদ প্রোমোদ কিছুই পাপড়ির ভালো লাগছে না।এতো দিনের তৃষ্ণার্থ মন যেন তৃষ্ণা মেটাতে ব্যাকুল হয়ে আছে।কোনো পারফরম্যান্সেই মন বসছে না।কারো কথাও যেন কর্ণকুহরে পৌঁছাচ্ছে না।

অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার ঘন্টা দুয়েক পরে রাতের আগমনী হয়।

রাত জাহিদকে ফোন করতে জাহিদ উঠে দাঁড়িয়ে রাতকে ঈশারা করে।

রাত ঈশারা অনুকরণ করে এগিয়ে আসে সবার বসার স্থানে।কাছে এসে দাঁড়াতেই,নিচু আওয়াজে সকলের সাথে কুশলাদি বিনিময় করে।

শুধু পাপড়ি স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে আছে।।পাপড়ি তার অব্যক্ত অনুভূতির সাথে নিজেকে ধাতস্থ করতে পরাজিত হচ্ছে। চেয়ে আছে অপলক রাতের দিকে।নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।এই সেই রাত।
এ ছেলে যেন এ ক'টা বছরে আরো বেশি সুদর্শন হয়ে উঠেছে।চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়েছে।

পাপড়ির সেই অবশ করা অনুভূতিটা আবার ফিরে এসেছে।

রাত সবার সাথে কথা বলে পাপড়ির দিকে তাকায়।
সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায়।

পাপড়ি ধরা পড়া চোরের মতো নিজের দৃষ্টি লুকায়।

রাত ধপ করে পাপড়ির পাশের সিটে বসে পড়ে।তারপর অপলক চেয়ে থাকে।পাপড়ির খানিকটা বিব্রত বোধ হয়। সেটা কাটাতে সে প্রথমে বলে,"কেমন আছো?"

-"ভালো!"
-"তুমি কেমন আছো?"
-"ভালো!"

অনুষ্ঠানের সকল কার্যকলাপ শেষে ওরা পুরো ক্যম্পাস ঘুরে বেড়ায়।সারাদিন ঘুরেফিরে সন্ধ্যায় সবাই সবার গন্তব্যে ফেরার জন্য বিদায় নিয়ে চলে যায়।

একে একে সকলে চলে যাওয়ার পরেও রাত আর পাপড়ি দাঁড়িয়ে আছে।সারাদিন চোখে চোখে চাওয়া ছাড়া,দুজনের মধ্যে তেমন কোনো কথা হয়নি।

সবাই চলে যেতেই রাত বলে,"যাবে না?"

-"হুম যাবো...!"
-"শশুর বাড়ি কোথায় তোমার?"

পাপড়ি রাতের চোখের দিকে তাকিয়ে হেঁসে উঠে।

রাত অবাক হয়ে বলে,"হাসো কেন?"

-"তো কি করবো?"
-"বলতে না চাইলে,বলো না।হাসবে কেন?"
-"আরে বাবা আমার বিয়ে-ই হয়নি,শশুর বাড়ি আসবে কোথা থেকে?"
-"ওহহ আচ্ছা! তাই বলো!আমি ভাবলাম.... ?"

দু'জনের মধ্যে হঠাৎ করেই যেন পুরোনো সেই বন্ধনটা আবার ফিরে এসেছে।বিভিন্ন আলাপচারিতার মধ্যে দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে সময়।কথা বলতে বলতে কখন যে রাত নয়টা বেজে গেছে টের ই পায়নি।
রাত বলে,"পাপড়ি বাড়ি যাবে না?"

পাপড়ি হেঁসে বলে,"হ্যাঁ অনেক রাত হয়ে গেছে।যাই তাহলে!"

বলে হাঁটা ধরতেই রাত বলে,"আমি এগিয়ে দিয়ে আসি?"

পাপড়ি পিছু ফিরে চায়,সম্মতি জানায়।রাতের গাড়িতে করেই পাপড়ির এপার্টমেন্টের সামনে আসে।পাপড়ি নেমে যেতে,রাত ইতস্তত বোধ করে বলে,"তোমার নাম্বারটা...?"

পাপড়ি সভাব সুলভ মুচকি হেঁসে বলে,"০১৭১......"রাত খুশিতে আত্মহারা হয়ে বাড়ি ফিরে।

বাসায় ফিরেই কনফিউশানে ভোগে, পাপড়িকে কি কল দিবে? নাকি দিবে না?অনেক ভেবে কল দেয়।সঙ্গে সঙ্গে অপর পাশ থেকে চিকন মেয়েলি কন্ঠস্বর শোনা যায়।যেন কল আসার অপেক্ষাতেই ছিলো মেয়েটি।

-"ঘুমাও নি?"
-"নাহ!"
-"মনে হচ্ছে কারো অপেক্ষায় ছিলে?"রাতের দুষ্টুমি বুঝতে পেরে পাপড়ি বলে," তেমন কিছু না?ঘুম আসছিল নাহ।"
-"কিন্তু আমার তো অন্য কিছু মনে হচ্ছে?"
-"কি মনে হচ্ছে?"
-"আচ্ছা তোমার সোহানের কি খবর?"
-" সেই ঘটনার পর ওর সাথে আর কখনো যোগাযোগ করিনি!কেন যেন সে-ও আর কোনো বাড়াবাড়ি করেনি!তাই আমিও বেঁচে গেছি,শান্তি মতো হোস্টেলে থেকেই এক্সামটা দিতে পেরেছি।"এটা শুনে রাত রহস্যময় হাসিতে হেঁসে উঠে।
-"তার মানে তুমি সিঙ্গেল?"
-"হ্যাঁ বলতে পারো!"
-"ভালোই হলো..."
-"কিছু বললে?"
-"তেমন কিছু না..."

এভাবেই পুনরায় দুজনের মধ্যকার বন্ধুত্ব জেগে উঠেছে।তবে একে অপরকে বন্ধু ভাবলেও, আদৌও কি সেটা বন্ধুত্ত্ব?

আসলে সেদিন যখন পাপড়ি রাতের বাসা থেকে চলে যায়।তারপর পরই রাত একটা প্ল্যান করে।সোহান কে চরম ভাবে শিক্ষা দেওয়ার প্ল্যান।

পরদিন রাতে ওর প্ল্যান অনুযায়ী সবাই বসে আছে চবি ইউনিভার্সিটির হতাশার মোড়ে।সোহান ওর রাতের আড্ডা শেষে এই পথ ধরেই প্রতিদিন বাড়ি ফিরে।

প্রতিদিনকার ন্যায় সেদিনও যাচ্ছিলো।আশেপাশে কেউ নেই।রাত হঠাৎ করে রাস্তার পাশ থেকে উঠে এসে এক মুঠো মরিচ গুড়ো ছুঁড়ে মারে সোহানের চোখে ।সোহান চেঁচিয়ে উঠে," ও মা গো...., কে রে...,কি করলি.., আমি তো মরে গেলাম।"

এর পর আর কথা বলার সুযোগ হয়ে উঠেনি সোহানের।একের পর এক ব্যাট ও স্টেম্পের আঘাতে সমস্ত শরীর জর্জরিত হয়ে যায়।

রাত চিল্লাতে চিল্লাতে পিটাতে থাকে,"মাদার**...তুই আমার কলিজার গায়ে আঘাত করতে চাইছিস।ফুলের মতো পবিত্র মেয়েটার গায়ে কলঙ্ক লাগাতে চাইছিস,তোকে আজকে মেরেই ফেলবো...!"বলেই ইচ্ছে মতো পিটাতে থাকে।সোহান বার বার কাকুতি মিনতি করতে থাকে।কিন্তু রাতের কোনো দিকে হুঁশ নেই।ওর কেবল পাপড়ির সাথে হওয়া অন্যায় গুলোর কথাই মনে হচ্ছে।এতোগুলো দিন এই সোহানের জন্যই পাপড়িকে পায়নি।পাপড়ি চেয়ে ও নিজেকে সোহানের কাছ থেকে সরাতে পারেনি।

মনের সাধ মিটিয়ে পেটানোর পরে রাত বলে,"আর কোনোদিন যদি পাপড়ির দিকে ফিরে তাকানোর সাহস করিস,তাহলে এই দুনিয়া দেখার জন্য তোর চোখ থাকবে না।"

জাহিদ এতোক্ষণ ধরে ওদের দুমচে পেটানোর মুহূর্তটা ফোনে ভিডিও করে।

রাত সোহানকে হুমকি দেয় বলে,"যদি কখনো পাপড়ির থাকা খাওয়া কিংবা পড়াশোনা বা অন্য কোনো সমস্যা হয়,অথবা কেউ এ মারমারির ঘটনার কথা জানে, তাহলে এই ভিডিও ক্যাম্পাসের সবার ফোনে ফোনে ছড়িয়ে যাবে,তখন চাইলেও এ অপদস্ত মুখ কাউকে দেখাতে পারবি না ?"

————————
ক্যাফেটেরিয়ায় বসে আড্ডা দিচ্ছে জাহিদ,সুমন,রাত,পাপড়ি।মূলত সকলের কর্মস্থল থেকে ফিরতি পথে আকস্মিক দেখা হয়ে যায় চারজনের।

সুমন,জাহিদ রাতের সাথে দেখা করতেই আসছিলো,পথিমধ্যে পাপড়ির সাথে দেখা হতেই তাদের সঙ্গে জোর করে পাপড়িকে নিয়ে আসে।

এই ভর সন্ধ্যায় এমন চমক পাবে রাতের কল্পনাতিত।

আজকে অফিসে একটা লাইভ টেলিকাস্ট এটেন্ড করতে হয়েছে পাপড়িকে।যার দরুন পাপড়িকে শাড়ি পড়তে হয়েছিলো।জাহিদ ও সুমনের জোরাজুরিতে সেই শাড়ি পড়ে আসতে হয়েছে।

রাত পাপড়ির দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।

এ ক'বছরে রাত সবসময় পাপড়ির চ্যানেলের নিউজ গুলো দেখতো।আসলে নিউজ না,পাপড়িকে দেখতো।টিভির স্ক্রিনে দেখেই মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করতো।মনটা মাঝেমধ্যে উতলা হয়ে উঠতো একটু কাছ থেকে দেখার জন্য।কিন্তু সেই পাপড়ির নিষেধাজ্ঞা।সেই নিষেধাজ্ঞা ওকে আটকে দিতো।

জাহিদ রাতের পলকহীন তাকানো দেখে সরাসরি বলে,"ভাই আমি জানি তোরা দু'জনই দু'জনকে পছন্দ করিস,যেহেতু মাঝখানে কোনো বাধা নেই,তাহলে কেন নিজেরা নিজেদের মধ্যে দেয়াল তুলে রেখেছিস।এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে চোরের মতো না দেখে,দুজন একটা সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে যা।

রাত আর পাপড়ি দুজনেই লজ্জিত বোধ করে।তবে জাহিদের কথাটা ফেলে দেয়া যায় না।রাত কিছু দিন যাবৎ শুধু ভেবেই চলেছিলো এ বিষয়ে,আজ জাহিদের কথা যেন আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছে।জাহিদের কথা শুনে আজ মনে হচ্ছে,"হ্যাঁ বলেই দেয়া উচিত।"

রাত আর এক মুহূর্ত দেরি করেনি।পাছে ফের হারাতে হয়।

টেবিলের উপর রাখা পাপড়ির বা হাত আকড়ে ধরে বলে,"আই লাভ ইউ সো মাচ।আই ডোন্ট লিভ উইদাউট ইউ।প্লিজ বি মাইন।গিভ মি দ্যা রেসপন্সিবিলিট অফ লাভিং ইউ ফরএভার।"

রাতের কথা শুনে পাপড়ির চোখে খুশিরা চিলিক দিয়ে উঠে।আসলে পাপড়ির মন প্রাণ ও যে এটাই চাইছে।আজ সে আত্মনির্ভরশীল।তার লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে।আজ যে আর কোনো বাঁধা নেই।

পাপড়ি খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলে,"ইয়েস...আই অল সো লাভ ইউ। লাভ ইউ সো মাচ।"রাত মনের অনুভূতিকে সংবরণ করতে না পেরে সবার সামনে পাপড়ির হাতের উল্টো পিঠে চুমু খায়।যার ফলে সকলেই হো হো করে হেঁসে উঠে।পাপড়ি লজ্জা পেয়ে যায়।

এ রাতের পর থেকেই শুরু হয় দুজনের মধ্যে এক মধুর সম্পর্ক।পাগলের মতো ভালোবাসতে থাকে একে অপরকে।
রাতের এতো ভালোবাসা পেয়ে মাঝেমধ্যেই পাপড়ির ভয় হয়।এতো ভালোবাসা সইবে তো ওর ভাগ্যে?

দুজনের অফিস শেষে প্রতিদিনই দেখা করে।আজকেও অফিস শেষে রাত গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।পাপড়ি অফিস থেকে বের হয়ে দেখে রাতের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।অফিসের যে গাড়ি ওকে প্রতিদিন নামিয়ে দিয়ে আসে সে গাড়ি ছেড়ে রাতের গাড়িতে উঠে বসে।

পাপড়ি গাড়িতে উঠে বসতেই,রাত এক টানে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়।এমন আকস্মিকতায় পাপড়ি হকচকিয়ে যায়।বুকের ভিতর অদ্ভুত ভাবে শব্দ হতে থাকে।

পাপড়ি কাঁপা কণ্ঠে বলে,"রাত ছাড়ো..."



চলবে...




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।