হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে- পর্ব ১৭

হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ১৭
হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ১৭


গল্পঃ হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে
পর্বঃ ১৭
লেখিকাঃ গল্পকন্যা
প্রকাশকালঃ মে-২০২৩
ক্যাটাগরীঃ প্রেম কাহিনী, জুনিয়র সিনিয়র গল্প


কথায় কথায় রাত বারোটা বেজে গেছে।

বাইরে প্রচুর বৃষ্টি,সাথে বজ্রপাত হচ্ছে।হুট করেই কারেন্ট চলে গেছে।ফোনের ফ্লাশ অন করে,চার্জার লাইট বের করে রাত পাপড়ির পাশে বসে আছে।বৃষ্টির শব্দ রুমের থমথমে নিস্তব্ধতা কাটিয়ে এক অদ্ভুত ছন্দ তুলছে ।

পাপড়ির গায়ে কাটা দিয়ে উঠছে।রাতের অনুভূতি-ও অব্যক্ত,উদ্যাম,উচ্ছ্বসিত।

রাত কন্ঠ খাদে নামিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলে,"চিন্তা করো না।সব ঠিক হয়ে যাবে।তোমার আপত্তি না থাকলে আমার বাসায় থেকেও পরীক্ষা দিতে পারো।আর যদি এতে প্রবলেম থাকে তাহলে আমার বান্ধবীদের সাথে কথা বলে মেসের ব্যবস্থা করে দিতে পারবো।"

পাপড়ি ছোটো করে বলে,"হুঁ।"

এমন নিস্তব্ধ রুমে রাতের সাথে একাকী কেমন যেন অস্থিরতা কাজ করছে।সেই অস্থিরতায় খানিকটা লজ্জা বিধ্যমান।

হঠাৎ মনে পড়ে যায় সেই ঝড় বৃষ্টির রাতের কথা।"সে রাতটা তো ছিলো এমনি এক ঝড় বৃষ্টির রাত।সে রাতে ওর আর রাতের বিয়ে হয়েছিলো।যতোই ওরা মানুক বা না মানুক, বিয়েটা তো ধর্মীয় পন্থা অনুসরণ করেই হয়েছিলো।মানুষের বিয়ে তো একবারই হয়।"পাপড়ি আবার ভাবে," আমি যদি বিয়েটা মেনে নেই, রাতও কি মেনে নেবে?"নিজের ভাবনার জন্য নিজেকেই ধমকে উঠে।

অপর দিকে রাতের মনেও জাগরন হচ্ছে অদ্ভুত সব অনুভূতির।ভেতরে চলছে বিবেক আর বিবেচনার লড়াই।একে অপরের কাছে পরাজিত হচ্ছে।মনে উঁকি দিচ্ছে সুপ্রবৃত্তি বাসনারা।

সেটাকে কি আদোও হারাম বলা যায়?
নাকি সম্পূর্ণ হালাল?

দুজনের মনের অনুভূতি একি,তবু চলছে অদৃশ্য লড়াই।কখন যেন এ লড়াইয়ের কাছে পরাজিত হয়ে যায়।জিতে যায় দেহের ও মনের সুপ্ত চাহিদা।

রাত বলে,"অনেক রাত হয়েছে তুমি বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ো আমি মেঝেতে শুচ্ছি।"বলে উঠে যেতে নিতেই পাপড়ি হাত ধরে বলে,"নাহহহ...!"

টর্চ লাইটের অল্প আলোতে পাপড়ির দিকে তাকায়।বলে,"আমার বাসায় আর রুম নেই,থাকলে ওখানে থাকতাম।ডাইনিং রুমটা তো দেখেছোই কতো ছোটো,কারো থাকার উপযোগী না।"

পাপড়ি ইতস্তত করে বলে,"আমি বলছি কি,তুমি বিছানার এক পাশে থাকো আর আমি আরেক পাশে।মাঝখানে কোল বালিশ দিয়ে আরকি....."

রাতের মধ্যকার সুপ্ত বাসনা গুলো ছোটাছুটি করছে,হয়ে উঠেছে দস্যি দামাল।

কথা না বাড়িয়ে চুপ করে শুয়ে পড়ে।নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে চায় না।পাপড়িও অপর প্রান্তে শুয়ে পড়ে।
দুজনের বেডের মাঝখানে আর কোলবালিশ দেয়া হয় না।

বাহিরে গগন কাঁপানো ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে।আর অপর দিকে দুজন মানব মানবির মনেও বইছে ঝড়।উচ্ছাসেরা নামছে প্রবল বৃষ্টি হয়ে।

দুজন মানব মানবি-ই ঘুমিয়ে পড়েছে।

মাঝ রাতে কখন যে নিজেদের অজান্তেই একে অপরের কাছাকাছি চলে এসেছে কারো জানা নেই।একেবারে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে আছে একে অপরকে।

নারী দেহের কোমল স্পর্শে রাতের ঘুম হালকা হয়ে যায়।কোমল অধরে অধর মিলে যায়।ঘুমন্ত মানবীটির ও নিজেকে সামলে রাখা দায় হয়ে পড়ে।কিছুতেই আটকে রাখার সাধ্য নেই।

আর নিজের স্বত্তায় নিমোজ্জিত থাকতে পারেনি।আর না কোনো বাধা দিতে পেরেছে।নিজেকে উজার করে দিতে থাকে তৃষ্ণার্থ প্রণয়ীর কাছে।যেন তেইশটি বছর এই দিনটির অপেক্ষাতেই ছিলো।

দুজনেই উপলব্ধি করতে পারছে কি হচ্ছে,কি তাদের পরিনতি?কিন্তু পিছিয়ে আসার সাধ্য কারো নেই।পিছিয়ে আসার কোনো উপায়-ও তাদের জানা নেই।

শুধু যা হচ্ছে হতে দেয়াই তাদের একমাত্র কাজ।তাই অবাধ্য দেহ-মন উজার করে দিতে থাকে একে অপরের কাছে।

সকাল ৮টা।

পাপড়ির ঘুম ভাঙে।ঘুম ভাঙতে-ই শরীরে সূক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করে।চোখ মেলে দেখে রাতের বাহুডোরে আবদ্ধ।নিজের দিকে তাকিয়ে পিলে চমকে যায়।রাতেরও একি অবস্থা।পাপড়ি হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকে।রাতের ঘুম ছুটে যায়।ঘুম ভাঙতেই হুঁশ উড়ে যাওয়ার অবস্থা।

বারবার পাপড়িকে থামানোর চেষ্টা করে।কিন্তু উল্টো কান্নার গতি বেড়ে যায়।উপায় না পেয়ে মুখ চেপে ধরে।তারপর এক নাগাড়ে বলতে থাকে,"সরি...সরি...এক্সট্রেমলি সরি।কারো ইচ্ছেতে কিছু হয়নি প্লিজ কেঁদো না।প্লিজ।"

পাপড়ির চোখের জল দেখে রাতের কষ্ট হচ্ছে।"নিজেকে সেডিস্ট মনে হচ্ছে, প্লিজ কেঁদো না।"

পাপড়ি রাতের হাত সরিয়ে বলে,"তোমার একার দোষ নেই।আমারই দোষ।মেয়ে হয়ে নিজে নিজেকে কনট্রোল রাখতে পারিনি।আমি নারী জাতির কলঙ্ক।আমি সোহানের চেয়েও খারাপ..."বলে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে।

রাত পাপড়ির মুখ চেপে ধরে বলে,"নাহ তুমি কোনো ভুল করোনি,তুমি তোমার বিয়ে করা হাসবেন্ডের সাথে আবদ্ধ হয়েছো...."পাপড়ি স্তম্ভিত হয়ে চায়।

-"কিন্তু এটা আমার লক্ষ্য না রাত।আমার লক্ষ্য ভিন্ন।আমি কোনো সম্পর্কে জড়াতে চাইনা,পারবোও না।আজকে আমি যদি এ ভুলের জন্য প্রেগনেন্ট হয়ে যাই,আমার সব শেষ হয়ে যাবে।আমার এতোদিনের স্ট্রাগল শেষ হয়ে যাবে।"
-"কেন প্রেগনেন্ট হবে,আমি আছি তো।সব কিছুর সলিউশন আছে।আমি ব্যবস্থা করছি।আর কিসের স্ট্রাগলের কথা বলছো?"
-"তা তুমি বোঝবে না।"
-"কেন বুঝবো না।কেন নিজের কাছে নিজেকে ছোটো করছো। তুমি কোনো অবৈধ বা হারাম কাজে লিপ্ত হওনি।আমি তোমাকে ভালোবাসি এবং স্ত্রী হিসেবে মানি।আর কি চাই তোমার?আর কি বোঝাতে চাও?"
-"রাত আমি এতিম না।"

রাত চমকে যায়, বলে,"মানে?"

-"মানে আমি এতিম না,আমি আমার বাবার সাথে জেদ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি।সাবলম্বী হয়ে দেখাবো বলে।সবসময় জেনে এসেছো বাবা-মা তার সন্তানকে ত্যাজ্য করে।কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ভিন্ন।আমি ওদেরকে ত্যাজ্য করেছি।"

রাত বাকরুদ্ধ।

পাপড়ি বলতে শুরু করে,"আমার বাবা-মায়ের ডিবর্স হয়ে গেছে।ছোটোবেলা থেকে তাদের মধ্যে কখনোই আমি ভালো সম্পর্ক দেখিনি।সব সময় ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকতো।তার প্রভাব পড়তো আমার উপর।

কখনো আমাকে তারা সন্তানের মতোন করে, ট্রিট করতে পারেনি।কারণ তাদের একে অপরের প্রতি থাকা বিক্ষিপ্ত মন মানসিকতা।

আমার বাবা-মার থেকে যথেষ্ট ভালোবাসা আমি পাইনি।যেটা আর পাঁচটি সন্তান পায়।আর.জে.পি. কোম্পানির ওনার মোঃ আজিম হোসাইন আমার বাবা। আমার বাবার বিশাল বাড়িতে কোনোদিন এক গ্লাস জল গড়িয়ে খেতে হয়নি।চাওয়ার আগেই বাড়ির কাজের লোকেরা সব করে দিয়েছে।শখের সব কিছু শখ করার আগেই সামনে হাজির হয়েছে।তাই সেগুলো ছিলো আমার কাছে মূল্যহীন।

বিলাসিতার মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছিলো সবসময়, কিন্তু আমারতো এসব চাই না।আমার চাই বাবার হাতে এক লোকমা খাবার।মায়ের কোলে শুয়ে ঘুমানো।দু'জনের সাথে একটু নিরিবিলিতে ঘুরতে যাওয়া।কিন্তু না। ওসব তো স্বপ্ন দেখার সমতুল্য।

কড়া রুলস রেগুলেশনে চলতে হয় আমাকে আর মাকে।এভাবেই বেড়ে উঠছিলাম।

এইচএসসি রেজাল্টের পর বাবা চাইছিলো বিদেশে পাঠাতে,আমি রাজি হইনি।

তখন সবে মাত্র চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি।আমাদের বাসায় গেস্ট এসেছে।তা নিয়ে বাবা-মা দুজনের মধ্যে তুমুলঝগড়া বাদে।জানো আমি আমার বাবা-মায়ের পায়ে ধরেছি,তারা থামেনি।উল্টো আমাকে টাকার খোঁটা দিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছে।"

তারপর ছাবাদের বাসা থেকে সোহানের সাথে ঘটা সব কাহিনি খুলে বলে রাতকে।

সব শুনে রাত পুরো থ।

তারপর বলে সবচেয়ে অবাক করা কথা।

সেটা হলো,"সেদিন যে ভদ্রলোক আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলো,যাকে নিয়ে সবাই এতো বাজে উক্তি করে,সে আমার জন্মদাতা,আমার বাবা।আমাকে নিতে আসে,আমার পড়াশোনার খরচ দিতে আসে,দয়া করে।কিন্তু আমি গ্রহণ করি না।আজকে ওনাদের দুজনের জন্য আমার এই পরিনতি।না হয় আমি ও আর পাঁচটা মানুষের মতো বাঁচতে পারতাম।এভাবে জায়গায় জায়গায় অপদস্ত হতে হতো না।আমি কোনোদিন ক্ষমা করবো না ওদের।

রাত আমার জীবনের লক্ষ্য ভিন্ন,তাই আমাকে ক্ষমা করো।আমি তোমার অনুভূতির মূল্য দিতে পারবো না।আমার লক্ষে আমাকে পৌঁছাতেই হবে।

রিকোয়েস্ট করছি আজকের ঘটনাটা ভুলে যাও ।
আমার সাথে নিজেকে আর জড়িও না।আশা করি পূর্বের মতো এবারও আমার কথার অমান্য করবে না। "পাপড়ির গাল ও গলা ভিজে গেছে চোখের পানিতে।

পাপড়ির জীবনের দুর্বিস্বঃহ এই অধ্যায় জেনে অজান্তেই রাতের চোখে পানি চলে আসে।
______________

সেই ঘটনার পর দীর্ঘ পাঁচ বছর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে।

এতোদিনে তাদের মধ্যে আর একবারও যোগাযোগ হয়নি।
সামনা সামনি দেখাও হয়নি।কিন্তু মাঝেমধ্যেই রাতের মনে পড়ে যায় সে রাতের সুখানুভূতি।প্রথম নারী দেহ স্পর্শ করা।

একে অপরের গভীর থেকে গভীরে ডুবে যাওয়া।

সাম্প্রতিক রাতকে একটা চবি ফেসবুক গ্রুপে এড করেছে।চবি ইউনিভার্সিটিতে পঞ্চাশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হবে।বর্তমানে অধ্যয়ন রত শিক্ষার্থীরা সেই অনুষ্ঠানে সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।

চট্টগ্রাম গণপূর্ত জোনের একজন তত্তাবধায়ক প্রকৌশলি রাত।
সুমন একজন ইংরেজী প্রফেসর।জাহিদ একজন সফল ব্যবসায়ী।কায়সার ও একজন ব্যবসায়ী।
আফসার ব্যাংকার।সবাই মোটামুটি ভালো ভাবেই সেটেল্ড।

আফসার জাহিদ বিয়ে করে ফেলেছে।বর্তমানে চমকপ্রদ সময় কাটাচ্ছে।জাহিদ কক্সবাজারে একটা ফাইভ স্টার হোটেল খুলেছে।সেখানেই থাকে তার বউ ইফতি কে নিয়ে।

আগামী সপ্তাহে পঞ্চাশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হবে।তাই গ্রুপে সবাই এক সাথে হয়েছে।জানা অজানা কথা হচ্ছে।
এই চবি গ্রুপটার উছিলায় সবার সাথে পুনরায় যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে।কর্ম ব্যস্ততায় যাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হতো না।তাদের সাথে ও যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে।সকলে যেন ফিরে যাচ্ছে তাদের ভার্সিটি লাইফে।আড্ডা দিচ্ছে চায়ের কাপ হাতে কোনো এক ঝুপড়িতে।আড্ডা হচ্ছে শাটল ট্রেনের বগিতে।

অফিস থেকে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে সবে মাত্র বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে।ওয়াইফাই অন করতেই মেসেঞ্জারের টু টাং শব্দের ঝড় বইছে।

চবি কমিউনিটি গ্রুপ অন করতেই দেখে।রোদেলা পাপড়ি নামের আইডি থেকে মেসেজ টাইপিং হচ্ছে।

তুলি,রেশমি,ইফতি,জাহিদ,সুমন,আফসার,কায়সার আরো অনেকের কনভারসনের বন্যা বইছে স্ত্রিনে।

লাফিয়ে লাফিয়ে একের পর এক লাইন উপরে উঠে যাচ্ছে।
রাতের বুকের ভিতর ঢিপঢিপ করছে।

মনে হচ্ছে সেই রাতের উন্মাদনার কথা।সারা শরীরের লোম কাটা দিয়ে উঠেছে।

পাপড়ির টাইপিং শেষ।চোখের সামনে ওর এড্রেস।
চট্টগ্রাম ন্যাশনাল টিভি চ্যানেলের একজন জার্নালিস্ট ও রিপোর্টার পাপড়ি।

রাত টাইপ করে," কেমন আছো পাপড়ি?"
রাতের মেসেজ স্ক্রিনে ভাসতেই সকলের টাইপ করা বন্ধ হয়ে যায় ।

তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পাপড়ির মেসেজ ভেসে উঠেছে,"আল্লাহ ভালো রেখেছেন।তুমি কেমন আছো?"
"ভালো"


চলবে....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।