হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে- পর্ব ১৫

হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ১৫
হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ১৫


গল্পঃ হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে
পর্বঃ ১৫
লেখিকাঃ গল্পকন্যা
প্রকাশকালঃ মে-২০২৩
ক্যাটাগরীঃ প্রেম কাহিনী, জুনিয়র সিনিয়র গল্প


পাপড়ি ওদের এড়িয়ে পা বাড়িয়ে দু'কদম এগিয়ে যায়।

পেছেন থেকে একজন চুলের ঝুটি টেনে ধরে।পাপড়ি আহহ করে চেঁচিয়ে উঠে।

ততক্ষণে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে।কয়েকজন ছাড়া কেউ নেই আসেপাশে।পাপড়ি ঘুরে দাঁড়ায়, যে হাতে ওর চুলে ধরেছে সে মেয়েটার সে হাত মুচড়ে ধরে।

সকলে পাপড়ির সাহস দেখে বিস্মিত।এদের মধ্যে ভিপি নূরের জিএফ গিয়ে পাপড়ির টপসের গলায় ধরে।ওড়নাটা আগে থেকেই ওদের হাতে।পাপড়ি নড়তেও পারছে না।নড়লেই গলা থেকে জামাটা ছিঁড়ে যাবে।

মেয়েটা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেদের মধ্য থেকে সোহানকে ডাকে।তারপর সোহানের সামনে বলে,"বল তোর বডি সাইজ কতো?না বললে এখুনি ছিঁড়ে ফেলবো।"

লজ্জা আর ঘৃণায় পাপড়ির নাক মুখ কুঁচকে আসে,চোখ থেকে পানি পড়ে।সোহান বাঁকা হেঁসে তাকিয়ে আছে বডির দিকে।চোখ দিয়ে স্ক্যান করছে আপাদমস্তক।

মেয়েটি একটু টান দিতেই গলার কাছে কিছুটা অংশ ছিঁড়ে যায়।

পাপড়ি হুরমুর করে বলে,"ছত্রিশ-সাতাশ-ছত্রিশ!"

"বাহহহ!হট আছিসস তো!"

তারপর ব্যাঙ্গ করে চিল্লিয়ে বলে,"সোহাইন্না...!"সবাই এক সাথে হেঁসে উঠে।

এর পরের দুইদিন পাপড়ি আর ভার্সিটি যায়নি।বাসায় যে দুই দিন থেকেছে সেই দুইদিন সারাদিন ওকে দিয়ে কাজ করিয়েছে।

দুইদিন পর ভার্সিটিতে আসতেই সোহানের সমুখীন হতে হয়।সোহান ওর প্রস্তাবে রাজি হতে আহ্বান জানায়।না হয় পুনরায় এর কোঠোর র্যাগিং এর স্বীকার হওয়ার ভয় দেখায়।

কিন্তু পাপড়ি হার মানতে নারাজ।

যতবারই যার্গ দেয়ার চেষ্টা করে সাহসীকতার সাথে মোকাবিলার চেষ্টা চালায়।কিন্তু এতোজনের সাথে একাকি কোনো সাপোর্ট ছাড়া পেরে উঠে না।

এভাবেই কেটে যাচ্ছিলো যন্ত্রনাদায়ক দিন গুলো।

ফর্সা টকটকে গায়ের রঙ এখন মলিন হয়ে গেছে।সেই ঝেল্লা হারিয়ে গেছে দিন রাত অক্লান্ত পরিশ্রমে

সারাদিন পরিশ্রম করে রাত কাটে নিজের পরিনতির জন্য কাঁদতে কাঁদতে।ভোর হতেই আবারও শুরু হয় এক যন্ত্রণাদায়ক দিনের।

সেদিন ছাবার মা ছাবার নানা বাড়ি গেছে।বাসায় ছাবা, পাপড়ি আর ছাবার বাবা।

ছাবা আর পাপড়ি ছাবার রুমে একি বেডে শোয়।রাত প্রায় দু'টো বাজে।পাপড়ি হঠাৎ ওর পেটে কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করে।তাৎক্ষণাত ধরফরিয়ে উঠে বসে।

দেখে ছাবার বাবা একটা লুঙ্গি পরে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছে।

পাপড়ি বলে,"আঙ্কেল আপনি!"

"হ্যাঁ ড্রয়িং রুমে আসো,কথা আছে।"

পাপড়ির বুঝতে অসুবিধা হয়নি মতলবটা কি।কি মতলবে ওর পেটে হাত রেখেছে।ভাবতেই ওর গা গুলোচ্ছে।এখুনি যেন মুখ ভর্তি বমি করে ফ্লোর ভাসিয়ে ফেলবে।

পাপড়ি বলে,"আপনাকে আমি আমার বাবার মতো দেখি।আমি কোথাও যাবো না আঙ্কেল।যান ঘুমান গিয়ে।নয়তো আমি ছাবাকে ডাকবো আর বলে দেবো আপনার কুকৃতি। সেটা অবশ্যই আপনার জন্য সুখকর হবে না।"

একথা শুনে ভূত দেখার মতো জায়গাটি ত্যাগ করে শয়তান রূপি ভদ্রলোক।

পাপড়ি বাথরুমে যেয়ে হুহু করে কেঁদে ওঠে।বুঝতে পারে এখানে আর থাকা যাবে না।হোস্টেলে সিটের জন্য আবেদন করেছে,আরো দশ দিন সময় লাগবে।কিন্তু এই নতুন আতংক নিয়ে কিভাবে এই দশদিন পার করবে।

পরেরদিন ভার্সিটিতে পা রাখতেই শুরু হয় সেই সিনিয়র আপুদের টর্চার। পাপড়িকে বাধ্য করে কাউকে চড় মারতে, নয়তো বিল্ডিংয়ের লেডিস ওয়াশরুম পরিষ্কার করতে।

পাপড়ি ওর দুর্বল শরীর নিয়ে এতো বড়ো ওয়াশরুমটাই ক্লিন করে।শুধু শুধু কাউকে চড় দেয়ার চেয়ে এটাই উত্তম মনে করে।

ওয়াশরুম ক্লিন করার পর ক্লান্ত হয়ে চলে যাওয়া ধরতেই পুনরায় চেপে ধরে থার্ড ইয়ারের কারো হাত থেকে বই নিয়ে ছিঁড়ে ফেলতে।

পাপড়ি বার বার না করলেও ওকে বিভিন্নভাবে বাধ্য করা হয়।অতঃপর একটা ছেলের হাত থেকে বই টেনে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে।

তারপর ছেলেটি রেগে পাপড়ির নামে ডিপার্টমেন্টর হেডের কাছে বিচার দেয়।সেখানে পাপড়ির কোনো কথাই শোনা হয় না।ছেলেটির কাছে পাপড়িকে ক্ষমা চাইতে হয় এবং বইয়ের জরিমানা দিতে হয়।

হ্যাড স্যার পাপড়িকে ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দেয়।নেক্সট টাইম ওর নামে কোনো কমপ্লিন হলে প্রিন্সিপালের কাছে নালিশ করবে।

এদিকে এতো ধকলের পড়েও পাপড়ি বাড়িতে যেয়ে দেখে আজও ছাবার মা আসেনি।

সেদিনও পূর্বের দিনের মতো পাপড়ির পেটে কারো স্পর্শ অনুভব করে,সঙ্গে সঙ্গে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বসে।

বসতেই মধ্যবয়স্ক লোক আক্রমণ করে।পাপড়িকে টেনে ড্রয়িং রুমে নিয়ে যায়।জোরজবরদস্তি শুরু করে।জোরজবরদোস্তির এক পর্যায়ে পাপড়ি নিজেকে বাঁচাতে পাশে থাকা ফুলদানি দিয়ে ছাবার বাবার মাথা আঘাত করে।

লোকটি চেঁচিয়ে উঠে।ছাবার ঘুম ভেঙে যায়।দেখে পাপড়ির গায়ে ওড়না নেই।পড়নের কাপড় চোপড় এলোমেলো।ওর বাবার গায়ে ও জামা নেই।মাথায় হাত দিয়ে কোঁকাচ্ছে।

পাপড়ি কাঁদছে, অঝোরে বর্ষণ বইছে কষ্টের বারিধারার।

ঠিক ঐ মুহূর্তে ছাবার বাবা বলে,"ছাবা দেখ মেয়েটা কতোটা নিকৃষ্ট,আমাকে কি সব বাজে কথা বলে।ওকে আমি তোর মতো দেখি,সেখানে ও আমাকে বলে আমার বেড রুমে আমার সাথে থাকবে।আরো কি কি সব কথা যা আমার মুখে আসবে না।
তোর মা বাসায় নেই তাই কি সুযোগটাই না নিচ্ছে।আমি তোকে বলে দিবো বলেছি দেখে আমাকে মাথা আঘাত করেছে।সাহায্যের নামে ঘরে কি কাল সাপ নিয়ে এলি রে মা।আমাকে এখন মেরেই ফেলতো এই দুশ্চরিত্রা মেয়ে।"ওর বাবার এই নেকা কান্না দেখে ছাবা নিজে যেচে পাপড়িকে সাহায্য করার জন্য অনুশোচনায় ভোগে। ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে চায় পাপড়ির দিকে।

পাপড়ি শুধু অবাক হয়ে চেয়েই থাকে।কি থেকে কি হয়ে গেলো।
হারে হারে টের পাচ্ছে এ সমাজে একা টিকে থাকা কতটা কষ্টকর।

এ বাসায় আর ঠাঁই হবে না,সেটা ওর বোঝা হয়ে গেছে।ছাবার মা আসলে ওর জন্য এই মিথ্যা অভিযোগ ও বড্ড কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।সকাল হতেই নিজের সব কিছু নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়।হোস্টেলের সিট পেতে আরো দশ দিন।কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে।সারাদিন ক্যাম্পাসের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে কাটালেও রাতের বেলা একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই।

যখন চিন্তার মহা সাগরে উপনীত হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে,তখনই আবির্ভাব হয় সোহানের।নানান ভাবে ফ্লার্টিং করতে থাকে,এক পর্যায়ে অপদস্ত ও।

পাপড়ির মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি খেলে গেলো,"এতো মানুষ ওর সাথে এতো অন্যায় করছে,তাহলে ও কেন পারবে না সোহানের সাথে প্রেমের অভিনয় করে নিজের কার্যসিদ্ধি করতে।"যেমন ভাবা তেমনই কাজ।যেহেতু ওর কাছে আর কোনো অপশন নেই।তাই বলে,"আমি আপনার সাথে রিলেশন করতে রাজি আছি।তবে একটা শর্তে।"

সোহান পাপড়ির কথা শুনে মনে হচ্ছে মাত্র আকাশ থেকে মাটিতে পড়েছে।থতমত খেয়ে বলে,"বলো কি শর্ত,তোমার সব শর্ত মানতে রাজি।"

"শর্ত হলো আমার অনুমতি ছাড়া কখনো আমাকে ছুঁতে পারবেন না।আর ছুঁতে চাইবেনও না।"

সোহান মনে মনে ভাবে," কিছু দিন যাক,সে সব দেখা যাবে।কিভাবে সব কিছু আদায় করতে হয় তা আমার ভালোই জানা আছে।"

মুখে বলে ঠিক আছে,"তুমি যা বলবে তাই হবে।"

সেদিনই পাপড়ি হোস্টেলের ভিআইপি রুমে সিট পায়।ওর সাথে সব ধরনের র্যাগ দেয়া বন্ধ হয়ে যায়।

মাঝেমধ্যেই সবার থেকে আলাদা,ভালো ভালো খাবার পায়।ভার্সিটিতে দরিদ্রদের সহায়তা করার জন্য যে উপবৃত্তি নামক অনুদান চালু আছে,সেটা এসব ভিপি ভিআইপিদের পরিচিতরাই পায়।

সে-ই সুবাদে পাপড়ি ও এর তালিকা ভুক্ত হয়।

সবাই এখন পাপড়িকে সমীহ করে চলে।এমনকি সেই র্যাগ দেয়া মেয়ে গুলোও।

সোহান ফোন দিয়ে পাপড়ির সাথে কথা বলতে চাইলে, কোনো না কোনো অজুহাতে দুই এক মিনিট কথা বলেই রেখে দেয়।এভাবেই চলে যায় বছর খানেক।তারপরই রাতের সাথে দেখা।
রাতের প্রতি ওর অব্যক্ত অনুভূতি।না চাইতেই ছেলেটা মন প্রাণ,চিন্তা চেতনা সব জোর দখল করে রেখেছে।নিজেকে দমিয়ে রাখতে পাপড়ির সাংঘাতিক দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
ওর বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাতের প্রতি থাকা অনুভূতি মনের অন্তঃকোণ ধামাচাপা দিয়ে রাখে।কঠোর খোলসে আবৃত করে রাখে সকল আবেগ অনুভূতি,সকল চাওয়া পাওয়া।

সোহান পাপড়ির কাছে খুব ভালো সেজে থাকতে চায়।পাপড়ির মাঝেমধ্যে মনে হয় হয়তো সত্যি ওকে ভালোবাসে,কিন্তু পাপড়ির পক্ষে সোহানকে মেনে নেয়া কখনই সম্ভব না।যখনই এমন ভাবে উল্টো রাতের কথাই মনে পড়ে যায় ।

—————————

ফরেস্টিক ডিপার্টমেন্টের ঘটনার পর থেকে পাপড়ি সতর্ক থাকে।সোহানের চোখের চাহুনি,ভাষা কেন যেন ওর সুবিধাজনক মনে হয় না।তাই একাকি যায় না দেখা করতে।

সোহানের কল আসে।পাপড়ি ফোন তুলে হ্যালো বলতেই।"সোহান বলে কোথায় তুমি।"

"আসছি।"
"সাথে কেউ আছে?"

পাপড়ি খানিক চুপ থেকে বলে,"হ্যাঁ...রেশমি আছে।".

সোহান রাগান্বিত হয়।তবে সেটা পাপড়িকে বুঝতে না দিয়ে বলে,"এখন আসা লাগবে না,আমি একটু ব্যস্ত আছি।সন্ধ্যায় তোমার সাথে আমি দেখা করবো।টিউশন থেকে ফেরার সময় শহীদ মিনারের কাছে থেকো।"পাপড়িকে কিছু বলতে না দিয়ে ই ফোনের সংযোগ বিছিন্ন করে দেয়।

পাপড়ি তখন রেশমি কে নিয়ে হোস্টেলের পথ ধরে।

সন্ধ্যা ছয়টা।মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে দূর দুরান্ত থেকে।পাপড়ি শহীদ মিনারের কাছে আসতেই দেখে সিঁড়িতে রাত ও ওর বন্ধুরা বসে আছে।বুকের ভেতর ধক করে উঠে।দুজনেরই চোখাচোখি হয়।

মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা।

সেদিন পাপড়ি রাতকে জিজ্ঞেস করেছিলো," পাবি না জেনে ও এতো ভালো কেন বাসিস,রাত?"

কি অবলিলায় বলেছিলো" জানি না তো!
শুধু অনুভূত হয় তোমাকে ভালোবাসতে ভালোবাসি,তোমাকে ভালোবাসতে আমার ভিষণ রকম ভালো লাগে!নিজেকে যুদ্ধে জয় লাভ করা অক্ষত সৈনিক মনে হয়!"



চলবে....

আচ্ছা বলেন তো পাপড়ি কি কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে?


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।