হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে- পর্ব ১৪

হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ১৪
হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ১৪


গল্পঃ হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে
পর্বঃ ১৪
লেখিকাঃ গল্পকন্যা
প্রকাশকালঃ মে-২০২৩
ক্যাটাগরীঃ প্রেম কাহিনী, জুনিয়র সিনিয়র গল্প


রাত অসহায়ের মতো চেয়ে আছে।কলিজাটা ফালা ফালা হয়ে গেছে।"এ কি শর্ত জুড়ে দিলো ওকে"।

পাপড়ি কাঁদতে কাঁদতে চলে যায়।সেদিনও রাত পুরো এক প্যাকেট সিগারেট শেষ করে।

তারপর থেকে এতোদিন যাবৎ রাত পাপড়ির কথার বরখেলাফ করেনি।বেঁচে থাকতে করবেও না।যদি খুব বেশি দেখতে ইচ্ছে করে দূর থেকে অধীর হয়ে দেখে চলে আসে।

ক'দিন ধরে সোহান পাপড়িকে পাগল করে দিচ্ছে দেখা করার জন্য।পাপড়ি যাচ্ছে না।এতোদিনের মধ্যে যতবারই দেখা হয়েছে পাপড়ি সাথে কাউকে না কাউকে নিয়ে যেত।

কক্সবাজারের ঘটনার পর ভার্সিটিতে ফেরার পর সোহান পাপড়ির কাছে ক্ষমা চায়।অনেক আকুলি বিকুলি করে কেঁদে কেঁদে ক্ষমা চায়।পাপড়ির আর কিছুই করার থাকে না।পিছুটান রয়েছে যে।তাই বাধ্য হয়ে পূর্বের ন্যায় চলতে থাকে।

সারাদিনে যে কোনো একবার কথা বলে।কলেজে বন্ধু বান্ধবী সবার সামনে দেখা হয়,তখন শুধু একটু হাই হ্যালো। এই যা। সকলে এটাকেই প্রেম বলে ধরে নেয়।কিন্তু ভেতরের খবর কেউ জানে না।
আদ্যও কি এটা প্রেম বলা যায়।

___________________

পাপড়ি চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার বেশ কিছু দিন পর যেদিন প্রথম এ ভার্সিটি প্রাঙ্গনে পা রাখে,তখন ওর কাছে মাত্র কিছু জমানো টাকা ছিলো।ওর থাকার কোনো জায়গা ছিলো না।তাই থাকার জন্য একটা জায়গা খুবই দরকার ছিলো।আর সেটা দিনের আলো থাকতেই ব্যবস্থা করতে হবে ।কিন্তু এই অচেনা জায়গায় কোথায় কার কাছে যাবে,কিভাবে ব্যবস্থা করবে? ওর কাছে যে ক'টা টাকা আছে,তা দিয়ে বড়োজোর একমাস চলতে পারবে।কিন্তু তারপর কি করবে।সেসব চিন্তা করতে করতে দিশেহারা।একজন সহপাঠির কাছে থাকার জন্য জায়গার খোঁজ করতেই হোস্টেলের জন্য অফিসে যোগাযোগ করতে বলে।

পাপড়ি সেই মোতাবেক এসে হোস্টেলের সিটের জন্য যোগাযোগ করে।কিন্তু ওখানের একজন কর্মচারী বলে,এখন এপ্লাই করলে এক মাস পর সিট পাবে।

এ কথা শুনে পাপড়ি দু চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করেছে।তখন কর্মচারীটা বলে,"আপা আপনি ছাত্রলিগের সভাপতির সাথে কথা বলেন।তাদের হাতে সিট থাকে।পেলে ও পেতে পারেন।"

পাপড়ি যেতে চায় জানালে,একশ টাকার বিনিময়ে ঐ কর্মচারীটি পাপড়িকে নিয়ে যায় সেখানে ।

ছাত্রলিগের সভাপতি আমজাদ হোসাইন ও তার ভাই নব যুগলীগ সম্পাদক সোহান,আরো অনেকে এক সাথে আড্ডা দিচ্ছিলো।

পাপড়িকে দেখে প্রথম দেখায় সোহানের ভালো লেগে যায়।মনে সুপ্ত বাসনা চাড়া দিয়ে উঠে।

পাপড়ি সিটের কথা বলতেই সুযোগ সন্ধানি সোহান সুযোগ নেয়।আমজাদ হোসাইনের কানে কানে কিছু বলে।

তারপর আমজাদ হোসাইন বলে,"হ্যাঁ দেয়া যাবে না কেন।তোমাদের জন্য-ই তো কিছু সিট হাতে রেখি ।তবে একটা কন্ডিশন তো থেকেই যায় তাই না।"

পাপড়ি এতোগুলো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে এমনি ভয়ার্থ হয়ে আছে।তার উপর শর্তের কথা শুনে কিংকর্তব্য বিমূঢ় অবস্থা।

আমজাদ হোসাইন বলে,"আমার ভাই সোহান তোমাকে প্রথম দেখায় ভালোবেসে ফেলেছে।ওর সাথে প্রেম করতে রাজি হয়ে যাও,ভার্সিটির অন্যান্য সব ধরনের ফেসিলিটি পাবে।"

পাপড়ি আর এক সেকেন্ডের জন্য দাঁড়ায়নি।বেরিয়ে যায় সেখান থেকে।

শহীদ মিনারে বসে নিজের জীবনের পরিনতির কথা ভেবে কাঁদছিল।সেই মুহূর্তে ওর ব্যাচমেট একটা মেয়ে এসে পাপড়ির পাশে বসে।মেয়েটির নাম ছাবা।ছাবা পাপড়ির কান্নার কারণ জানতে চায়।পাপড়ি ভেজা কন্ঠে কিছুটা বলে,কিছুটা চেপে যায়।

পাপড়ি যখন বলে, সে যেখানে থাকতো সেখান থেকে ওকে বের করে দিয়েছে।হোস্টেলে সিটের জন্য এপ্লাই করলেও,পেতে এক মাস সময় লাগবে।ওর কোনো যাওয়ার জায়গা নেই, সন্ধ্যা নেমে আসছে,এখন কোথায় যাবে?

ছাবার ভিষণ মায়া হয়।ছাবা বলে,"তুমি এক মাস আমার সাথে থাকতে পারো।এটাকে কোনো সহানুভূতি মনে করো না।মনে করো আমি তোমার ফ্রেন্ড।ফ্রেন্ড হিসেবে ফ্রেন্ডের বাসায় থাকবে।তোমার ফ্রেন্ড তোমাকে সাহায্য করছে।না করো না প্লিজ।"

পাপড়ি কি করবে ভেবে পায় না।এ ছাড়া কোনো উপায় ও নেই।উপরন্তু পাপড়ি ছাবার সাথে যেতে রাজি হয়।মেয়েটির প্রতি ভিষণ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

পাপড়িকে বাড়ি নিয়ে যাওয়াতে ছাবার বাসার লোকজন অনেক কথা শোনায়।কেবল ছাবার বাবা ছাড়া।এক মাত্র ছাবার বাবা সবাইকে বলে যে ছাবার কাজে তিনি ভিষণ খুশি। একটা অসহায় মেয়েকে সাহায্য করে ছাবা খুব ভালো কাজ করেছে।

তারপর থেকে শুরু হয় আরো এক দুর্বিষহ জীবন।ছাবার মা বাড়ির ছুটা কাজের লোক ছাড়িয়ে দেন।

পাপড়িকে ডেকে বলে,"শোনো মেয়ে।আমাদের কাজের মহিলাটা কিছুদিন আসতে পারবে না।ওর শরীরটা ভালো না।ছাবা তো কোনো কাজ করতে পারে না। তুমি আমাকে একটু সাহায্য করো।"পাপড়িও তেমন কোনো কাজ জানে না।কিন্তু এ বাসায় থাকবে যেহেতু ,বাসার একজন সদস্যের মতোই তো থাকতে হবে।কিছু মনে না করে কাজ করে বাসার সমস্ত কাজেই হাত লাগানোর চেষ্টা করতে থাকে।

এদিকে ছাবার মা ও এটা ওটা প্রতিদিন করতেই বলে।এক দুই দিন বাদে সেই কাজ গিয়ে ঠেকে ঘর মোছা কাপড় ধোঁয়া।ছাবা কিছু বলতে চাইলে, ওকে ধমকে চুপ করিয়ে দেয়।

বলে,"কাজ না করলে থাকবে কিভাবে।এই বাড়তি দ্রব্যমূল্যর বাজারে,কাজ না করলে খাবে কি।রহিমা(কাজের লোক) কে তো তিন হাজার টাকা দেয়াই লাগে।ও যদি কাজ করে তাহলে আমাদেরকে আর ওর থাকা খাওয়ার জন্য টাকা দেয়া লাগবে না।"

ছাবা খেপে যায়।কিছু বলতে মুখ খুললেই ওর মা গালে চড় বসিয়ে দেয়।তাই আর কিছু বলতে পারে না।

পাপড়ি বাথরুমে কাপড় ধুচ্ছিলো।ওর কানেও কথা গুলো পৌঁছায়।ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ভেবে মেনে নেয়।ছাবার মায়ের আদেশ অনুযায়ী করতে থাকে সকল কাজ।

এখানেই ওর দুর অবস্থার ক্ষান্ত হয়নি।

ছাবাদের বাসা ক্যাম্পাসের কাছে হওয়ায় পাপড়ি হেঁটেই চলে যেতো।তবে টাইমলি যেতে পারতো না।সকালে ঘুম থেকে উঠে বাসার কাজ শেষ করে যেতে যেতে অনেক দেরি হয়ে যেতো।প্রথম ক্লাস ততক্ষণে শুরু হয়ে যেতো।ক্লাসে ঢুকতে নিলে স্যারের কথা শুনতে হতো।

তাই নাস্তা না করেই চলে যেতে হতো,নাস্তা না করলে নাস্তার দশ পনেরো মিনিট সময় বাঁচাতে পারতো।আর ক্লাস মিস হতো না।

দুপুরেও ওর খাওয়া হতো না।কারণ দুটো স্টুডেন্ট পড়ানোর ব্যবস্থা হয়েছে।ওদের পড়িয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে যায়।

একেবারে রাতের খাবার খেতো, খেতে বসলেও শুনতে হতো কোনটার দাম কেমন বেড়েছে সে সব কথা।এসব শুনে পাপড়ির গলা দিয়ে আর খাবার নামতো না।

প্রতিদিনকার নেয় সেদিনও নাস্তা না করে বেরিয়ে পড়ে।ডিপার্টমেন্টের সামনে আসতেই সেকেন্ড ইয়ারের সিনিয়ররা পাপড়িকে দাড় কড়ায়।

পাপড়ি বাধ্য মেয়ের মতো দাঁড়ায়।"জি আপু!"

পাঁচ ছয় জন থেকে একজন বলে,"নাম কি?"

"রোদেলা জাহান পাপড়ি।"

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আরেক জন বলে,"কোন ইয়ার?"

"ফার্স্ট ইয়ার।"

আরেক জন বলে,
"ডিপার্টমেন্ট? "
"যোগাযোগ ও সাংবাদিক বিভাগ।"
"বাসা কই?"
"এতিমখানায়।"
"এটা আবার কি বলে রে..."
একে অপরের দিকে চেয়ে আছে।

পাপড়ি চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই বলে,"দাঁড়া!"
পাপড়ি দাঁড়ায়,"জি বলেন।"

"সিনিয়রদের সালাম দিতে হয় জানিস না।"
"সরি আপু খেয়াল করিনি, আসসালামু ওয়ালাইকুম।"
একজন বলে,"তোর মায়ের পেটের বোন ও...,মেম বল।"
"জি মেম।"

"এভাবে না,পুরোটা বল।"
"আসসালামু ওয়ালাইকুম মেম।আসি আমার ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।পরে স্যার ঢুকতে দেবে না।"বলেই পা বাড়াতে নিলে খপ করে ওর ওড়না টেনে ধরে।

পাপড়ি স্তম্ভিত হয়ে চায়।
"কি অসামাজিক ব্যবহার।ছিহহহ!"
"প্লিজ মেম যেতে দিন দেরি হচ্ছে।"
"আচ্ছা দিবো।তার আগে বল তোর বডি সাইজ কতো।"

পাপড়ির নাক মুখ কুঁচকে যায়,"ছিহ আপনারা কি মেয়ে জাতি!এভাবে একটা মেয়েকে হেরেসমেন্ট করছেন!র্যাগিং এর নামে এতো নিচে নামতে পারেন আপনারা!"

"এই...!এই...! তোর মুখ তো অনেক চলে দেখি হ্যাঁ! অনেক ধাড় জিহ্বে না!আমাদের সাথে পাড় পাবি?এ্যাই...জানিস কে আমি?ভিপি নূরের জিএফ।এমন লালকালির দাগ দেবো না।টিসি নেয়ার অপশন ও থাকবে না।ডিরেক্ট রাষ্টিগেশন হবি বোর্ড থেকে।কেরিয়ার একেবারে স্পয়েল...,হুঁ......."


চলবে......




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।