হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ০২

হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ০২
হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে-পর্ব ০২


গল্পঃ হৃদয়ের নিকুঞ্জ নীড়ে
পর্বঃ ০২
লেখিকাঃ গল্পকন্যা
প্রকাশকালঃ মে-২০২৩
ক্যাটাগরীঃ প্রেম কাহিনী, জুনিয়র সিনিয়র গল্প


২.
সেদিনের পর সপ্তাহের বাকি দিন গুলোও ঠিক সেই সময়ে ঝর্ণার কাছে গিয়ে বসেছিলো ইফরাত।ছড়া থেকে ঝর্ণার সেই মুখিতে পা ডুবিয়ে বসেছিলো।সেখানে বসার পর অনুধাবন করলো বহমান জলধারা ওর নগ্ন পায়ের তালুতে একরকম শুড়শুড়ির সৃষ্টি করছে।এই জন্যই কি সেদিন মেয়েটা হেসে উঠেছিলো।সেই ঝংকার তোলা হাসির কথা মনে হয়ে ঠোঁটের কোণে স্মিত হাসি ফুটে ওঠে।


আনমনে বলে উঠে,"সুহাসিনী....,জাদু টোনা জানো নিশ্চিয়ই..!"

এ কয়েকদিনের মধ্যে পুরোনো কিছু পরিচিতের খাতিরে,ক্যাম্পাসের বেশ কিছু সিনিয়র বড় ভাইদের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠেছে।সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে কিছু সিনিয়র জুনিয়র আপুদের সাথে ও।সেই সুবাদে বড়ভাইদের র্যাগ ডে তে যাওয়ার নিমন্ত্রণ পেয়ে গেছে ইফরাত আর জাহিদ।

সকাল বেলা তাড়াতাড়ি বের হয়ে যায় ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে।যথাসময়ে তাদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয় ওরা দুজনে।

ক্যাম্পাসের সামাজিক বিজ্ঞান ফ্যাকাল্টির স্টুডেন্টদের র্যাগ ডে হওয়ায় সেখানেই সবাই আনন্দে মেতে উঠেছে।একে অন্যের গায়ের ধবধবে সাদা টিশার্টে লিখে দিচ্ছে যারযার ইচ্ছে অনুযায়ী কিছু না কিছু।কেউ কেউ সেলফি তোলায় ব্যস্ত।কেউ করছে ভিডিও।কেউ আবার শুরু করেছে রঙ মাখামাখি।একেকজন রঙ মেখে সঙ সেজে গেছে।কাউকে চেনার উপায় নেই।

এরি মধ্যে কয়েকজন সিনিয়র আপুর নজর পরে ইফরাতের উপরে।তারা সবাই মিলে দুষ্টুমি করে ইফরাতকে চেপে ধরে লাল, নীল, সবুজ রঙ মেখে একেবারে সঙ বানিয়ে দিয়েছে।

বড়ো আপুদের চাপাচাপিতে ইফরাতের নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার অবস্থা।ছাড়া পেয়ে বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে।তা দেখে সকলে জোরে জোরে হেসে উঠে।

হঠাৎ পাশ থেকে জিন্স টপস পরিহিত একটা মেয়ে বলে উঠে,"কি হচ্ছে এখানে?"সবাই মেয়েটাকে দেখেই ওদের মধ্যে সামিল করে নেয়।মেয়েটি আসার পর সব মেয়েরা সেই মেয়েটিকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

এদিকে ইফরাত নিজের অবস্থান ভুলে কেবল মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছে।বিগত কয়েকদিন ধরে যাকে খুঁজে দিশেহারা হয়ে গেছে, সে আজ যেচে তার সামনে ।

যার নিমন্ত্রণে এখানে আসা সেই বড় ভাই রিয়াদ হঠাৎ পিঠ চাপরে বলে,"রাত চল খাবো,ক্ষুদা পেয়েছে...!"

রাত বলে,

" ভাইয়া একটা কথা জিজ্ঞেস করবো,নেগেটিভলি নিবা না প্লিজ!"
"নেগেটিভ বলবি আর নেগেটিভ নিবো না বেটা!এতো ভনিতা না করে বলতো কি বলবি?"
"ভাইয়া তোমার সাথের সবাইকেই তো চিনলাম কিন্তু এই মেয়েটা কে?"
"আচ্ছা ও...!ও তো পাপড়ি!এই ডিপার্টমেন্টের ই তৃতীয় বর্ষের স্টুডেন্ট।এতে মনে করার কি আছে।চল! চল তো...!"

ইফরাতের মাথা ঘুরে গেছে এটা শুনে যে মেয়েটি ওর চেয়ে টু ব্যাচ সিনিয়র ,"মাই গড!সিনিয়র আপুর উপর ক্রাশ....!"

ভাবার জন্য আর কিঞ্চিৎ মূহুর্তও পেলো না।টেনে নিয়ে গেলো খাবার খেতে।বিকেল থেকে শুরু হয়েছে আবার সংস্কৃতি অনুষ্ঠান।একের পর এক ছাত্র ছাত্রীরা তাদের নাচ,গান,অভিনয়,বক্তৃতা উপস্থাপন করে যাচ্ছে।চারিদিক মুখরিত আনন্দ উল্লাসে।

কিন্তু ইফরাতের মনটা কেমন দোটানায় ভুগছে।ভেতরের সত্তা গুলো আজ লড়াই করছে।এ লড়াই বিবেকের সাথে মনের লড়াই।

বিবেক বলছে পরিবার,সমাজ,বন্ধু মহলের কথা।কিন্তু মন সে সব মানতে নারাজ।মুগ্ধতা কি কারো প্রতি বলে কয়ে হয়? কারো প্রতি তো ইচ্ছে করে আকষর্ণও অনুভব করা যায় না।সেটা অজান্তেই হয়ে যায়।এই মুগ্ধতা ও আকষর্ণ থেকে গড়ে উঠে ভালাবাসার কাঠামো।যতোদিন যায় ততোই মজবুত হতে থাকে এর পরিনতি।হঠাৎ চিন্তা ভঙ্গ হয় মঞ্চে উঠা পাপড়ি নামক মেয়েটিকে দেখে।

মেয়েটি তার মিষ্টি কন্ঠে গেয়ে উঠে,
"আমার একলা আকাশ থমকে গেছে
রাতের স্রোতে ভেসে
শুধু তোমায় ভালোবেসে,
আমার দিনগুলো সব রং চিনেছে
তোমার কাছে এসে
শুধু তোমায় ভালোবেসে।"


অদ্ভুত ভাবে তার গানের গলা ও তার মতোই মনোমুগ্ধকর।গান গাওয়ার মাঝখানে মাঝখানে হঠাৎ করেই সে হেসে উঠে।রাত কেবল মুগ্ধ হয়ে চেয়েই থাকে।

রাতের চোখের তারায় চিলিক দিয়ে উঠে সেই হাসি।ভেবে পায় না,নিজের মনের অনুভূতির জন্য মেয়েটির গান এতো সুন্দর লাগছে?নাকি সত্যিই গানের গলা এতো সুন্দর?

পাশে বসে থাকা জাহিদকে বলে,"দোস্ত তোর কাছে গানটি কেমন লাগছে?"

অবাক হয়ে বলে,"কেমন লাগছে মানে?জাস্ট ফাটাফাটি মামা!আউটস্ট্যান্ডিং যাকে বলে।আপুটাকে দেখে কিন্তু বোঝা যায় না এতো সুন্দর গান গাইতে পারে!"

রাত চুপ করে থাকে।মেয়েটির প্রতি জেগে উঠা মুগ্ধতা চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে চলেছে। কখন জানি সেটা গিয়ে কোন পর্যায়ে ঠেকে।মনের মধ্যে পাঁচ নম্বর বিপদ সংকেত চলছে।

সেদিন বাড়ি ফিরে কিছুই ভালো লাগছিলো না।সারারাত ছটফট ছটফট করে কাটিয়েছে।কেবল মনে হচ্ছে ওর বড্ড তৃষ্ণা পেয়েছে।পানিতে সে তৃষ্ণা মেটার নয়।সে তৃষ্ণা কেবল কাছ থেকে কাউকে দেখার তৃষ্ণা।

রাত ভাবতে থাকে," আচ্ছা, আমি যে মুগ্ধ হলাম,এটা আসলেই মুগ্ধতা, নাকি প্রেম?"আবার ভাবে,"প্রেম কিভাবে হবে!এই কিছু দিনে কি প্রেমে পড়া যায় নাকি?মাথা থেকে এসব চিন্তা বাদ দিতে হবে,নয়তো পড়াশোনা ধূলিসাৎ হবে,আর কর্ণেল সাহেব ধরে ঠ্যাঙাবে।"
মনকে ধাতস্থ করে লম্বা হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে।

কিন্তু পর দিন ক্যাম্পাসে এসেই অবাধ্য মন ওকে টেনে নিয়ে চলেছে সামাজিক বিজ্ঞান ফ্যাকাল্টিতে।আর মনের ইচ্ছেতে সেখানে চলেও এসেছে।এক তলা দোতলা করে সব কয়টা ফ্লোরের সব কয়টা ক্লাস রুম চেক করছে।কি চেক করছে নিজেও জানে না,শুধু মনে হচ্ছে পিপাসা মেটানো প্রয়োজন।কিন্তু এতো চেষ্টার পর ফলাফল শূন্য।পুরো ডিপার্টমেন্টের কোথাও সে নেই।ভগ্ন হৃদয়ে ফিরে আসার সময় সিড়িতে দেখা হয় সেই কাঙ্ক্ষিত রমনীর সাথে।ব্লু জিন্স,ব্ল্যাক টপস আর গলায় পিংক ও ব্ল্যাকের কম্বিনেশনের একটি স্কার্ফ ঝুলানো।

মেয়েটি তার গন্তব্যে যাওয়ার জন্য এতোই তাড়াতে যে পাশে একটা ছেলের বিমোহিত হয়ে তাকানোটা চোখেই পড়েনি।
পাপড়ি রাত কে এড়িয়ে সেকেন্ড ফ্লোরে উঠে যায়।রাত ও পিছু নেয় মেয়েটির গন্তব্য চেনার জন্য।

সিড়ির সাথে লাগোয়া দুটো কক্ষের পরের কক্ষে পাপড়ি প্রবেশ করে।রাতের উদ্দেশ্য সফল হয়,মনটা শান্ত হয়।তারপর নিজের ক্লাসের কথা মনে আসতেই ভো দৌড় লাগায়।

ওর হাতে সময় আছে পনেরো মিনিট।কিন্তু সামাজিক বিজ্ঞান ফ্যাকাল্টি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টিতে হেঁটে যেতে সময় লাগে পুরো পনেরো মিনিট।রাস্তার এপাশ ওপাশ কোথাও কোনো রিক্সা সিএনজির দেখা নেই।কি করবে ভেবে না পেয়ে ভো দৌড় শুরু করে।

প্রতিদিন এক সেকেন্ডের জন্য হলেও পাপড়িকে রাতের দেখা চাই।এর ভিন্নতা হলে হার্টের পেশেন্টের মতো কেমন অস্থির অস্থির লাগে।কলেজের অফ ডে টা খুবই বিরক্তিকর মনে হয় ওর কাছে।আসলে ওর ভালো লাগা আর মুগ্ধতা থেকে ধীরে ধীরে জন্মাচ্ছে গভীর ভালোবাসা।

এভাবেই পেরিয়ে যাচ্ছে সময়।দেখতে দেখতে ফার্স্ট সেমিস্টার এক্সাম শেষ হয়ে গেছে।এ কদিনে সকলকে এড়িয়ে পাপড়িকে দেখাটা ওর একটা অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভার্সিটি কিছুদিনের জন্য ছুটি দিয়েছে।বিষন্ন মনে সামাজিক বিজ্ঞান ফ্যাকাল্টিতে যাওয়ার পথ ধরে।কিন্তু সেখানে আর যাওয়া হয় উঠে না।

পথিমধ্যে দেখা হয়ে যায় কাঙ্ক্ষিত রমণীর সাথে।একজন ছেলের সাথে কোনো বিষয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছে।
অপরিচিতের মতো একপাশে দাঁড়িয়ে থাকে রাত।বোঝার চেষ্টা করে সমস্যার জড় কোথায়।হঠাৎ পাশে এসে দাঁড়ায় জাহিদ সুমন।ওদের আকস্মিক আগমনে রাত চমকে যায়।কিন্তু ওদের বুঝতে না দিয়ে বলে,

"বোরিং লাগছে...!"

দুজনেই বলে," চল তাহলে ঘুরে আসি...!"

"সেটাও মন চাচ্ছে না।"

হঠাৎ ওদের নজরে পড়ে পাশে তর্কে লিপ্ত থাকা দুইজন ছেলে মেয়ের উপর।জাহিদ এগিয়ে গিয়ে ছেলেটিকে সালাম দেয়,"আসসালামু ওয়ালাইকুম ভাই।"

"ওয়ালাইকুমুসসালাম।"
"কেমন আছেন ভাই? "
"ভালো,পরে কথা বলছি একটু বিজি আছি।"
"ঠিক আছে ভাই কোনো প্রবলেম নাই,আপনি কথা বলেন।"

তার পর পরই জাহিদ দুজনকে টেনে নিয়ে সেখান থেকে এগিয়ে চলে শহিদ মিনারের দিকে।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাতকে যেতে হয়।কিছুটা আশ্চর্য্য হয়েছে সেই ছেলেটির এমন এটিটিউট নিয়ে কথা বলাতে।কখনো ভার্সিটির কোনো বড় ভাইকে এমন ভাব নিয়ে কথা বলতে দেখেনি।

রাত জিজ্ঞেস করে,"কে ছেলেটা?চিনিস?এখানে মেয়েটার সাথে কি করছিলো?"

এক সাথে এতো প্রশ্ন করাতে জাহিদ বলে,"আরে শালা দম ফেল...!"

রাত ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।জাহিদ বলে,"ছেলেটা সামাজিক বিজ্ঞান ফ্যাকাল্টির পলিটিকাল সায়েন্সের ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট।আর সবচেয়ে বড় কথা হলো,ভার্সিটির ছাত্র লিগের সভাপতির ছোটো ভাই এবং নিজেও ছাত্র লিগের সম্পাদক।ধারণা করা যায় পরবর্তীতে এই সোহান ভাই ই হবে ছাত্র লিগের সভাপতি।ওনার সাথে মিল দিয়ে থাকলে ভার্সিটিতে অনেক সুবিধা পাওয়া সম্ভব।আর কিছু দিন পরই আমাদের হোস্টেলে সিট লাগবে,তখনই সোহান ভাইয়ের হেল্প লাগবে।সে জন্যই তো এমন সমিহ করে চলা।তোরাও এমনি চলবি।লাভ ছাড়া লস হবে না।বুঝেছিস!"

ভাবুক হয়ে রাত বলে,"সেটা বুঝলাম,কিন্তু মেয়েটা....?"

হাসতে হাসতে বলে,"আরে মেয়েটা হচ্ছে সোহান ভাইয়ের জিএফ।কলেজের সেরা সুন্দরীদের একজন পাপড়ি আপু।এমন সুন্দরী মেয়েরা সব ভার্সিটির ভিপি,ভিআইপিদের জি এফ ই হয় মামা!"

সুমন বলে,"হাহ...!আরে এদের যে প্রেম,রুমডেট পর্যন্ত যেতে পারলেই মেয়ে পরিবর্তন করে।মাঝে দিয়ে সুন্দরী ললনারা শেষ হয়ে যায়।"

দুজনের কথা গুলো বিষাক্ত বিষক্রিয়ার মতো পৌঁছাচ্ছে রাতের কর্ণকুহরে।ভিতরে অদ্ভুত ভাবে সেই বিষের জ্বালা হচ্ছে।সেগুলোকে আমলে না নিয়ে হাঁটা ধরে ঝুপড়ির উদ্দেশ্যে।দোকানীর থেকে এক প্যাকেট বেনসন কিনে ছুটে চলে ঝুলন্ত সেতুতে।সাথে ওরা কেউ আছে কিনা সে খেয়াল নেই।

সেতুর মধ্যিখানে পৌঁছে কাঁধের ব্যাগটা রেখে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে ।তারপর সিগারেট ধরিয়ে তাতে একটা টান দেয়।নিমেষেই ধলা পাকানো সমস্ত যন্ত্রণা হালকা হয়ে যায়।একেপর এক টানে ১ম সিগারেটটি শেষ করে,অতঃপর ২য় টি,তারপর ৩য় টি।এমনি করে পুরো এক প্যাকেট।

জাহিদ ও সুমন হতোবাক হয়ে আছে রাতের এমন অদ্ভুত কর্মকান্ডে।কখনো ওকে এভাবে এতো সিগারেট টানতে দেখেনি।ওদের সাথে থাকলেও সারাদিনে একটার বেশি সিগারেট খায় না।কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় সেই ছেলে কিনা এক প্যাকেট...!

পুরো প্যাকেট খালি করে খালি প্যাকেটটা সেতু থেকে নিচের ঝির্ণশির্ন খাদে ফেলে দেয়।

এই মুহূর্তে নিজেকে একজন চেইন স্মোকার মনে হচ্ছে।




চলবে.......


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।