হীরক রহস্য অনুচ্ছেদ ০১ ও ০২

হীরক রহস্য - শার্লক হোমস সমগ্র
হীরক রহস্য - শার্লক হোমস সমগ্র



দি কেস বুক অব শার্লক হোমস
হীরক রহস্য
মূলঃ স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
অনুবাদ-সম্পাদনা-ভূমিকা
মিলন রায়

ভূমিকা

গোয়েন্দা শব্দটা শুনলেই যাঁর নামটা চট করে মনে আসে তিনি বিশ্ববিখ্যাত শার্লক হোমস। পৃথিবীর কোটি কোটি পাঠকের হৃদয় জয় করে তিনি আজো হয়ে আছেন এক জীবন্ত কিংবদন্তী। ১৮৫৪ সালের জানুয়ারির ৬ তারিখ। শুক্রবার দিন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লেফটেন্যান্ট সাইগার হোমস আর ভায়োলেট শেরিন ফোর্ডের ঘর আলো করে জন্ম হলো শার্লকের। তখন ছিল বিকেলবেলা। প্রাচীন অ্যাংলো-স্যাক্সন শার্লক শব্দের অর্থ হচ্ছে চকচকে চুল। মাথা বোঝাই ঘন কালো সুন্দর চুল দেখে মা শিশুর নাম রাখলেন শার্লক। পুরো নাম উইলিয়াম শার্লক স্কট হোমস। বড় হয়ে তিনি নিজের এতো বড়ো নামটাকে ছোট্ট করে বানালেন শার্লক হোমস। আর এই ছোট্ট সুন্দর নামেই তিনি হলেন জগদ্বিখ্যাত সত্যানুসন্ধানী, গোয়েন্দাদের পথিকৃৎ।

শার্লক হোমস কিন্তু রহস্যের পিছনে ঘুরে ঘুরে সময় নষ্ট করতেন না। তিনি ঘর থেকে বেরই হতেন না বললে চলে। তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, বিশ্লেষণী শক্তি, উপস্থিত বুদ্ধি, চাতুরি এবং অনন্য সাধারণ অভিনয় ক্ষমতার দ্বারা ঘরে বসেই সব রহস্যের জট খুলে দিতেন। কোথাও কোনো রহস্য দানা বাধলে সবাই ছুটে আসতেন শার্লকের কাছে। ঘটনার বিবরণ শুনেই তিনি বলে দিতে পারতেন রহস্যের ভিতরের রহস্য কোথায়। এটাই ছিল তাঁর পেশা। কারণ তিনি ছিলেন পৃথিবীর একমাত্র কনসালটিং ডিটেকটিভ। পরামর্শদাতা গোয়েন্দা।

বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে কেন শার্লক এই অদ্ভুত পেশায় আসলেন সেই রহস্য উদ্ঘাটনের অনেক চেষ্টা করেছেন তাঁর যোগ্য সহকারী ও বন্ধু লেখক ডা. ওয়াটসন। পুরো নাম ডা. জন এস ওয়াটসন। ডা. ওয়াটসন শুধু শার্লকের বন্ধু বা সহকারীই ছিলেন না, ২২১ বি বেকার স্ট্রিটের বাসার সহবাসীও ছিলেন তিনি। এই বেকার স্ট্রিটের বাড়িতে বসেই একদিন নিজের পেশা সম্পর্কে বন্ধুকে শুনিয়েছিলেন শার্লক হোমস।

ছেলেবেলা থেকেই দুই দাদার সঙ্গে থেকে শার্লক চোখের যথাসাধ্য ব্যবহার করতে শিখেছিলেন। তিনি তখন থেকেই জেনে গিয়েছিলেন, যা চোখে দেখা যায় তা-ই সব নয়। তার খুঁটিনাটি বৈশিষ্ট্য থেকে অনেক গোপন তথ্য বের করে নেয়া যায়। এসব কারণেই অত্যাশ্চর্য পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং বিশ্লেষণী প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল তাঁর মধ্যে। অঙ্কের মতো শুধু যুক্তির ধাপ বেয়ে তুচ্ছ ঘটনা থেকে মোক্ষম সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর অসাধারণ ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন তিনি।

অক্সফোর্ডে যখন শার্লক আন্ডার গ্রাজুয়েটের ছাত্র, তখন তাঁর বয়স ১৮। তাঁর তালঢ্যাঙা চেহারা তেমন সুন্দর না হলেও তাঁর দিকে চোখ না ফিরিয়ে থাকা যেত না। একটা আকর্ষণীয় ক্ষমতা ছিল তাঁর। কিন্তু তিনি ছিলেন বন্ধুবিহীন। তবে দ্বিতীয় বছরেই তাঁর একজন বন্ধু জুটে গেল। বন্ধুটির নাম ভিক্টর ট্রেভর ভিক্টরও ছিলেন শার্লকের মতো নিঃসঙ্গ।

একদিন ভিক্টরের সঙ্গেই তাঁদের বাড়িতে গেলেন শার্লক। সেটা হলো ১৮৭৪ সালের ১২ জুলাই রবিবার। ভিক্টর তাঁর বাবার সঙ্গে যখন শার্লকের পরিচয় করিয়ে দিলেন, তখন বন্ধুর মানুষের অল্প কিছু জিনিস দেখে সব বলে দেবার বিস্ময়কর গুণের কথাটি বলতেও ভুললেন না।

বৃদ্ধ ট্রেভর মনোযোগ দিয়েই সব শুনলেন। কিন্তু সব বিশ্বাস করতে পারলেন না। শার্লককে পরীক্ষা

করে দেখার জন্যে বললেন : বলুন দেখি, আমাকে দেখে আপনার কি মনে হয়? শার্লক তাঁর উত্তরে যা বললেন, তাতে বৃদ্ধ ট্রেভরের মুখের মৃদু হাসি মিলিয়ে গেল। ভীষণ অবাক হলেন তিনি। তারপর আরো কথাবার্তা তাঁদের হলো। আর ওই দিনের ওই ঘটনার পরই শার্লকের জীবনের মোড় ঘুরে গেল। যা এতদিন তাঁর কাছে ছিল নিছক শখ— তা পরবর্তী জীবনে পেশা ও নেশা হয়ে একাকার হয়ে গেল ।

বৃদ্ধ ট্রেভরের জীবনের গোপন এক অধ্যায়ের রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়েই শার্লক হোমস পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা হওয়ার পথে অগ্রসর হলেন। ইঞ্জিনিয়ার আর তাঁর হওয়া হলো না। বাবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও হয়ে গেলেন বিশ্ববিখ্যাত সত্যানুসন্ধানী ।

উপরের কথাগুলো পড়ে মনে হবে যেন সত্যিকার কোনো মানুষের জীবন কথা লেখা হয়েছে। অথচ বিস্ময়কর ঘটনা হলো শার্লক হোমস বলে জীবিত কোনো মানুষ কোনো কালেই ছিলেন না। নিছক কল্পনায় সৃষ্ট এক অসাধারণ চরিত্র। কিন্তু স্রষ্টার সৃষ্টি নৈপুণ্যে সৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্রের বিপুল জনপ্রিয়তার আড়ালে চাপা পড়ে গেছেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা। স্যার আর্থার কোনান ডয়েল। সাহিত্যকে ছাপিয়ে চরিত্র পাঠকের কাছে হয়ে উঠল জীবন্ত। বাস্তবিকই স্রষ্টা আর সৃষ্টি যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় সেখানে অসাধারণত্ব তো ঘটবেই।

ডা. জোশেফ বেল একবার একটি চিঠিতে ডয়েলকে লিখেছিলেন— "You are yourself shearlok Homes!" আসলেই ডয়েল এবং হোমস, উভয়ের চরিত্রে, জীবনযাপনে এমন মিল যে, তাঁদের মনে হয় একই চরিত্রের দুই জমজ ছায়া। শুধু আকৃতগত অমিলটুকু ছাড়া তাঁরা উভয়েই ছিলেন অভিন্ন ব্যক্তিসত্তা।

ডয়েল ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি হতে পারতেন অনেক কিছুই। কিন্তু সাহিত্যপ্রীতি এবং
নিয়োজিত রেখেছে আমৃত্যু।

প্লাইমাউথের সাউথসীর ১নং বুশ ভিলার বাড়ি ভাড়া নিয়ে ডাক্তারি শুরু করেন। সেই সঙ্গে গল্প লেখাও ।

শিল্পপ্রবণতা তাঁকে প্রথমে ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলী রচনায় এবং পরে শার্লক হোমসের বিচিত্র কীর্তিকলাপে ডয়েল ডাক্তারি পাশ করেছিলেন। সেটা হলো ১৮৮১ সাল। পড়াকালীনই তিনি জাহাজে কাজ নিয়ে আর্কটিক যাতায়াতের সুযোগ পান। পাস করে চলে যান আফ্রিকায়। তিনমাস পরে ফিরে এসে

A Tangled Skein উপন্যাসে প্রথমে শার্লক হোমসের জন্ম হয় ১৮৮৭ সালে। তখন শার্লকের বয়স লেখা হয় তেত্রিশ বছর। শার্লকের প্রথম নামকরণ করেন শেরিন ফোর্ড হোমস। পছন্দ না হওয়ায় রাখলেন শার্লক হোমস। একই সাথে উপন্যাসের নামও পরিবর্তন করে দিলেন A study in Skerlet. আর পিছনে তাকাতে হয় নি ডয়েলকে। ডাক্তারি পেশা ছেড়ে পুরোপুরি লেখায় আত্মনিয়োগ করেন তিনি।

শার্লক হোমসকে নিয়ে সবসুদ্ধ চারটি রহস্য উপন্যাস ও ছাপ্পান্নটি ছোট গল্প লেখেন ডয়েল । প্রতিটি লেখার মধ্যে হোমস চরিত্রটি এমন নিপুণভাবে তিনি এঁকেছেন সে পাঠকরা কোনোদিন বিশ্বাসই করেন নি শার্লক হোমস কল্পিত একজন মানুষ। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, লেখকের জীবিত অবস্থায়ই হোমসের নামে অনেক চিঠি আসত। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, এখনো শার্লক হোমসের আবির্ভাবের একশ বছর পরেও পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে ২২১ বি বেকার স্ট্রিট, লন্ডন ডব্লু-১, এই ঠিকানায় সপ্তাহে অন্তত চল্লিশখানা চিঠি আসে। আর এক ভদ্রমহিলা সেসব চিঠির জবাবও দেন।

স্রষ্টার চেয়ে সৃষ্টির জনপ্রিয়তা এত বেশি বলেই স্যার আর্থার কোনান ডয়েলকে সবাই ভুলে যেতে বসেছেন। কিন্তু তাঁর অমর সৃষ্টি শার্লক হোমস গত একশ বছরেও এতটুকু জনপ্রিয়তা হারায় নি। এখানেই স্রষ্টার চরম সার্থকতা।

শার্লক হোমসের আদলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনেক লেখক নতুন নতুন গোয়েন্দার সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু শার্লকের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, বিচার বিশ্লেষণী ক্ষমতার ধারে কাছেও কেউ ঘেঁষতে পারেন নি। আর সে জন্যেই বিশ্বের সব দেশে সব ভাষায় সমান জনপ্রিয় গোয়েন্দা শার্লক হোমস আর তাঁর অসাধারণ স্রষ্টা স্যার আর্থার কোনান ডয়েল। বিশ্ব সাহিত্যের এই বিরল প্রতিভা, শার্লকের অমর স্রষ্টা ১৯৩০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, পাঠকরা মনে করতেন শার্লক হোমস এক জীবন্ত ব্যক্তি আর সেই ব্যক্তি সব রহস্যের সমাধান করতে পারেন ।

শার্লক হোমসের গোয়েন্দা পুলিশ কাহিনীগুলো এতই তাত্ত্বিক, সূক্ষ্ম বিশ্লেষণধর্মী ও যুক্তি-বিজ্ঞান নির্ভর ছিল যে চীনদেশের সরকারি বিভাগের পাঠ্য বইয়ের তালিকায় অত্যাবশ্যকীয় বিষয় হিসেবে পড়ানো হয়। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের পুলিশ এবং ফ্রান্সের পুলিশ বিভাগেও শার্লক হোমসের গোয়েন্দা কাহিনীগুলো পড়তে হয়।

স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের অমর কীর্তি শার্লক হোমসের সমগ্র কাহিনীগুলো বাংলা ভাষায় অনুবাদ ও সম্পাদনা করতে পেরে সত্যিকার অর্থেই আমি গর্বিত। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি সরল, সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় বইখানির অনুবাদ করতে। আশা করি সবশ্রেণীর পাঠকদের কাছেই বইটি সমাদৃত হবে।

-মিলন রায়

হীরক রহস্য
শার্লক হোমস



কটা মামলার মধ্যে আটকে রয়েছেন শার্লক হোমস। তাঁর শরীরের যা অবস্থা ভালো নয় দিনের পর দিন। রোগা হয়ে যাচ্ছেন, খাওয়া দাওয়া একরকম ছেড়েই দিয়েছেন। ড. ওয়াটসন জিজ্ঞেস করেছিলেন, খাবেন কখন? তাতে তিনি বলেছিলেন, পরশু সাড়ে সাতটায়। বিলি হোলো হোমসের ছোকরা চাকর। খুব চালাক আর চটপটে। হোমসের জীবনের একাকিত্বের ফাঁক অনেকটা ভরাট করেছে সে। বিলি ড. ওয়াটসনকে বলল- কাকে যেন ধরার চেষ্টা করছেন। পরশু বেরিয়েছিলেন জনমজুর সেজে, যেন কাজ খুঁজছেন, আর আজ বেরিয়েছিলেন এক বুড়ির সাজে। ড. ওয়াটসন বিলিকে বললেন, 'আচ্ছা, মামলাটা কী বলতে পারো?'

বিলি গলার স্বর নিচু করে চটপট উত্তর দিল, 'স্যার, আপনাকে বলতে আপত্তি নেই, তবে দেখবেন আর

কেউ যেন জানতে না পারে। এ হল মুকুটের হীরের সেই মামলা।' আঁতকে উঠলেন ওয়াটসন। বললেন, 'অ্যাঁ বলো কী, সেই কোটি টাকার চুরির মামলা?” বিলি বলল, 'আজ্ঞে হ্যাঁ। যেমন করেই হোক আদায় করতেই হবে। এ ব্যাপারে স্যার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

এসেছিলেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও নিজে এসেছিলেন। ওই সোফাতেই বসেছিলেন দুজনে, সুন্দর করে ওঁদের সঙ্গে কথা বলছিলেন মি. হোম্‌স্ । ওঁরা দুজন তাঁর কথায় কিছুক্ষণের মধ্যেই শান্ত হয়েছিলেন। মি. হোমস বলেছিলেন, তিনি যতোটা পারবেন করবেন।

ওয়াটসন বললেন, 'আচ্ছা, বিলি, জানলায় ওই পর্দাটা কেন?'

বিলি বলল, 'তিন দিন হল মি. হোমস ওটা ওখানে লাগিয়েছেন। জানেন, একটা খুব মজার জিনিস ওটার পেছনে আছে।' এই বলে বিলি গিয়ে জানলার পর্দাটা একটু সরিয়ে দিল। অসহ্য বিস্ময়ের একটা শব্দ ড. ওয়াটসনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল। তাঁর বন্ধুটির মূর্তি সেখানে, পরনে

ড্রেসিং গাউন। মুখটার তিনভাগ জানলার দিকে, আর নিচের দিকে নামানো, কোনো অদৃশ্য বই পড়তে ব্যস্ত,

আর শরীরটা ইজিচেয়ারের মধ্যে ডোবানো। মাথাটা খুলে নিয়ে বিলি বলল, 'এটা আমরা মাঝে মাঝে এদিকে

ওদিকে ফিরিয়ে দিই স্যার, যাতে অস্বাভাবিক মনে না হয়। জানলার পর্দা বন্ধ না থাকলে হাত দিতে সাহস

করি না, কারণ জানলার শার্সি খোলা থাকলে রাস্তার ওপার থেকে দেখা যায় ।

ওয়াটসন বললেন, 'এমন একটা ব্যাপার আগেও আমরা একবার করেছি।'

বিলি বলল, 'সে তাহলে আমি আসার আগে।' জানলার পর্দা সরিয়ে বিলি মুখ বাড়িয়ে রাস্তার দিকে

তাকিয়ে বলল, 'জানেন, ওদিক থেকে আমাদের ওপর লক্ষ্য রাখা হয়। ওই যে একজনকে দেখা যাচ্ছে, দেখুন না।'

ড. ওয়াটসন এক পা এগিয়েছেন, এমন সময় শোবার ঘরের দরোজাটা খুলে গেল, হোমসের সুদীর্ঘ ছিপছিপে শরীর দেখা দিল সেখানে। মুখটা ফ্যাকাশে আর লম্বা হলেও পদক্ষেপ ও ভাবভঙ্গি সেই আগের মতোই চটপটে দেখা গেল। একলাফে জানালাটার কাছে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে শার্সি বন্ধ করে দিলেন। বললেন, "ওটায় হাত দিও না বিলি। জানো, এই মুহূর্তেই তুমি ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছিলে, মারা পর্যন্ত যেতে পারতে এবং আপাতত আমার তোমাকে না হলে চলে না। আর ওয়াটসন, বড়ো ভালো লাগছে আবার তোমাকে তোমার পুরোনো ডেরায় দেখতে পেয়ে। কিন্তু বড়ো সংকটজনক মুহূর্তে তুমি এসেছ।'

ওয়াটসন বললেন, 'তাই তো শুনছি।'

হোমস বিলিকে বললেন, 'তুমি যাও। বিলি ছেলেটিকে নিয়ে মহাসমস্যা বুঝলে? এতোটা বিপদের মুখে

ওকে ঠেলে দেয়া কি আমার পক্ষে যুক্তিসঙ্গত, বলো তো?' ওয়াটসন বললেন, 'কিন্তু বিপদটা কিসের?” হোমস গাঢ় স্বরে উত্তর দিলেন, 'আকস্মিক মৃত্যুর। আজই সন্ধ্যায় একটা কিছু ঘটে যাবে বলে মনে হচ্ছে।'

ওয়াটসনের প্রশ্ন, 'কী সেটা?”

হোমস বললেন, 'খুন হয়ে যাওয়া।' ওয়াটসন বললেন, 'ধেৎ, তুমি ঠাট্টা করছ।'


চলবে.....


শার্লক হোমস পরিচিতি

শার্লক হোমসঃ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের একটি কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্র। ১৮৮৭ সালে প্রথম আবির্ভূত এই চরিত্রের স্রষ্টা স্কটিশ লেখক ও চিকিৎসক স্যার আর্থার কোনান ডয়েল। হোমস একজন উচ্চমেধাসম্পন্ন লন্ডন-ভিত্তিক "পরামর্শদাতা গোয়েন্দা"। নির্ভুল যুক্তিসঙ্গত কার্যকারণ অনুধাবন, যে কোনো প্রকার ছদ্মবেশ ধারণ এবং ফরেনসিক বিজ্ঞানে দক্ষতাবলে জটিল আইনি মামলার নিষ্পত্তি করে দেওয়ার জন্য তাঁর খ্যাতি ভুবনজোড়া।

কোনান ডয়েল হোমসকে নিয়ে চারটি উপন্যাস ও ছাপ্পান্নটি ছোটগল্প লিখেছেন। প্রথম কাহিনি আ স্টাডি ইন স্কারলেট ১৮৮৭ সালের বিটন’স ক্রিসমাস অ্যানুয়াল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় কাহিনি দ্য সাইন অব দি ফোর ১৮৯০ সালে লিপিনকোট’স মান্থলি ম্যাগাজিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৮৯১ সালে দ্য স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিন পত্রিকায় প্রথম ছোটগল্পের সিরিজটি প্রকাশিত হওয়ার পরই শার্লক হোমস চরিত্রটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯২৭ সাল পর্যন্ত হোমসকে নিয়ে একগুচ্ছ ছোটগল্পের সিরিজ ও আরও দুটি ধারাবাহিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়। হোমস কাহিনির পটভূমির সময়কাল ১৮৮০ থেকে ১৯০৭ সাল; শেষ ঘটনাটির সময়কাল অবশ্য ১৯১৪।

চারটি বাদে সব কটি কাহিনিই হোমসের বন্ধু তথা জীবনীকার ডা. জন ওয়াটসনের জবানিতে লেখা। দুটি গল্প ("দ্য ব্লাঞ্চেড সোলজার্স" ও "দ্য লায়ন’স মেন" হোমসের নিজের জবানিতে এবং অন্য দুটি গল্প "দ্য ম্যাজারিন স্টোন" ও "হিজ লাস্ট বো") তৃতীয় পুরুষে লেখা। দুটি গল্প আবার ("দ্য মাসগ্রেভ রিচুয়াল" ও "দ্য গ্লোরিয়া স্কট) হোমস ওয়াটসনকে নিজের স্মৃতি থেকে শুনিয়েছেন, এবং ওয়াটসন সেখানে কাহিনির কাঠামোটিই মাত্র বর্ণনা করেছেন। প্রথম উপন্যাস আ স্টাডি ইন স্কারলেট-এর মধ্যবর্তী অংশে হোমস ও ওয়াটসনের অজ্ঞাত ঘটনার দীর্ঘ বর্ণনা করা হয়েছে এক সর্বজ্ঞ বর্ণনাকারীর জবানিতে।

কোনান ডয়েল বলেছিলেন যে হোমসের চরিত্রটির অনুপ্রেরণা হলেন ডা. জোসেফ বেল, যাঁর অধীনে এডিনবরা রয়্যাল ইনফার্মারিতে করণিক হিসেবে ডয়েল কাজ করতেন। হোমসের মতো বেলও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পর্যবেক্ষণ থেকে বিরাট বিরাট সিদ্ধান্ত বের করতেন।

-সূত্রঃ উইকিপিডিয়া

আর্থার কোনান ডয়েল পরিচিতি

স্যার আর্থার ইগনেতিয়াস কোনান ডয়েল (১৮৫৯-১৯৩০):

স্যার আর্থার ইগনেতিয়াস কোনান ডয়েল ছিলেন একজন ইংরেজ লেখক ও চিকিৎসক।তার জীবনকাল ২২ মে ১৮৫৯ থেকে ৭ জুলাই ১৯৩০ (৭১বছর) সাল পর্যন্ত। তার শার্লক হোম্‌সের গল্পসমূহের জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তার অন্যান্য রচনার মধ্যে রয়েছে কল্পবিজ্ঞান গল্প, নাটক, প্রেমের উপন্যাস, কবিতা, ননফিকশন, ঐতিহাসিক উপন্যাস এবং রম্যরচনা। এছাড়াও তিনি তার জিবদ্দশায় অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার ও পেয়েছেন যার মধ্যে নাইট ব্যাচেলর,জেরুজালেমের সাধু জন হাসপাতালের সর্বোচ্চ সম্মান-এর 'নাইট অব গ্রেস,রানীর দক্ষিণ আফ্রিকা পদক , ইটালির অর্ডার অব ক্রাউন, নিশানে মাজেদি – দ্বিতীয় শ্রেণি (অটোম্যান সম্রাজ্য) উল্লেখযোগ্য।



{getCard} $type={post} $title={আপনার ভালো লাগতে পারে}

{nextPage}



দি কেস বুক অব শার্লক হোমস
গল্পঃ হীরক রহস্য
পর্ব-০২
মূল লেখকঃ স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
অনুবাদ-সম্পাদনা-ভূমিকা
মিলন রায়

হোমস বললেন, 'রসিকতার বোধ আমার অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু তাহলেও এর থেকে ভালো রসিকতা আমি করতে পারি । যাইহোক এরইমধ্যে তো একটু আরাম করা যাক, কী বলো? বলো, মদ চলবে? সিগারেট- টিগারেটগুলোও সব যথাস্থানেই পাবে। তোমার অভ্যস্ত আরাম চেয়ারে বসো, আবার দেখি তোমায় । আশা করি আমার পাইপকে আর বাজে তামাককে তুমি ঘৃণা করতে শুরু কর নি। কী জানো, খাদ্যের বদলে আজকাল এই বস্তুই সেবন করছি আমি।'

ওয়াটসন বললেন, 'কেন, খাচ্ছ না কেন?' 

হোমস গভীর স্বরে বললেন, 'মানে উপোস করলে বুদ্ধিবৃত্তিগুলো প্রচুর তীক্ষ্ণতা লাভ করে । কেন ওয়াটসন ডাক্তার হিসেবে তুমি নিশ্চয়ই মানবে খাদ্য হজমের ফলে রক্ত সরবরাহে যেটুকু সাশ্রয় হয় ঠিক ততোটাই মগজের লোকসান হয় । আমি মানুষটা আর নিছক মগজ ছাড়া আর কী? আমার বাকিটা বলতে গেলে বাহুল্য। সুতরাং আমার ভাবনা একমাত্র আমার মগজ নিয়ে ।

“কিন্তু বিপদের কথা যে কী বলছিলে?' ওয়াটসনের কৌতূহল । 
“হ্যাঁ, হ্যাঁ।' হোমস্ উত্তেজিত হয়ে বললেন, 'এবং পরিণতি যদি তাইই হয়, তাই খুনীর নাম আর ঠিকানা। তোমায় জানিয়ে দিচ্ছি । সেটা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে জানিয়ে দিও। নামটা হল সিলভিয়া—কাউন্ট নেগ্রেটো সিলভিয়াস। ঠিকানাটা লিখে রাখো- ১৩৬, মুরসাইড গার্ডেনস্, এন ডব্লিউ । লিখলে?? 

ওয়াটসনের সরল মুখে দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে উঠল । তিনি ভালো করেই বুঝতে পারলেন, কী সাঙ্ঘাতিক বিপদের ঝুঁকি হোমস নিয়েছেন। মানে হোমস যা বলেছেন তা আসল ভয়ের থেকে বরং কম করেই বলেছেন, এতোটুকু বাড়িয়ে বলছেন না। করিৎকর্মা মানুষ ওয়াটসন, সঙ্গে সঙ্গে সজাগ হয়ে উঠলেন। বললেন, 'আমায় কাজে লাগাতে পারো হোম্স্ – দু-একটা দিনের জন্যে আপাতত আমার হাত খালি ।

হোম্‌স্-এর উত্তর— একজন অতি ব্যস্ত ডাক্তারের চিহ্ন তোমার মধ্যে অত্যন্ত স্পষ্ট।

ওয়াটসনের চটপট জবাব, 'না, মানে, তেমন জরুরি কাজ কিছু হাতে নেই আর কি। তা, লোকটাকে কি পাকড়াও করতে পারো না?'

“হ্যাঁ, ওয়াটসন পারি । আর সেটাই হচ্ছে মুশকিল – হোমস বললেন। সঙ্গে সঙ্গে ওয়াটসনের জবাব, তাই যদি পারো তাহলে করছ না কেন?

হোমস বললেন, 'আমি জানি না হীরেটা কোথায়?”

ও. বিলি বলছিল বটে—সেই মুকুটের হারানো হীরেটা, ওয়াটসনের কৌতূহল

হ্যাঁ, হ্যাঁ—হোমস। হ্যাঁ, সেই মস্ত ম্যাজারিন হীরেটা। জাল আমি ফেলেছি, মাছকে জালে আটকিয়েছি। কিন্তু হীরেটা পাই নি, তাই তাদের ধরে আর লাভ কী? অবশ্য তাদের ধরলে অনেকের উপকার হবে, কিন্তু আপাতত তো আমার কাজ তা নয়, আমার চাই হীরেটা।

আর এই কাউন্ট সিলভিয়াসই বুঝি তোমার সেই মাছ—ওয়াটসনের প্রশ্ন।

হোমস বললেন—আজ সারাটা সকাল আমি তাঁর পায়ে পায়ে ঘুরেছি। বৃদ্ধার সাজে তুমি আমায় আগেও দেখেছো ওয়াটমসন। আজ সকালে আমার ছদ্মবেশ হয়েছিল আরও নিখুঁত । ছাতাটা ফেলে দিয়েছিলাম, তুলে দিয়েছিলেন পর্যন্ত— 'যদি কিছু মনে না করেন, মাদাম, তুলে দিচ্ছি ছাতাটা। উচ্চারণটা খানিকটা ইতালীয় ধরনের। মিনোরিজ-এর স্ট্রবেজির কারখানা পর্যন্ত গিয়েছিলাম তাঁর পিছু নিয়ে। এয়ারগান তৈরি করে ওরা—চমৎকার তাদের কাজ । এবং আমার ধারণা ওটা এখন আমাদের উল্টো দিকের বাড়িটায় আছে। মূর্তিটা দেখেছো নিশ্চয়ই, বিলি দেখিয়ে থাকবে সম্ভবত। মনে রেখো, যে-কোনো মুহূর্তে ওই মূর্তির সুন্দর মাথা ভেদ করে একটা গুলি বেরিয়ে যেতে পারে।

হঠাৎ ট্রের ওপর একটা কার্ড নিয়ে বিলি হাজির হল। ভু কপালে তুলে এমনভাবে হোম্‌স্‌ সেটার দিকে তাকালেন, যেন খুব মজা পেয়েছেন। মুখে বললেন, স্বয়ং এসেছেন ভদ্রলোক। এতোটা কিন্তু আমি একেবারেই আশা করতে পারিনি ওয়াটসন। স্নায়ুর ওপর অসাধারণ দখল ভদ্রলোকের । হিংস্র জন্তু শিকারে ওঁর সুনামের কথা তুমি নিশ্চয়ই শুনে থাকবে। এবং তার ওপর আবার যদি আমাকেও তাঁর শিকারের তালিকাভুক্ত করতে পারেন তো শিকারি জীবনের পরিণতি লাভ করবেন ভদ্রলোক।

ও নিজে আসাতে প্রমাণ হচ্ছে যে, আমি যে পিছু নিয়ে খুব কাছাকাছি থাকছি এ তিনি জানতে পেরেছেন।

ওয়াটসন বললেন, 'পুলিশের খবর দাও বন্ধু।

হোমস গম্ভীরস্বরে বললেন, 'হয়তো দেব, কিন্তু এই মুহূর্তে নয়। সাবধানে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে লক্ষ করো দেখি রাস্তায় কেউ ঘুরঘুর করছে কি না!'

পর্দার একপাশে গিয়ে ওয়াটসন সন্তর্পণে তাকালেন চারিদিকে। ফিসফিস করে বললেন, “হ্যাঁ, একটা গুন্ডা ধরনের লোককে দরজার কাছে পায়চারি করতে দেখছি।

‘ওই-ই তাহলে স্যাম মার্টন। ওঁর একান্ত বিশ্বস্ত অল্প বুদ্ধির লোকটা। কোথায় এই ভদ্রলোক বিলি?” এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন হোম্‌স্ ।

বিলি বলল, 'বাইরের ঘরে স্যার।'

হোম্‌স্ বিলিকে নির্দেশ দিল, 'ঘণ্টা বাজালে তখন ওঁকে নিয়ে আসবে।'

ওয়াটসন দেরি করলেন যতক্ষণ না দরোজাটা বন্ধ হল। তারপর অত্যন্ত ব্যাগ্রভাবে বন্ধুর দিকে তাকালেন । বললেন, 'দেখো, হোমস্, লোকটা বেপরোয়া, কোনো কিছু মানবে না। কে জানে, তোমায় হত্যা করবেই। বলেই এসেছে হয়তো । আমি বলছি, আমি এখন তোমার সঙ্গেই থাকব।

হোমস আপত্তি জানিয়ে বললেন, 'উঁহুঁ। কক্ষনো না। খুব অসুবিধা হবে তাহলে। তার চেয়ে শোনো, ক'লাইন খচখচ্ করে লিখে ওয়াটসনের হাতে দিয়ে বললেন, 'এই চিঠিটা নিয়ে তুমি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে যাও। একটা গাড়িভাড়া করে, সি. আই.ডি'র ইউঘালকে দেবে। একেবারে পুলিশ নিয়ে আসবে সঙ্গে করে। তারপর... তারপর যাবে কোথায় বাছাধন।

ওয়াটসন চলে গেলেন কর্তব্য পালন করতে।

হোমস এবার নিজের মনে বলতে লাগলেন, এর মধ্যে আমি নিশ্চয়ই হীরেটা আবিষ্কার করার সময় পাব। এবার ঘণ্টাটায় হাত দিলেন তিনি। নিজে মনে মনে স্থির করে নিলেন, শোবার ঘরের মধ্যে দিয়েই তিনি যাবেন। এই দ্বিতীয় পথটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হোমস চান, তিনি যেন সিলভিয়াসকে আগে দেখতে পান-সে তাঁকে দেখে ফেলার আগেই।

বিলি একটু পরে কর্নেল সিলভিয়াসকে নিয়ে গিয়ে বসাল। কেউ ছিল না সেখানে। বিখ্যাত শিকারিটি বিশাল দেহ, আলকাতরার মতো কালো গায়ের রঙ, চোখ কালো । সজারুর মতো গোঁফ। বাজপাখির ঠোঁটের মতো লম্বা বাঁকানো নাক । ভদ্রলোক অত্যন্ত সুসজ্জিত। রঙচঙে নেকটাই আর ঝলমলে নেকটাই-এর পিন, ঝকমকে আংটি দেখে মনে হয় যেন একটু বাড়াবাড়ি হচ্ছে। দরোজাটা বন্ধ হতে তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ সচকিতদৃষ্টিতে এমনভাবে তাকাতে লাগলেন চারিদিকে যেন প্রতি পদক্ষেপেই কোনো ফাঁদে পা দিতে চলেছেন। হঠাৎ জানলার কাছে চেয়ারের ওপর অভিব্যক্তিহীন মাথাটা আর ড্রেসিং গাউনের উপরটা তাঁর চোখে পড়ল। মুখে একটা ঝিলিক খেলে গেল তার। আরো একবার চারিদিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখে নিলেন কোনো সাক্ষী আছে কি না, তারপর পায়ের আঙুলে ভর করে দাঁড়িয়ে মোটা একটা বেত তুলে নির্বাক মূর্তিটার দিকে এগোলেন। মূর্তিটায় আঘাত করার জন্যে যেই না বেতটা তুলেছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই নিরুত্তাপ শেষ মিশ্রিত একটা কণ্ঠস্বর শোবার ঘরে দরোজা দিয়ে বলে উঠল, ভাঙবেন না কাউন্ট, ভাঙবেন না ওটা। মুহূর্তের জন্যে সিলিডিয়াস থমকে গেলেও, পরমুহূর্তেই কাউন্ট সিলভিয়াস আবার বেতটা উদ্যত করলেন, যেন মূর্তিটাকে ছেড়ে আসল লোকটিকেই আক্রমণ করতে চান। কিন্তু হোমসের ধূসর স্থির দৃষ্টি আর বিদ্রূপের হাসির মধ্যে এমন কিছু ছিল যার ফলে তাঁর হাত নেমে গেল ।

হাসতে হাসতেই হোমস বললেন, পাশের ঐ টেবিলে হ্যাটটা আর বেতটা রাখুন।

কাউণ্ট সিলভিয়াস মন্ত্রচালিতের মতো তাই-ই করল। হোম্‌স্ বললেন, বেশ। বসুন এবার। রিভলভারটাও রেখে দেবেন নাকি? বেশ, ঠিক আছে, ইচ্ছে করলে ওর ওপরেই বসতে পারেন। হ্যাঁ, ভাল, কথা। আপনি আজ খুব ভালো সময়েই এসেছেন, কারণ, আপনার সঙ্গে আমার কতকগুলি জরুরি কথা আছে।

কাউন্ট সিলভিয়াস আতঙ্কিত চোখে হোমসের দিকে ভালো করে তাকিয়ে নিচ্ছিল। সেও কর্কশ স্বরে বলল—আমারও কয়েকটা কথা বলবার আছে আর সেই জন্যেই আমি এসেছি। অস্বীকার করব না, আমি আপনাকে তখন মারতেই উদ্যত হয়েছিলাম।

টেবিলের ধারে বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে হোম্‌স্‌ বললেন, আমি তো জানতাম অমন একটা মতলব নিয়েই আপনি এসেছেন। কিন্তু এই ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণটা কী?

কাউন্ট তীক্ষ্ণস্বরে বলল, 'আপনি আমায় বিরক্ত করছেন নিজের সীমা লঙ্ঘন করে। আপনি আপনার চরকে আমার পেছনে লাগিয়েছেন। ক্ষোভে ফেটে পড়ল সিলভিয়াস!'

হোমস অবাক হওয়ার ভান করে বললেন, আমার চর। না, কখনো না।

কাউন্ট রেগে গিয়ে বলল, 'ন্যাকামো ছাড়ন।'

হোমস সবিনয়ে বললেন, "একটা কথা আপনাকে বলা দরকার কাউন্ট সিলভিয়াস। আমার চরের ব্যাপারে আপনি যা শুনেছেন তা ঠিক নয়।

এ কথায় কাউণ্ট মসৃণ হাসি হেসে বলল, 'দেখুন, আপনার মতো অন্যদেরও পর্যবেক্ষণ শক্তি থাকতে পারে। কাল এসেছিল একজন শিকারি আর আজ একটা বুড়ি। সারাটা দিন তারা আমায় চোখে চোখে রেখেছে।

“বলতে কি কাউন্ট, আপনি কিন্তু এককথায় পরোক্ষভাবে আমারই প্রশংসা করলেন। মানে আপনি, আমাকে ছদ্মবেশগুলোরই প্রশংসা করে বসলেন।"

কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে হোমস বললেন, 'ওই দেখুন সেই ছাতাটা যেটা আপনি অমন ভদ্রভাবে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তখনও আপনার মনে সন্দেহ জাগে নি ।


চলবে....


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।