এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-০৮ )

এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-০৮ )
এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-০৮ )




গল্পঃ এম্বুলেন্স রহস্য
পর্বঃ-০৮
লেখকঃ রিয়াজ রাজ
প্রকাশকালঃ এপ্রিল-২০২৩
অনলাইন প্রকাশ
গল্পের বিভাগঃ রহস্য গল্প



--------------------------------
কিছুক্ষণ হাসার পর রিয়াজ মাতাল স্বরে বলে," এম্বুলেন্সে তোর বান্ধুবী ছাড়া কেও নাই গাধা। দাঁড়া, তোর বান্ধুবী মরার পর নড়েছে কিনা দেখে আসি"। কথাটা বলে হাসতে হাসতে রিয়াজ এম্বুলেন্স এর পিছনে যায়। আর ঢাকনা খুলে তাকাতেই দেখে, মরা লাশটা সিটে বসে আছে। তাও রিয়াজের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে।

রিয়াজও মেয়েটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। রিয়াজের কোনো নাড়াচাড়া না দেখে,হেল্পার আর লোকটা রিয়াজের কাছে আসে। ওরা এসে এমন দৃশ্য দেখে জোরে এক চিৎকার মেরে উঠলো। রিয়াজ ওদের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে,ততক্ষনে ওরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। অন্ধকারে কে কোন দিকে পালিয়েছে। সেটির কোনো ইয়ত্তা নেই। রিয়াজ ওদের দৌড় দেখে ধীর স্বরে বলে," মদ খেয়ে আমি নাহয় ভুলভাল দেখি। ওরাও দেখলো নাকি"। কিছুক্ষণ মাথা চুলকানোর পর আর কিছু না ভেবে,এম্বুলেন্স এর দরজা বন্ধ করে দেয় রিয়াজ। এরপর সামনে এসে এম্বুলেন্স এ উঠে বসে। পকেট থেকে ফোন বের করে লোকেশন দেখে। আর এম্বুলেন্স স্টার্ট করে সেই স্থান ত্যাগ করলো।

হাতে সিগারেট , চারপাশে ঘনকালো অন্ধকার। এম্বুলেন্স এর লাইটের আলোয় রিয়াজ এগিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি চলন্ত অবস্থায় হটাৎ রিয়াজের ফোনে কল আসলো। রিয়াজ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে,অচেনা নাম্বার। ফোন রিসিভ করে রিয়াজ বলে," হ্যালো কে?"। রিয়াজের জবাবে ওপাশ থেকে হেল্পার বলে," আরে ভাই আপনি পাগল নাকি। ভুত নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন"। হেল্পারের কণ্ঠস্বর অনেক ভয়ার্ত শুনাচ্ছে। রিয়াজ স্বাভাবিক ভাবে হেল্পারকে বলে, "। মদ খেয়ে ভুলভাল দেখেছিলা। ওখানে কিছুই নেই। মৃত লাশ বসতে পারে নাকি "। রিয়াজের কথা শুনে হেল্পার আরো ভয়ার্ত স্বরে বলে," ভাই, আপনি কিভাবে বুঝলেন আমরা লাশটাকে বসা অবস্থায় দেখেছি? তারমানে আপনিও দেখেছেন। ভুল একজন দেখবে,আমরা ৩ জনই দেখেছি লাশ বসে আছে। আপনি বিপদে আছেন ভাই"। ওর কথা শুনে রিয়াজ কলটা কেটে দেয়। এরপর আবার মনোযোগ বসায় এম্বুলেন্স চালানোতে। হেল্পারের সাথে কথা বলতে বলতে হাতের সিগারেটটা প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। তাই রিয়াজ সিগারেট ফেলে, আবার একটা নতুন সিগারেট ধরায়। কিছু দূর যেতে না যেতেই, আবার হেল্পারের কল। রিয়াজ ফোনটা রিসিভ করে বলল," আবার কি হয়েছে "। রিয়াজের এমন সাহসিকতা দেখে হেল্পার তখন বলল, " ভাই আমাদের যেখানে নামিয়ে দিয়েছেন, তার ঠিক পিছনে একটা চায়ের দোকান আছে। আমি আর এই ভাইটা সেই দোকানে আছি। বড় ভাই সকালে গাড়িতে উঠে চলে যাবে। আপনি লাশ নামিয়ে দিয়ে আমাকে রিসিভ করে নিয়েন "। হেল্পার এর পুরো কথা শুনে রিয়াজ আবার কোন জবাব না দিয়ে কলটা কেটে দিল। এরপর মনোযোগ বসায় এম্বুলেন্স চালানোতে।

ঘটনার ঠিক তিন ঘন্টা বাদে রিয়াজ ফেনীতে প্রবেশ করলো। এরপর লোকেশন চেক করতে করতে রিয়াজ ফেনী চরচান্দিয়া এলাকায় প্রবেশ করে। এখানে হাসেম মাস্টারের বাড়ি কোনটা, তা ম্যাপ থেকে চেক করে রওনা করতে থাকে রিয়াজ। কিছুক্ষণ পর রিয়াজ ম্যাপ অনুযায়ী হাসেম মাস্টারের বাড়িতে উপস্থিত হয়। এম্বুলেন্স এর আওয়াজ শুনে বাড়ির সবাই অলরেডি গেটের সামনে চলে আসে। রিয়াজ মানুষজন দেখে আরেকটু নিশ্চিত হয় যে, সে সঠিক স্থানে চলে এসেছে। সবার সামনে গিয়ে রিয়াজ এম্বুলেন্স দাঁড় করায়। এরপর এম্বুলেন্স থেকে নেমে, লাশের আত্মীয়স্বজনদের উদ্দেশ্যে বলে, " কয়েকজন আমার সাথে আসুন। লাশ নামাতে হবে "। রিয়াজের কথা শুনে লাশের আত্মীয়-স্বজনের মুখে একটা উত্তেজিত ভাব দেখা যায়। সাথে হেল্পার নেই, আর নেই লাশের চাচাতো ভাই। লাশ নিয়ে এম্বুলেন্স ড্রাইভার একা কেন এলো। এই প্রশ্নটা সবার মাথায় তখন ঘুরপাক খাচ্ছিল। তাদের বিস্মিত মার্কা চেহারা দেখে রিয়াজ নিজেই তাদেরকে বলে উঠলো, " সাথে যে দুইজন এসেছে, তারা কোন এক কাজে রাস্তায় নেমে গেছে। তাই লাশ আমার একা আনতে হয়েছে। আপনাদের যে লোক এসেছে, তিনিও সকালে নাকি আসবেন"। রিয়াজের কথাটা কারো কাছে ক্লিয়ার হলেও, অনেকের কাছে ভিন্ন কিছু মনে হতে থাকে।যেনো তারা সব জানে। রিয়াজের মিথ্যেটাও তারা যেনো বুঝে গেছে। কিন্তু রিয়াজ কাউকে কোন প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে, নিজেই এম্বুলেন্সের ঢাকনা খুলতে থাকে। রিয়াজের এমন আচরণ দেখে কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন এসে রিয়াজের সাথে হাত লাগায়। রিয়াজ এম্বুলেন্সের ঢাকনা খোলার পর দেখে, লাশ ঠিকই শুয়ে আছে। আর লাশের বক্সটাও খোলা নেই। রিয়াজ গিয়ে লাশের বক্সটা ধরে এবং সাথে লাশের আত্মীয়স্বজনরা এসে, রিয়াজের সাথে লাশের বক্স এম্বুলেন্স থেকে বের করে। এরপর রিয়াজ বাক্সের ঢাকনা খুলতেই, সবাই লাশটাকে বের করে তাদের উঠোনে নেয়। লাশ নামিয়ে দিয়ে রিয়াজ আবার এম্বুলেন্স এর কাছে আসে।গাড়ির ঢাকনাটা আটকে দিয়ে, নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে। এরপর সবাইকে বিদায় দিয়ে, বাড়িটা থেকে বের হয়ে চলে আসলো।

কোনোদিকে কোনো নজর নেই,আর নেই কারো অবস্থান। রাতটা এখন গভীর। ফেনীতে এসে রিয়াজ আবার কুমিল্লার পথটায় রওনা করে।প্রতিবারের মতো সিগারেট জ্বালিয়ে ড্রাইভ করছে। কিন্তু রিয়াজ অনুভব করতে পারছে,এম্বুলেন্স এর পিছনে কেও রয়েছে। রিয়াজ কোনো দিকে নজর না দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর চারপাশে ফজরের আযান শুরু হয়। আযানের ধ্বনি রিয়াজের কান অব্দি আসতেই, রিয়াজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কপাল থেকে ঝড়ে পড়া ঘাম এইবার শুকাতে শুরু করলো। চারপাশে ধীরে ধীরে আলো ছড়াচ্ছে। সূর্য উঁকি দিবে কিছুক্ষণ পর। ভোরের এই মিষ্টি বাতাস রিয়াজের চুল স্পর্শ করছে। কিন্তু রিয়াজের মগজে ভাবনা চলে অন্য কিছু।

সকাল- ০৬:১২ মিনিট...
রিয়াজ সেই দোকানের কাছে আসে। হেল্পার দোকানের সীটে ঘুমাচ্ছে। রাস্তার পাশে এম্বুলেন্স দাড় করিয়ে রিয়াজ নেমে পড়ে। এরপর দোকানে গিয়ে দেখে, দোকানি বসে বসে কোরআন তেলোয়াত করছে। রিয়াজকে উপস্থিত হতে দেখে দোকানি একটু স্থীর হয়। রিয়াজ দোকানির উদ্দেশ্যে বলে," চা হবে?"। দোকানি মুচকি হেসে উত্তর দিলো," জ্বী ভাই। বসুন"। রিয়াজ সীটে না বসে হেল্পারকে ডাকতে শুরু করলো। হেল্পারের পরিচিত দেখে দোকানি রিয়াজকে বলে," ভোরে এসে দেখি উনি সীটে ঘুমাচ্ছে। কয়েকবার ডেকেছি আমি। উঠেনা"। রিয়াজ দোকানির কথা শুনে কোনো জবাব দেয়নি। হেল্পারকে ধাক্কা কয়টা মারতেই,সে লাফিয়ে উঠে। রিয়াজ এইবার গিয়ে সিটে বসলো। এদিকে হেল্পার রিয়াজকে দেখতে পেয়ে বলতে লাগলো," আপনি আসছেন তাহলে"। রিয়াজ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক ইঙ্গিত দিলো। হেল্পার আবার বলা শুরু করে," লাশের সাথে আসা ভাইটা আমাকে একা রেখে চলে গেছে"। হেল্পারের কথা শুনে রিয়াজ বলে," এতো রাতে গাড়ি কোথায় পেয়েছে সে"। হেল্পার রিয়াজের প্রশ্নে আবার বলে," গ্যাস নেওয়ার সিএনজিতে গেছে। এক ড্রাইভার ফেনী যাচ্ছিলো গ্যাস আনতে। উনাকে ৫০০ টাকা দিয়ে রিজার্ভ করেছে"। হেল্পার তার কথা শেষ করতেই দোকানি চা নিয়ে এসেছে। রিয়াজ আর হেল্পার চায়ের কাপ হাতে নিলো।

চা খেয়ে বিল পরিশোধ করে নেয় রিয়াজ। এরপর হেল্পারকে নিয়ে রওনা করে ঢাকাতে। যদিও মাঝপথে হেল্পার অনেক কথা জিজ্ঞেস করেছিলো। রিয়াজ তার সব কথাকে এড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ কথা ঘুরিয়ে দেয়। প্রায় ২ ঘন্টা ৪৮ মিনিট বাদে রিয়াজ এম্বুলেন্স নিয়ে হাজির হয় হসপিটাল। বাহিরে গাড়ি দাড় করিয়ে রিয়াজ হেল্পারকে বলল," বসকে জানিয়ে আসো। আমি চায়ের দোকানে আছি"। কথাটা বলে রিয়াজ গাড়ি থেকে নামে। আর সোজা চলে যায় চায়ের দোকানে। হেল্পার গাড়ি থেকে নেমে ঢুকে যায় গেটে। রিয়াজ চায়ের দোকানে যেয়ে আগে একটা সিগারেট ধরায়। এরপর চায়ের অর্ডার করে।

কিছুক্ষণ বাদে হসপিটাল থেকে বের হয় কালাম সাহেব। গেট থেকে বেরিয়ে সোজা উপস্থিত হয় রিয়াজের কাছে। রিয়াজ কালাম সাহেবকে দেখে একটু মুচকি হাসি দেয়,আর দাঁড়িয়ে পড়ে। কালাম সাহেব কাছে আসতেই রিয়াজ বলল," কি অবস্থা ভাই। লাশ তো নামিয়ে এসেছি"। রিয়াজ কথাটা বলার পর,হাসিটা আর রাখতে পারেনি। কালাম সাহেবকে দেখে বুঝা যাচ্ছে উনি রাগম্বিত। রিয়াজ আবার কিছু বলবে,তার আগে কালাম সাহেব বলে," এসেছো সেই গতকাল রাত। তোমার ভাবির সাথে কথা হয়েছে আমার। সেদিন রাতেও কিছু খাওনি। আমাকে গোসল করার সময়টা দিতা। একসাথে কিছু খেয়ে এরপর কাজে যাইতা। কিন্তু তুমি? বেশি কাজ দেখাচ্ছো? বস কল দিতেই পাগলের মত ছুটে আসলা"। অনেকটা ধমকের স্বরে কথাগুলা বললেন কালাম সাহেব। রিয়াজ মাথা নিচু করে বলে," পরেরবার থেকে আর হবেনা"। কালাম সাহেব এতে সন্তুষ্ট হয়নি। উনি আবার ধমকের স্বরে বললেন," আর আমি যে এতোগুলা কল দিলাম। রিসিভ করোনি কেন। হেল্পারকে যখন কল দিলাম,সে বলল তুমি তাকে মাঝরাস্তায় রেখে লাশ নিয়ে চলে গেছো। খুব দায়িত্ববান হয়ে গেছো তাইনা?"। রিয়াজ কালাম সাহেবকে আবার শান্তস্বরে বলে," ভাই, ফোন খেয়াল করিনি"। কালাম সাহেব এতেও সন্তুষ্ট হলেন না।তবে এইবার একটু নরমাল ভাবে বললেন," বসকে আমি কাল থেকে ইচ্ছেমত বকাঝকা করেছি। তুমি এখন এই লাইনে নতুন।তার উপর আজ দুইদিন ভাত খাওনি। কি দরকার ছিলো রাতে লাশ টানার। আর হেল্পারের মুখে মাত্র শুনে এলাম সব। কি হয়েছিলো রাতে"। রিয়াজ এইবার কালাম ভাইয়ের কথাটা এড়িয়ে দেওয়ার জন্য বলে,"

- আজ কি আমার আর কোনো ডিউটি আছে?
- রাখো তোমার ডিউটি। আগে বলো রাতে কি হয়েছে।

রিয়াজ কালাম সাহেবের কথায় এইবার আর জবাব দেয়নি। পকেট থেকে টাকা বের করে,দোকানিকে চায়ের বিল দিলো। এরপর সিটে বসে সিগারেট টানছে। কালাম সাহেব রিয়াজকে এইবার ধমকের স্বরে বলে, " সমস্যা কি। আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি"। রিয়াজ এইবার না পেরে বসা থেকে উঠে যায়। আর হসপিটালের দিকে যেতে লাগলো। কালাম সাহেব নিজেও রিয়াজের পিছন পিছন এসে সামনে দাঁড়ায়। রিয়াজের পথ আটকাতেই, রিয়াজ গেটে না গিয়ে এম্বুলেন্সে চলে যায়। ড্রাইভিং সিটে বসে কিছু ভাবছে।এদিকে কালাম সাহেব নাছোড় বান্দা। উনি এম্বুলেন্স এর কাছে এসে রিয়াজকে আবার বলে," আমি জানি তুমি স্বাভাবিক ভাবে লাশ নামিয়ে আসোনি। অনেক কিছু ফেস করেছো। এই লাশ কেও নিতে চায় নি। তাই বস আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো। আমি সন্ধার দিকে লাশটা নিয়ে যেতাম। তুমি সেখানে পাকনামি করে নিজেই এলে। তুমি জানো? এই লাশের মূল কাহিনী? "। কালাম সাহেবের কথা শুনে রিয়াজ একটু নড়েচড়ে বসে। এরপর বলে,
- লাশের আবার কি কাহিনী। আর থাকলেও আমার কি। আমার কাজ ছিলো লাশ নামিয়ে দেওয়া।আমি দিয়ে এসেছি।

- রক্ষাকবজ নিয়েছিলে?
- রক্ষাকবজ? কিসের?
- প্রত্যেক এম্বুলেন্স ড্রাইভারদের সাথে রক্ষাকবজ থাকে। যেটি গতকাল টেবিল থেকে আমাকে দিয়েছিলে। আর যে লাশ তুমি নিয়েছো। সেটিকে খুন করা হয়েছিলো। প্রায় ১ মাস থেকে সে মর্গে। আর এই লাশ মর্গে নানান ঘটনা ঘটিয়েছে।

- বুঝিনি আমি।
- মর্গের পাহারাদার জসিম মিয়া icu তে আছে। এই লাশটা আক্রমণ করেছিলো তাকে। জসিম মিয়ার হাতে কয়েকটা চুল পাওয়া যায়। যেটা এই মেয়ের চুল। এখন এসব হচ্ছে সবার কাছে কু-সংস্কার। কে বিশ্বাস করবে একটা লাশ তাকে আক্রমণ করেছে।

- পরে...?

- পরে আর কি। এই লাশকে সরানোর অনেক চেষ্টা করে। কিন্তু কেও নিতে পারেনি।এক ড্রাইভার লাশ এনে এম্বুলেন্স এ রেখেছিলো। এরপর অফিসে যায় ঠিকানা আনতে। কিন্তু এসে দেখে লাশ এম্বুলেন্স এ নেই। খোঁজাখুঁজি করে দেখে,লাশ অলৌকিক ভাবে মর্গে চলে গেলো। ভয়ে সেই ড্রাইভার চাকরিই ছেড়ে দিছে। জানাজানি হবার পর কেও রাজি না এই লাশ নিতে। আমি টানা ডিউটিতে থাকায়, আমাকে এই লাশের ব্যাপারে বলা হয়নি। কারণ এই হসপিটালের সিনিয়র ড্রাইভার আমি ছাড়া কেও নেই। সন্ধায় এসে আমি লাশটাকে নেবার কথা।

- তাহলে বস কেন আমাকে পাঠালেন?

- ওরা তো বলবেই। ড্রাইভারদের জীবনের চিন্তা ওদের আছে? লাশের পরিবারের কেও রাজি না। ওরাও ওদের লাশকে ভয় পাচ্ছে। তাই ঢাকায় ওর চাচাতো ভাইকে পাঠায়। এই কারণেই,চাচাতো ভাই কিছু জানতো না। তাই রাজি হয়। কিন্তু গতকাল দুপুরে, মর্গের একজনের হাত কামড়ে খেয়ে ফেলে এই লাশ। দারোয়ান আরেকটি লাশ রেখে আসার সময়,এই মেয়েটি দারোয়ানের হাত টেনে ধরে। দারোয়ান বাঁচার জন্য হাত টান দেয়। আর দেখে উনার ৫ আঙ্গুল সহ, হাতের তালু নেই। ভয়ে তিনি মর্গের বাহিরে আসে। আর এসব জেনে বস আমাকে কল দেয়। কিন্তু তুমি ফোন রিসিভ করলা। উনি জানে আমি রিসিভ করেই সালাম দিই। চুপ থাকায় বুঝে গেছে ফোন আমি ধরিনি।

- মর্গের সব লাশই এমন?
- না। সব না। কিছু কিছু। আর যে মেয়ের লাশ তুমি নিয়েছো। তাকে তো নৃশংস হত্যা দেওয়া হয়েছিলো।
- হত্যা দেওয়া হয়েছিলো মানে?
- কি আর বলবো। এইজে পাশের এলাকাতে এমপি সোহেল সাহেবের বাড়ি। তার ছেলেদল এই কাজ করেছে। ১২ দিন বন্দি রেখে ধর্ষণ করলো। তারপর মেয়ের পেট কেটে হত্যা করলো। মেয়ের ফ্যামিলি কিছু করতে পারেনি। ঐজে? এমপির চেলা,তাই বেঁচে গেছে সব শুয়োরছানা।
- এইজন্যই সাহায্য চাচ্ছিলো।

- কে?
- ঐ মেয়েটি।

- আমি জানতাম। আমি বুঝেছি ঝামেলা হয়েছিলো। তুমি হাইড কেন করতেছো বলবা?
- ভাই, আমি আমার ভাবির কষ্ট দেখতে পারছিলাম না। আমার পঙ্গু ভাইয়ের চোখের পানি প্রতিদিন ঝরে। বকুল ভাইয়ের টাকা শোধ করতে হবে। এখানে আমার উদ্দেশ্য টাকা কামানোর। তাই এসব বলেও লাভ কি। তাদের কাজ তারা করে, আমার কাজ আমি করেছি।
- আমাকে বলবা? মূলত কি হয়েছিলো?
- চায়ের দোকানে যাই চলুন।

রিয়াজ এম্বুলেন্স থেকে নেমে চায়ের দোকানে আসে। কালাম সাহেবও রিয়াজের সাথে দোকানে চলে আসে। আরো দুইটা চা,আর দুইটা সিগারেট নিয়ে বসে দুজন। রিয়াজ চায়ের কাঁপে চুমক দিয়ে বলতে শুরু করে," কাল শুরু থেকেই আমি অস্বাভাবিকতার সম্মুখীন হয়েছি। যখন ঢাকার ভিতরে,অর্থাৎ যাত্রাবাড়ীর আগে জ্যামে পড়েছিলাম। তখন থেকে আমার শরীর ভার হয়ে যায়। এসব আমলে না নিয়ে হেল্পারের থেকে সিগারেট নিয়েছি,আর ধরিয়েছি। জ্যাম ছেড়ে যখন দাউদকান্দি পার হয়েছি। তখন চলন্ত গাড়ির পাশে কেও খুব সাধারণ ভাবে দাঁড়িয়ে বলে সাহায্য করতাম। গাড়ি থামাতাম। আমি থামাইনি। কিন্তু কিছুটা সন্দেহ গেছে। এতো গতিতে গাড়ি চললো,বাহিরের লোকটা কিভাবে আমার জানালার পাশে দাঁড়াতে পারে। অবাক হয়ে আমি গাড়ি থামাই। এরপর নেমে যখন চারপাশে চোখ দিয়েছি। তখন দেখি,আমার সামনে থাকা বিলের মাঝে চাদর গায়ে কেও দাঁড়িয়ে আছে। যদিও সে অনেক দূরে ছিলো।আমি দূর থেকে চাদর গায়ে দেওয়া সেই অবয়বকে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। কিন্তু স্পষ্ট কিছু বুঝে উঠিনা। এক নজরে তাকিয়ে থাকার পর বুঝলাম,চাদরের ভিতর থেকে দুইটা লাল চোখ জ্বলে উঠেছে। আমি তো মানুষ,ভয় মানুষরাই পায়। কিছুটা ভয় আমিও পেয়েছি। আর এই ভয় পাবার মাঝে খেয়াল করি,চাদর গায়ে দেওয়া অবয়বটা এক দৌড়ে ডান দিকে চলে গেলো। তার দৌড় এতোটাই দ্রুত ছিলো। যা আমি খেয়াল করে নজরবন্দি করতে পারিনি। বুঝে যাই অস্বাভাবিক কিছু ঘটবে। তাই হেল্পার আর ঐ লোককে নিয়ে আবার রওনা করতে যাই। কিন্তু দেখি এম্বুলেন্স এর চাকা লিক"। এতটুকু বলে রিয়াজ আবার চায়ের কাঁপে চুমক দেয়। কালাম সাহেবের চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে,সিগারেট জ্বলে যাচ্ছে। কিন্তু উনার খবর নেই,উনি এক দৃষ্টি আর মন দিয়ে রিয়াজের কথা শুনে যাচ্ছে। রিয়াজ চায়ের কাঁপ রেখে আবার বলতে শুরু করে," চাকা লিক সারানোর পর হেল্পার দিয়েছে চিৎকার। আমি ঐ লোকের সাথে মদ খাচ্ছিলাম।মদের বোতল ওটা উনিই এনেছে। গ্রামে এর চেয়ে পাওয়ার ওয়ালা মদ খেয়ে আমার কিছু হয়না। কিন্তু ওর এই সেভেন আপ মার্কা মদ খেয়ে আমাকে মাতাল সাজতে হয়েছে। এখানে অস্বাভাবিকতা হচ্ছে আমি জানি। কিন্তু ওরা যাতে ভয় না পায়,তাই মাতালের মত সব হেসে উড়িয়ে দিচ্ছিলাম।আমার এই চেষ্টাকে ব্যার্থ করে লাশ উঠে বসে গেছে। আমি ঐ মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম শুধু। ভাবছিলাম, বক্সের ঢাকনা কে খুললো,আর মেয়েটিও বা কিভাবে উঠে বসলো। আমার ভাবনার মাঝে হেল্পার আর ঐ লোক এসে দেখে যায় সব। আর দৌড়ে পালায়। কিন্তু আমি আমার কাজ সম্পন্ন না করে যেতে পারিনা। আমার ভাবি আর ভাই আমার জন্য অনেক করেছে। অনেক খেটেছে। চাকরির প্রথম কাজটাই যদি পূরণ করতে না পারি,তবে জব চলে যাবে ভেবে আমি দৌড়াইনি। বসে থাকা লাশের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছি। আর সোজা এম্বুলেন্সে বসে টার্গেটে যাচ্ছিলাম। আপনার কল আমি দেখেছি,ভেবেছি হেল্পার আপনাকে সব বলেছে। এইজন্য ধরিনি।যদি আপনি আমাকে লাশ নিতে বাঁধা দেন,তবে আমি আমার কাজ সম্পন্ন করতে পারবো না। ওসব ভুতের চেয়ে আমার কাছে টাকা জরুরী বেশি। কুমিল্লাতে এম্বুলেন্স ঢুকার পর আচমকা পিছন থেকে ঐ মেয়ের চিৎকার ভেসে আসে।কান্না করে আস আমাকে ডাকছে। আমি যেনো তাকে নিয়ে না যাই। আমার কপাল বেয়ে ঘাম যাচ্ছিলো। ভয় মনে আছে, কিন্তু কাজ শেষ করার আগে আমি যাবোনা কোথাও। এই ধারণা মনে এনে গাড়ি থামাইনি আর। পিছনে সে পেটাপেটি শুরু করেছে,যেনো এম্বুলেন্স ভেঙ্গে ফেলবে। তবুও গাড়ি থামাইনি। এইভাবে প্রায় ৩০ মিনিট সে চিল্লাচ্ছিলো। আমি কোনো পরোয়া না করে এম্বুলেন্স চালিয়ে গেছি। কিন্তু যখন ফেনীতে যাই।তখন ভয় লাগেনি। মানুষজন ছিলো বাজারে। ফেনী শহর ছেড়ে যখন এলাকাতে ঢুকি। তখন আবার লাশটা চিৎকার শুরু করে। আমি আল্লাহ্‌র নাম মুখে নিয়ে এম্বুলেন্স তবুও থামাইনি। শেষে হাসেম মাস্টারের বাড়িতে ঢুকার আগে,লাশ চুপ হয়ে যায়। আমি দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে লাশ তাদের হাতে বুঝিয়ে দিলাম। কিন্তু কালাম ভাই,বিশ্বাস করুন।লাশ রেখে আসার সময় যা হয়েছে,তা অনেক ভয়ংকর ছিলো। আমি যেনো মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এসেছি"।

এই কথাটা বলতেই,রিয়াজের গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়।




চলবে..........?



গল্প- #এম্বুলেন্স_রহস্য ( পর্ব-০৮)
লেখক- #রিয়াজ_রাজ



[ লাশের চিৎকার আপনি শুনতে পাচ্ছেন.....? খেয়াল করুন। সে চিল্লাচ্ছে]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।