এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-১৬ )

এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-১৬ )
এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-১৬ )

গল্পঃ এম্বুলেন্স রহস্য
পর্বঃ-১৬
লেখকঃ রিয়াজ রাজ
প্রকাশকালঃ এপ্রিল-২০২৩
অনলাইন প্রকাশ
গল্পের বিভাগঃ রহস্য গল্প




-----------------------------------
এইবারে কোনো সমস্যা হয়নি। বগুড়া পেরিয়ে ওরা পঞ্চগড় যায়। লাশ নামায়,রিয়াজ সবাইকে বিদায় দিয়ে আবার ব্যাকও করে। এসবে হয়ে যায় প্রায় বিকেল। পঞ্চগড় থেকে বের হবার আগেই রিয়াজকে কেও পিছন থেকে বলে," কাজটা ঠিক করিস নি"। রিয়াজ হয়ে যায় অবাক,সবাইকে তো নামিয়ে দিলো। গাড়িতে রিয়াজ একাই আছে।তাহলে পিছনে কে। রিয়াজ হুট করে আয়নায় তাকায়,আর দেখে চাদর পড়া সেই বৃদ্ধ লোকটা এম্বুলেন্সের পিছনে বসে আছে। যিনি রিয়াজকে এর আগেও এট্যাক করেছিলো। রিয়াজ সেদিকটাতে তাকাতে তাকাতে করে বসে এক্সিডেন্ট। তাও ইন্সপেক্টর জয়নাল সাহেবের গাড়ির সাথে।

এদিকে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে ইন্সপেক্টর জয়নাল। করিম সাহেবও সাথে ছিলো। রিয়াজ ভেবে নেয়,আজ জেলের ভাত খাওয়াই লাগবে। কিন্তু ব্যাপারটা হয়ে যায় উল্টো। জয়নাল সাহেব এসে বলে, " সরি সরি রিয়াজ ভাই। আমি দেখেশুনে করিনি এক্সিডেন্ট। আপনাকে দেখার খুব ইচ্ছা হলো, তাই খুঁজতে খুঁজতে আপনার কাছে আসা"। সুযোগ পেয়ে রিয়াজ একটু ভাব নিয়ে বলে," তা ঠিক আছে। কিন্তু যদি আজ কিছু হয়ে যেতো আমার?"। জয়নাল সাহেব একটু লজ্জিত চাহনিতে তাকিয়ে বলে,' তার জন্য আমি ক্ষমা চাচ্ছি ভাই। কিন্তু আমাকে এইটা বলুন। আপনি কিভাবে এই পঞ্চগড়ে এলেন?"। উনার কথা শুনে রিয়াজ বলে," কেন,এম্বুলেন্স চালিয়ে এসেছি"। জয়নাল সাহেব একটু কনফিউজড হয়ে,আবার বলে," দেখুন রিয়াজ ভাই। আপনার সম্মন্ধে সব তথ্য আমি বের করেছি। শুনেছি আপনি সাহসী ড্রাইভার। আপনার ভাইও সাহসী ছিলো,কিন্তু এই রোডেই তাকে পঙ্গু করা হয়েছে। তাই আমি ভাবছি,আপনি কিভাবে এলেন। সাথে কোনো তাবিজ এনেছেন?"। উনার কথা শুনে রিয়াজ এইবার সিরিয়াস হয়ে বলে," আমি বুঝিনি। আমার ভাইয়ের সাথে কি হয়েছিলো"। রিয়াজের প্রশ্নে জয়নাল সাহেব অবাক দৃষ্টিতে তাকায়,এরপর বলে, " আপনি জানেন না?"। রিয়াজ মাথা নাড়িয়ে না জানার ইঙ্গিত দেয়। তখন জয়নাল সাহেব রিয়াজকে এই রাস্তা সম্মন্ধে সব বলে। রিয়াজ উনার পুরো কথা শুনে হতভাগ হয়। আর কোনো কথা না বলে, জয়নাল সাহেবকে বিদায় দিয়ে রিয়াজ এম্বুলেন্সে ঢুকে যায়। জয়নাল সাহেব কিছুটা অবাক হয়। উনাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই রিয়াজ এম্বুলেন্সে ঢুকে গেলো। এরপর মাথার মধ্যে এক ঝাঁক রাগ নিয়ে রিয়াজ এগিয়ে যায় সেই বিলে রাস্তায়। কিছুক্ষণ পরেই সন্ধ্যা নেমে আসবে। রিয়াজ বিলের রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলো,কখন তার ওপর অ্যাটাক হবে। সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে না নামতে রিয়াজ এম্বুলেন্স এর কাছে যায়। এরপর এম্বুলেন্স থেকে পানির বোতল টা বের করে পুরো এম্বুলেন্সে পানি ছিটিয়ে দেয়। আর যাই হোক, রিয়াজ অন্তত এইটুকু জানে যে পানি ছিটানোর পর সেই বৃদ্ধ জ্বীনটা রিয়াজের সাথে দেখা করবে।যদি কোনো বিপদ হয়,তবে জ্বীন এসে তাকে বাঁচাবে। এম্বুলেন্সের চারপাশে পানি ছিটানোর পর রিয়াজ রাস্তার পাশে বসে থাকে সেই অশরীরীদের জন্য।

২ ঘন্টা পর....
কোন সাড়াশব্দ পায় না রিয়াজ। তবুও মাথার মধ্যে জেদ এনে রাস্তার পাশে বসে থাকে, সেই অশরীরদের সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার জন্য। এমতাবস্থায় রিয়াজের পিছন থেকে সেই বৃদ্ধ লোক ডাক দিয়ে বলে," লাভ নেই।আসবেনা কেও। তোমার এম্বুলেন্সে এখন লাশ নেই"। বৃদ্ধের কথা শুনে রিয়াজ পিছনে ঘুরে তাকায়। দেখে সেই জ্বীন চলে এসেছে। রিয়াজ উনার কাছে এসে বলে," যদি লাশ তাদের টার্গেট হয়। তাহলে আমার ভাইকে কেনো পঙ্গু করলো"। রিয়াজের কথা শুনে বৃদ্ধ লোকটা বলে," তোমাকেও করতে আসতো। কিন্তু তুমি বোতলের পবিত্র পানি ছিটিয়ে দিয়েছো। এইজন্য ভয়ে তারা আসেনি"। রিয়াজ নিজের বোকামি বুঝতে পেরে কিছুটা লজ্জা পায়। তবুও বৃদ্ধ লোকটাকে বলে," আপনার কাছে আমার একটা রিকুয়েস্ট আছে। রাখবেন? যেহেতু আপনি আমার সর্বদা উপকার করেন। সেই অধিকার থেকে বলবো,এই রাস্তায় যারা আমার ভাইকে পঙ্গু করেছে। তাদের বন্দি করে দিতে পারবেন?"। রিয়াজের কথা শুনে জ্বীনটা হেসে বলে," এখানে একটি জ্বীন রয়েছে। যার উচ্চতা অনেক। এটি আর কেও নয়। চাদর পড়া যে অবয়বকে তুমি দেখতে পাও। তার মূল ঠিকানা এখানে। কাল রাতে লাশ নিয়ে আসার সময় সে তোমার ক্ষতি করতো। আর লাশটাও নিয়ে যেতো। কিন্তু টাঙ্গাইলের পর যে বাড়িতে তুমি এম্বুলেন্সে পবিত্র পানি ছিটিয়েছিলে। সেখান থেকেই তুমি নিরাপদ হয়ে গিয়েছিলে। এইজন্য রাতে সে তোমাকে আক্রমণ করতে পারেনি। ঐ বাজারে তোমাকে ভয় দেখিয়েছিলো এইজন্য, কারণ লাশ নামিয়ে তুমি এম্বুলেন্স ধুয়ে নিয়েছিলে। এতে পবিত্র পানি মুছে গেছে। তাই মাঝ রাস্তায় রাগ নিয়ে সে তোমাকে ভয় দেখাচ্ছিলো। কিন্তু জয়নাল সাহেবের জন্য সেখানেই জ্বীনটা ব্যর্থ হয়। অবশেষে এই রাস্তায় তোমাকে ধরতো। উল্টো তুমি নিজেই পবিত্র পানি ছিটিয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করে যাচ্ছিলে। মূল কথা, নিজের অজান্তে তুমি নিজেকে বাঁচিয়ে নিয়েছো"। রিয়াজ জ্বীনের কথাগুলা শুনে হাবলা হয়ে যায়। তবুও না বুঝার ভান ধরে রিয়াজ বলে," চাদরওয়ালা জ্বীনটার বাসা এখানে হলে,সবখানে কেন তাকে দেখি?"। রিয়াজের প্রশ্নে জ্বীন বলে," ঐ জ্বীনটা হলো তাদের সর্দার,যারা লাশ চুরি করে। আমাদের জাতের মধ্যে,মোট ৩ টা জাতী লাশ চুরি করে। একটা হলো এই চাদর ওয়ালা জ্বীনের বংশ।আরেকটি হলো পিশাচ নামের জ্বীনরা"। এইটুকু বলে বৃদ্ধ থেমে যায়। রিয়াজ বৃদ্ধকে থেমে যেতে দেখে বলে,

- আরেকটা জাতি কারা।
- আরেকটা জাত আছে। যারা শুধু এই দেশে না,পুরো পৃথিবীতে লাশ চুরি করে। কিন্তু ওদের জ্বীন বললেও ভুল হবে। ওদের কোনো জন্মদাতা নেই,আর না ওরা কাওকে জন্ম দেয়। ওরা লাশ চুরি করেনা,ক্ষমতার বলে জিন্দা মানুষকে লাশ বানিয়ে দেয়। তাদের বংশে মোট ৪ জন আছে। এই ৪ জনই পুরো পৃথিবী ঘুরে মানুষ খায়। ( বৃদ্ধের কথা রিয়াজের ঘিলুতে ঢুকেনি। তাই রিয়াজ কথা এড়িয়ে আবার বলে)

- এখন আপনি এই চাদরওয়ালা লোকটাকে থামান।
- আমি চাদর ওয়ালা জ্বীনটাকে বন্দি করতে পারবো। সেই ক্ষমতা আমার আছে। কিন্তু এক সর্দারকে আটকে দিলেও,আরো হাজার সর্দার আসবে। ওদের বংশ বড়। একজনের পর একজন সর্দার হবে।
- হোক,কিন্তু এই চাদর ওয়ালা লোকটা আমার ভাইকে পঙ্গু করেছে। আমার এইটাকেই বন্দি করা লাগবে। এরপর হাজার সর্দার আসুক। তাতে আমার কিছু না।
- মানুষ প্রতিশোধ নেয় মানুষের উপর। আর তুমি নিচ্ছো জ্বীনদের উপর। তোমার সাহস অনেক। এইজন্যই তোমাকে আমরা নির্বাচন করেছি।
- আমাকে নির্বাচন করেছেন মানে?
- আমি কেনো তোমাকে বার বার সাহায্য করেছি বা করতেছি। জানো তুমি?
- না।কেন করেন।

- একজন মানুষের বাচ্চা আমাদের কাছে রয়েছে। যাকে আমরা সেই ছোট থেকে দেখভাল করি। একজন কবিরাজের গোলামি করতাম আমরা। সেই কবিরাজ আমাদের বশ করে মানুষের উপকার করতো। কিন্তু উনার এই কর্মকান্ডে কিছু ভূয়া কবিরাজের ব্যবসায় ক্ষতি যাচ্ছিলো। তারা ষড়যন্ত্র করে আমাদের মালিক আর তার স্ত্রীকে হত্যা করে। তবে মৃত্যুর আগে মালিক আমাদের এই বাচ্চার দায়িত্ব দিয়ে গেছিলো। আমাদের বলে গেছে,বাচ্চাটার সব দেখভাল এবং বিয়েটাও যেনো আমাদের ইচ্ছেতে হয়।বিয়ে দেওয়ার পরেই আমাদের মুক্তি মিলবে,এর আগে না। আমরা জ্বীন,আমরা তো আর মানুষের বাচ্চা পালন করতে পারিনা। তাই মালিকের আদেশ মানার জন্য বাচ্চাটাকে একটা মানুষের দুয়ারে রেখে আসি। উনি বাচ্চাটাকে পালন করলেও,বাচ্চাটা বড় হচ্ছিলো আমাদের ইচ্ছেতে। যে লোকের ঘরে দিয়েছিলাম,সেই লোকের ঘরে অভাব আসতে দিইনি। এইভাবে আজ ১৮ বছর কেটে যায়। এখন আমাদের উপযুক্ত পাত্রের দরকার ছিলো। একজন সৎ ও সাহসী লোক।

- আমি কোন সাইড থেকে সৎ। আমি সিগারেট খাই,নেশা করি

- ওসব তুমি চাইলেই ছেড়ে দিতে পারবে। কিন্তু তোমার ভিতরে একটা জীবন্ত প্রতিভা রয়েছে। ফেনীতে নিয়ে যাওয়া লাশের হত্যাকারীকে যেদিন তুমি খুন করেছো। সেটিই ছিলো তোমাকে নির্বাচন করার কারণ। তোমার রুমে যে বাচ্চা দৌড়াদৌড়ি করেছে। ওটা ঐ মেয়ের পেটে ছিলো। যে জন্মের আগেই মরে যায়। শুধু একটা মেয়ের না,একটা বাচ্চা হত্যার প্রতিশোধ তুমি নিয়েছো।

- আমি কি অজান্তেই সব ঘটিয়ে দিলাম?
- এইজন্যই তো তোমাকে নির্বাচন করা। তুমি অভিনয় করো নি,তোমার ব্যবহার দেখেই তোমাকে আমরা নির্বাচন করেছি।
- তো আপনাদের মেয়ে কই। ওর একটা ছবি দেখান। ( রিয়াজের কথা শুনে জ্বীনটা হেসে বলে)
- কাল তোমার হসপিটালে তাকে পাঠাচ্ছি আমরা। তোমার কালকের ভাড়া তাকে নিয়েই হবে। দেখে নিও। আমাদের দায়িত্বটা শেষ হোক। এরপর আমরা সারা জীবনের জন্য তোমার আর ওর জীবন থেকে চলে যাবো।



চলবে..........?



গল্প- #এম্বুলেন্স_রহস্য ( পর্ব-১৬)
লেখক- #রিয়াজ_রাজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।