এম্বুলেন্স রহস্য (পর্ব-০৬)

এম্বুলেন্স রহস্য (পর্ব-০৬)
এম্বুলেন্স রহস্য (পর্ব-০৬)



গল্পঃ এম্বুলেন্স রহস্য
পর্বঃ-০৬
লেখকঃ রিয়াজ রাজ
প্রকাশকালঃ এপ্রিল-২০২৩
অনলাইন প্রকাশ
গল্পের বিভাগঃ রহস্য গল্প



---------------------------------------
আর ওপাশ থেকে বকুল ভাই বললেন," আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভাবি। রিয়াজ এম্বুলেন্স চালানোর জন্য এসেছে। ওর চাকরি ফিক্সড করে দেওয়া হয়েছে"। কথাটা শুনে ভাবি খুশিতে যেনো আত্মহারা হয়ে যান। জানে শাওন কিছু বলতে না পারলেও শুনতে পায়। তাই তিনি দৌড়ে এসে শাওনকে বলে," হুনছো? আমগো রিয়াজ কাজে গেছে। এম্বুলেন্স চালানোর চাকরি"। কথাটা শাওনের কান অব্দি যেতেই,শাওনের হাত পা থরথর করে কাঁপতে লাগলো।

সকাল বেলার সূর্য উঁকি দেয় বিল্ডিং এর পিছন থেকে। দুই পাশে ইয়া বড় বড় দালানকোঠা। মাঝের গলিতে চায়ের দোকানে বসে আছে রিয়াজ। পরণে একটা থ্রী-কোয়াটার প্যান্ট,আর গায়ে এম্বুলেন্স ড্রাইভারের ড্রেস। এক কাপড়ে বের হয়ে আসা রিয়াজের মনে অনেক আঘাত। কেনো গরীব হয়ে জন্ম নিলো। কেনো হলো বস্তিতে তার ঠিকানা। সামনের বিল্ডিং গুলায় চোখ বুলিয়ে ভাবে," ইসস,যদি আমার এই বাড়িতে জন্ম হতো"। আনমনে কিছু ভাবনা আর আক্ষেপ নিয়ে চায়ের কাঁপে চুমুক দিচ্ছে। বকুল ভাইয়ের বন্ধু বলেছে,আজ রিয়াজকে থাকার জায়গা করে দিবে। যেহেতু রাতে জার্নি করে ভোরে ঢাকা এসেছে। তাই রিয়াজের জন্য তার বস ঘুম আর নষ্ট করেন নি। হসপিটালের ঠিকানা দিয়েছে,যেটার সামনে এখন রিয়াজ বসা। ভোরের এই সূর্যবিলাস গ্রামে অনেক করেছে। কখনো সারা রাত নেশা করার পর,ভোরের সূর্যে ঘুম ভেঙ্গেছে। অথচ এই শহরের সূর্য উঠার নিয়ম আলাদা। শহরে সে আলো দিতে না দিতে,বিভিন্ন মেশিনের শব্দ শুরু হয়। রাস্তার হর্ণ আর মানুষের ব্যস্ত চিৎকার। কে কি বলছে,কিছু বুঝা যায়না। সারা রাত ডিউটি করা সিকিউরিটি ঘুমে হেলেদুলে বের হয়। প্রবেশ করে নতুন লোক। রিয়াজ হসপিটালের দারোয়ানদের চলাফেরা দেখে কিছুক্ষণ। এরপর দোকানদারকে বলে," মামা,একটা সিগারেট দেওয়া যাবে?"। রিয়াজের ডাকে দোকানদার সায় দেন। একটা সিগারেট এনে রিয়াজের হাতে ধরিয়ে দিলো। রিয়াজ সিগারেট জ্বালাতেই,উপস্থিত হয় একজন লোক। মুখ থেকে ধোয়া ছেড়ে রিয়াজ লোকটার দিকে তাকায়। দেখে গায়ে তার মতোই একটা ড্রেস। সম্মান দেওয়ার জন্য রিয়াজ সিগারেট ফেলে দিতে যাবে,তখনি লোকটা বলে," ব্যাপার না। টানো। আমারো অভ্যাস আছে। আর যেহেতু এক সাথে ডিউটি করবো। তাই ফ্রি হওয়াই যায়"। রিয়াজ উনার বয়স অনুমান করেন,কম হলেও ৭০ হবে। বয়সে সিনিয়র। অথচ কথার বাক্য মাধুর্যসাধক। ভাবনার মাঝে লোকটা একটা চায়ের অর্ডার করে। এরপর রিয়াজের পাশে বসে বলতে শুরু করে।

- গাজীপুরে থেকে মাত্র একটা লাশ নামিয়ে দিয়ে এলাম।সারা রাত গাড়িতেই। এই লাশ টানতে টানতে নিজেকেও লাশ মনে হয় এখন। মাঝে মাঝে ভাবি,এই লাশ আর আমাদের পার্থক্য। আমরা চলাফেরা করতে পারি। আর তারা অনুভব করাতে পারে।
- অনুভব? মানে ঠিক বুঝলাম না।
- শুনো তবে। নতুন জয়েন করেছো,এসব জেনে রাখা তোমার দরকার। কিছুক্ষণ আগেই বকুল ভাই আমাকে কল দিয়েছে। বলল শাওনের ভাই জবে এসেছে।তার খেয়াল রাখতাম। যদিও আমি সবারি ভালো চাই। তবে শাওন আর আমি গাঁয়ে গাঁ বন্ধু ছিলাম। বেশ ভালো ছেলেটা। তোমার ভাই সবসময় তোমার কথা বলতো আমাকে। আমার ভাই একদিন অনেক বড় হবে,অনেক টাকা কামাবে। আমাকে দামী খাট কিনে দিয়ে বলবে শান্তিতে আরাম করুন। এইসব বলতো শুধু। সেসব কথা নাহয় পরে জানাই তোমাকে। আপাতত ডিউটি নিয়ে বলি।
- জ্বী বলুন।
- লাশ আর আহত ব্যাক্তির সাথে আজ থেকে তোমার বন্ধুত্ব্ব করতে হবে। কারণ এদের নিয়েই তোমার জীবন। কখনো লাশকে ভয় পাওয়া যাবেনা। মনে করবে,সে তোমার বন্ধু। আবার এইটাও মানতে হবে,লাশের খুব কাছেও রেশারেশি করা যাবেনা। এই লাশ মাঝে মাঝে জীবন্ত হয়ে যায়।
- লাশ জীবন্ত? হা হা হা,কি বলেন এসব।
- রাইট! এইভাবে হেসে উড়িয়ে দিবে। এইটাই শুনতে চেয়েছি। লাশ জীবন্ত হয়না,এইটা বিশ্বাস রাখবা। এইবার যত যাইহোক, লাশকে ভয় পাওয়া যাবেনা। তুমি তোমার কাজে মন দিবে।
- হা,তা তো করবোই।
- আর একটা কথা।
- জ্বী বলুন।
- কখনো রাতে গাড়ি দাঁড় করাবেনা। যত যাই হয়ে যাক।
- কি হবে।
- যেকোনো কিছু। গাড়িতে অস্বাভাবিক কিছু হলেও,তুমি গাড়ি চালাতে থাকবে। যতক্ষণ না লোকালয় চোখে পড়বে,ততক্ষণ গাড়ি দাঁড় করাবেনা। এমনো হবে,পথে অনেকে সাহায্য চাইবে। গাড়ি দাঁড় করাতে বলবে। কিন্তু এম্বুলেন্স ড্রাইভার শুধুমাত্র তাদের রোগীকে নিয়ে যাবে। এ ব্যাতিত রাস্তায় যত বিপদ হোক কিংবা যতই বাধা আসুক। গাড়ি থামানো যাবেনা।
- জ্বী আচ্ছা।
- কিছুক্ষণ পর দুজন ড্রাইভার আসবে। শামিম আর রাকিব। এই দুইজন হসপিটালের মূল বদমাইশ। ওদের এড়িয়ে চলবা। ঐ দেখো,শয়তানদের নাম না নিতেই তারা হাজির।

রিয়াজ গলির দিকে তাকায়। ওপাশ থেকে ড্রাইভিং ড্রেস পড়ে দুজন ছেলে আসতেছে। লোকটা আবার বলে," ঠিক আছে। আমি ওয়াশরুমে যাবো। কিছুক্ষণ পর বস আসবে। কোথাও যেও না"। কথাটা বলে লোকটা উঠে যায়। রিয়াজও সিগারেটে শেষ টান দিয়ে,তা ফেলে দেয়। ততক্ষণে শামিম আর রাকিব এসে উপস্থিত হয়। তারাও চা আর সিগারেট অর্ডার দিয়ে রিয়াজের পাশে বসে। রিয়াজকে জিজ্ঞেস করতে থাকে সব। রিয়াজও ওদের বলে,আজ তার প্রথম ডিউটি। ওরা রিয়াজের কথা শুনে একটু টিটকারি শুরু করলো। শামিম বলল,"তা এসেছো কিভাবে, হেলিকপ্টার নাকি বিমানে "। রিয়াজ স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দেয়," ট্রাকে করে। আমার কাছে টাকা নেই। ঢাকার ট্রাকে উঠে ঢাকায় এসেছি"। কথাটা শুনে রাকিব আর শাওন এত জোরে হাসতে থাকে।যেনো তাদের গলা ফেটে যাবে এখন। হাসাহাসি শেষে শামিম আবার বলে," বাহ,ডিউটিতে এসেছে থ্রী-কোয়াটার পড়ে? হাহাহা। ডিউটির পাশাপাশি ফুটবল খেলবা নাকি"। কথাটা বলে দুজনেই আবার হাসতে শুরু করলো।ওদের হাসি দেখে রিয়াজ দোকানদারকে বলে," মামা,আরেকটা সিগারেট দিবেন?"। দোকানদার রিয়াজের হাতে সিগারেট দিলে রিয়াজ বলে," এরা আমার বন্ধু। আজ থেকে একি সাথে ডিউটি করবো। বিলটা ওদের থেকে নিয়ে নিবেন"। কথাটা বলে রিয়াজ সিগারেট ধরায়। আর সেখান থেকে উঠে হসপিটালের দিকে চলে যায়। রাকিব আর শামিম হা করে তাকিয়ে রইলো। শামিম ধীর স্বরে বলে," শালারে তো মফিজ ভাবছিলাম। এইটা দেখি আমাদের চেয়ে বড় বাটপার "।

হসপিটালের গেটে প্রবেশ করে রিয়াজ সিগারেট এর বাকিটা শেষ করে। ততক্ষণে ঐ লোকটা ওয়াশরুম থেকে বাহিরে এলো। উনি রিয়াজকে আরো কিছু নিয়ম শিখিয়ে দিচ্ছে।
এইভাবে আড্ডায় কেটে যায় ৩ ঘন্টা।এরপর এদের বস আসে। যে ড্রাইভারদের কন্ট্রোল করে। রিয়াজ সহ সবাই উনার সামনে উপস্থিত হবার পর উনি বলে," কালাম ভাই। আপনি রিয়াজকে আজ জামা-কাপড় কিনে দিবেন।আর আপনার বাসাতেই রাখবেন তাকে। টাকা অফিস থেকে নিয়ে যান।সেলারি থেকে কেটে নিবো। আর মর্গে ২ টা লাশ আছে। এগুলা আজ দিনাজপুর নিতে হবে। রাকিব আর শামিমকে ঐ দুইটা লাশের সাথে পাঠাবেন। আপনি আপাতত রেস্ট নিন। সারা রাত গাড়ি চালিয়েছেন"। বসের কথ শুনার পর রিয়াজ জানতে পারে,তার ভাইয়ের বন্ধুর নাম কালাম। বস আদেশ দিয়ে চলে যায় উপরে। কালাম সাহেব রিয়াজকে বলে," নতুন জীবনে পা রাখতে যাচ্ছো। তুমি অপেক্ষা করো। আমি টাকা নিয়ে আসি"। রিয়াজ হ্যাঁ সূচক ইঙ্গিত দেয়। উপরে উঠার আগে আবার কালাম সাহেব দাঁড়িয়ে বললেন," আর ঐ শুন,হ্যাঁ তোরা দুজন। লাশের কাগজপত্র বুঝে নিয়ে ঠিকানায় দিয়ে আয়। কাজে যাতে দেরি না হয়"। কালাম ভাইয়ের কথা শুনে রিয়াজ বুঝে,উনি অনেক সিনিয়র ড্রাইভার। আরো কিছু ড্রাইভার আছে,যাদের ডিউটি ৮ টায়। অর্থাৎ একটু পরেই আসবে।

৫ ঘন্টা পর...
শপিং শেষ করে কালাম সাহেবের বাসায় রিয়াজ যায়। কালাম সাহেব রিয়াজকে সবটা দেখিয়ে দিলো। রুম আর বারান্দা এক সাথে পেয়ে,রিয়াজের খুশিতে নাচতে ইচ্ছে হচ্ছে।সব দেখে রিয়াজ যায় ফ্রেশ হবার জন্য। গোসল সেরে রিয়াজ ওয়াশরুমের বাহিরে আসতেই,দেখে কালাম সাহেব রিয়াজের দিকে ভয়ানক চাহনিতে তাকিয়ে আছে। রিয়াজ ভ্রু-কুচকে কালাম সাহেবকে বললেন," কি ব্যাপার ভাই। এইভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো"। কথাটা শেষ করতেই রিয়াজ দেখে,কালাম সাহেব তার প্যান্টের পিছন থেকে একটা ছুরি বের করলেন। চোখে অনেক রাগ আর হিংস্র চাহনি।যেনো, রিয়াজ উনার বড় কোনো ক্ষতি করে দিলো।

চলবে..........?

গল্প- #এম্বুলেন্স_রহস্য ( পর্ব-০৬)

লেখক- #রিয়াজ_রাজ

[ জানাবেন,আপনার অনুভূতি এখন কেমন।গল্পের কোথায় কোথায় ভয় অনুভব করেছেন।]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।