এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-১৯ ও শেষ )

এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-১৯ ও শেষ )
এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-১৯ ও শেষ )




গল্পঃ এম্বুলেন্স রহস্য
পর্বঃ- পর্ব-১৯ ও শেষ 
লেখকঃ রিয়াজ রাজ
প্রকাশকালঃ এপ্রিল-২০২৩
অনলাইন প্রকাশ
গল্পের বিভাগঃ রহস্য গল্প




---------------------------------------

রিয়াজ ইসরাতের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। নিজেকে কখনো মূর্খ বলতে রিয়াজের গায়ে লাগেনি। কিন্তু ইসরাতের মুখে কথাটা শুনে আজ রিয়াজ উপলব্ধি করে,মূর্খের দাম সামান্য। বলতে গেলে একটুও নেই। ইসরাত ভালোভাবে খেয়াল করে দেখে,রিয়াজের চোখে পানি জমাট বেঁধেছে। ইসরাত রিয়াজের এই হাল দেখে,এক দৌড়ে এসে রিয়াজকে জড়িয়ে ধরে।

কিছুক্ষণ জরিয়ে ধরে থাকার পর,রিয়াজ ইসরাতকে ছেড়ে দেয়। এরপর বলে," দাদি অসুস্থ। তাকে বাসায় নিতে হবে"। রিয়াজের কথা শুনে ইসরাত হাসতে হাসতে বলে," আরেহ দাদি ঠিক আছে। প্রতি মাসে উনার চেকআপ করা লাগে। এম্বুলেন্স লাগেনা,আমি এই কারণে এম্বুলেন্স নিলাম। যাতে আপনাকে কাছে থেকে পাই"।

ইসরাতের কথা শুনে রিয়াজ মুচকি হেসে বলে," রাত হচ্ছে। চলো বাসায় দিয়ে আসি"। ইসরাতও আর কথা বাড়ায়নি। এম্বুলেন্সে উঠে দুজনে গল্প করতে করতে মিরপুর চলে যায়। ইসরাতের বাসার সামনে গাড়ি দাড় করিয়ে রিয়াজ বলে," এইটাই তো"। ইসরাত হ্যাঁ সূচক ইঙিত দেয়। রিয়াজ এম্বুলেন্স থেকে নেমে ইসরাতকেও বের করে। এরপর পিছনের ঢাকনা খুলে দাদিকে বের করে। যেহেতু ৩য় তলায় ইসরাতের বাসা।তাই ইসরাত নিজেই রিকুয়েস্ট করে,দাদিকে উপরে দিয়ে আসার জন্য। রিয়াজ ইসরাতের কথামতো দাদিকে ধরে উপরে নিয়ে আসে।৩য় তলায় বাসার সামনে এসে কলিংবেল দিতেই,ইসরাতের বাবা এসে দরজা খোলে। টাক মাথাওয়ালা একজন লোক। দেখতেও কেমন জানি। রিয়াজকে তিনি মানুষই মনে করেনি। এম্বুলেন্স ড্রাইভার যেনো পথের ফকির। উনি দাদিকে ধরে ইসরাতকে বলে," দরজা বন্ধ করে গোসল করে আয়। এসব লোকদের উপরে তোলার কি দরকার"। উনার কথাটা রিয়াজের একেবারে বুকে যেয়ে লাগে। ইসরাত কিছুটা লজ্জা পায়। তবুও বাবার হুকুম পালন করার জন্য,দরজা বন্ধ করে দেয়। রিয়াজের উঠে যায় মাথায় রক্ত। ওখানে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরায়,আর নেমে আসে নিচে।

এম্বুলেন্সে উঠে রিয়াজ পুরো গতিতে হসপিটালের দিকে রওনা করে। ইচ্ছে করলে,রিয়াজ ঐ টাকওয়ালার মাথা ওখানেই ফাটিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু ইসরাতের জন্য সবটা হজম করে নেয়। অনেকটা ক্রোধ নিয়ে রিয়াজ এম্বুলেন্স চালাতে থাকে।

৪ ঘন্টা পর......

শাহরুখ এসে রিয়াজের পাশে বসে বলে.....

- কি রিয়াজ ভাই? মন খারাপ কেন। তখন থেকে দেখছি সিগারেট খেয়েই যাচ্ছেন।
- কেনো। এতোদিন অন্য কিছু খেয়েছি নাকি।
- না মানে আজ একটু বেশিই খাচ্ছেন।
- হুম
- মেয়েটি কে ভাই। সবাই বলে যাচ্ছে অনেক ভালো মেয়ে পটিয়েছেন।
- আমাকে পটিয়েছে। আমি না।
- তবে আমি অনেক মুভিতে দেখলাম। অশিক্ষিত ছেলেদের সাথে শিক্ষিত মেয়েরা টাইম পাস করে। ওরা নিজেরাই আসে,আবার নিজেরাই চলে যায়।
- এখানে কি মুভি চলে? এইটা বাস্তব জীবন,ওটা মুভি।
- মুভি তৈরি করা হয় বাস্তব জীবন থেকেই।
- এগুলা বলার জন্য এখানে এসেছিস?
- না ভাই। রাগ করেন কেন। মেয়েকে দেখতে নাকি বড়লোক লাগে। আপনিই বলেন। ওরা আপনাকে মানবে? আমি তো বলবো আপনিও টাইম পাস করুন। বিয়ের আশা করিয়েন না। পরে আপনাকে কষ্ট পেতে দেখলে আমাদেরই খারাপ লাগবে।

শাহরুখের কথার উত্তর না দিয়ে রিয়াজ বসা থেকে উঠে যায়। এরপর দোকান থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে কল দেয় কালাম ভাইকে।

পরেরদিন থেকে শুরু হয় রিয়াজের স্টাডি। কালাম ভাইয়ের সাথে আলাপ করে,রিয়াজ কলেজের এডমিশন নিয়ে নেয়। বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে,শুরু করে অনলাইন ক্লাস। এ ছাড়া,ইউটিউব চ্যানেল গুলাতে,বর্ণমালা শিখা শুরু করে। ডিউটি চালাকালিন অডিও শিক্ষা,আর ডিউটি ছাড়া ভিডিও। এম্বুলেন্স চালায়,আর নিজের পড়াশুনায় শ্রম শুরু করে রিয়াজ। যেটি তার বাচ্চাকালে করার কথা,তা এখন ২০ বছর বয়সে এসে করছে। এইভাবে কেটে যায় ৩ মাস।

৩ মাস পর......
রিয়াজের নাম্বারে একটা কল আসে।রিয়াজ কল রিসিভ করতেই বস বলে,' ইসরাতের বাবা তো মারা গেছে। তুমি যে মেয়েকে পছন্দ করো,ওর বাবা। হসপিটালে আসো। আমি চাই,তুমিই তোমার শশুরের লাশ দিয়ে আসো"। কথাটা শুনে রিয়াজ কষ্ট পাওয়ার চেয়ে,সুখ পেয়েছে বেশি। এই টাকলা ছিলো রিয়াজের বাঁধা। সবচেয়ে বড় কথা,টাকলার লাশ রিয়াজকেই নিতে হবে। সেদিন রিয়াজ এতোই হ্যাপি ছিলো যে,লাশ নেওয়ার সময় এম্বুলেন্সে ডিজে গান চালিয়ে দেয়। যদিও শাহরুখ আর রিয়াজ ছাড়া এম্বুলেন্সে ছিলো না কেও।

এইভাবে কেটে যায় আরো কদিন।রিয়াজ আর ইসরাতের প্রেম জমতে থাকে। ইসরাতের বাবার বিজনেস ডাউন হতে থাকে। উনি মরার পর,উনার বিজনেস পার্টনার'রা অনেক কিছু দখল করে নেয়। এতে হয়ে যায় দুর্বল ইসরাতের পরিবার। ইসরাতের মা নামাজী মানুষ। এসব বিজনেস সম্মন্ধেও উনার তেমন আইডিয়া নেই। বিজনেস ডাউন খেয়ে যাওয়ায়,অবশেষে ইসরাতের মা ইসরাতকে নিয়ে উনার বাবার বাড়ি চলে যায়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রিয়াজ ইসরাতের মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। আর উনিও রাজি হয়ে যায়। যেহেতু ছেলে জব করে, আবার পড়াশুনাও চলে। ইসরাতের মা এতে রাজি না হবার কারণ নেই।শুরুতেই বললাম,উনি নামাজী মহিলা। অর্থলোভী না। ছেলে ভালো চায় শুধু।

এদিকে দিন- রাত এক করে রিয়াজ পড়াশুনা চালায়। ইন্টার ১ম বর্ষের পরিক্ষার রেজাল্ট ভালো এসেছে দেখে, কালাম ভাই সহ হসপিটালের সবাই বেশ খুশি হয়। রিয়াজ সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়, সে পড়াশুনায় ফোকাস করবে। এদিকে গ্রাম থেকেও,ভাই ভাবি আর ভাতিজিকে রিয়াজ শহরে নিয়ে আসে। যদিও সংসার তেমন বড় না। তাই রিয়াজ কয়েকটা টিউশনি হাতে নিয়েই সংসার ধরে। এম্বুলেন্স জবের সমান তো পায়না,কিন্তু মাসে টিউশনির ১৫ হাজার টাকা দিয়েই রিয়াজ সংসার চালিয়ে নেয়। এদিকে কালাম ভাই, ইসরাত, শাহরুখ ওরাও মাঝে মাঝে আসে। রিয়াজকে আর্থিকভাবে নানান সাহায্য ওরাও করে যাচ্ছিলো।

ইন্টারে ফাইনাল এক্সাম দিয়ে রিয়াজ আরো ভালো রেজাল্ট এনেছে। এদিকে ইসরাতের মা নিজেই রিয়াজের ভাবির সাথে আলাপ করে। আর রিয়াজ এবং ইসরাতের বিয়েটাও করিয়ে দেয়।
সব ঠিকঠাক থাকলেও,ঐ বছরে রিয়াজের বড় ভাইও মারা যায়। রিয়াজ যেনো কদিনের জন্য প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলো। অবশেষে রিয়াজ নিজেকে শক্ত করে, আর সংসারের হাল ধরে। তবে এইবার একজন না,রিয়াজের সাথে ইসরাতও আছে।

সবি ঠিক ছিলো। কিন্তু একদিন আচমকা রিয়াজের ঘুম ভেঙ্গে যায়। গভীর রাত,রিয়াজ একটু গড়াগড়ি করে ইসরাতকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে যাবে। কিন্তু হাতিয়ে দেখে ইসরাত নেই।
রিয়াজ তাড়াতাড়ি লাইট জ্বালাতেই দেখে,ইসরাত রুমের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক রিয়াজের দিকে তাকিয়ে।

রিয়াজ ইসরাতের দিকে তাকিয়ে বলে," কি ব্যাপার। ওখানে কেন তুমি। আর এইভাবে তাকিয়ে আছো কেনো"। রিয়াজের স্বর শুনা মাত্রই,ইসরাত সেখানেই জ্ঞান হারায়।

পরেরদিন রিয়াজ ইসরাতকে সবটা বলে। কিন্তু ইসরাতের ভাস্যমতে, রাতের কিছুই তার মনে নেই। অর্থাৎ ইসরাত কিছুই জানেনা। রিয়াজ কালাম ভাইকে কল দিয়ে সবটা জানায়। কালাম ভাই হামজার সাথে আলাপ করে জানাবে বলে,কল কেটে দেয়।

তবে কথায় আছে,বিপদ আসলে যেনো তার বংশ নিয়েই আসে। কালাম ভাই আবার কল করে জানায়,হামজা মারা গেছে। রিয়াজ হতাশ হলেও,হাল ছাড়েনি। অন্য একটা কবিরাজের থেকে তাবিজ এনে ইসরাতকে দেয়। কিন্তু ঘুরেফিরে কাহিনী একই। কবিরাজের দেওয়া তাবিজ গলায় রেখেই, ইসরাত গভীর রাতে রুমের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে।

পর পর রিয়াজ অনেক কবিরাজ দেখায়। কিন্তু কেও কোনো সঠিক ফলাফল দেয়নি।

১০ দিন পর..
প্রতিদিনই ইসরাত রুমের মাঝে দাঁড়িয়ে থেকেছে।আর রিয়াজের গলার স্বর শুনে সে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। টানা ১০ দিন পর ঘটে ভিন্ন কিছু। রিয়াজ গভীর রাতে উঠে দেখে,ইসরাত রুমে নেই।অর্থাৎ অন্যদিন তো রুমে থাকে। আজ তাকে রুমেই দেখা যাচ্ছেনা। এই সময় ইসরাত ২ মাসের গর্ভবতী। রিয়াজের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। রিয়াজ এক লাফে উঠে দেখে,দরজা খোলা। দরজার বাহিরে এসে রিয়াজ দেখতে পায়,ইসরাত কয়েকটি তেলাপোকা কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে।আরো কয়েকটি তেলাপোকা ইসরাতের হাতে। রিয়াজকে দেখে ইসরাত দাত বের করে একটা মুচকি হাসি দেয়। এর পরেই অজ্ঞান।

রিয়াজ ভয় পেতে শুরু করে। কয়েকশত কবিরাজ দেখায়। কিন্তু কাজ হয়না। ভার্সিটিতে রিয়াজের ৩জন বন্ধু হয়,রাহুল,আবির আর রোহান। ওদের রিয়াজ কিছু বলতেও পারেনা। যেহেতু নিজের আইডেন্টিটি হাইড রাখে রিয়াজ। এদিকে ইসরাতের অবস্থাও দিন দিন বাজে হতে থাকে।

আরো ১ মাস পর.....
একটি বন্ধ রুম,রুমের ঠিক মাঝে একটি মেয়ে বসে আছে। তার চুলগুলা ছেড়ে দেওয়া। সব চুল মেয়েটার মুখের উপর ঢেকে রাখা। মেয়েটির ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে একটি শয়তান। শয়তানের দেহের উচ্চতা বিশাল। পুরো সিলিং এ শয়তানের মাথা লেগে আছে। মেয়েটি চুপচাপ নিচের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। আউলাঝাউলা চুলে পুরো পাগলের মত লাগছে। এদিকে পিছনে থাকা শয়তানটার চেহারা ছিলো ভয়ানক। যেনো পুরো মুখ তার পুড়ে গেছে।শয়তান পিছন থেকে মেয়েটির দিকে লোভনীয় দৃষ্টিতে তাকায়। এরপর তার বিকৃতরূপ চেহারাটা নড়ে উঠে। মুহুর্তে শয়তানটা তার মুখ খোলে। একদম রবারের মতো তার মুখটা বড় হতে লাগলো। যেনো মেয়েটি পুরো তার মুখে ঢুকে যাবে। দেখতে দেখতে শয়তান এতো বড় হা করেছে,যা সাধারণ একজন মানুষ দেখলে, ভয়ে সেখানেই মারা যাবে। ধীরে ধীরে শয়তানটা তার মাথা নিচের দিকে নামায়। এরপর মেয়েটির মাথা বরাবর শয়তান তার মুখ এনে একটা লোভনীয় শব্দ ছাড়ে। মেয়েটি যেনো কিছুই জানেনা। সে নিস্তেজ হয়ে বসে রইলো। দেখতে দেখতে শয়তান মেয়েটির মাথা তার মুখের ভিতর প্রবেশ করাতে থাকে। মেয়েটির কোনো রিয়েকশন নেই। আস্তে আস্তে শয়তান মেয়েটিকে গিলতে শুরু করলো।
*

*

*


**************** সমাপ্ত****************



[ এই সিরিজ এখানেই শেষ। এম্বুলেন্স রহস্য নিয়ে যা ছিলো। তা এই সিরিজে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ এম্বুলেন্স ড্রাইভারদের জীবন কেমন হয়। শুধুমাত্র সেটির উপর ছিলো এই গল্প। রিয়াজ এখন এম্বুলেন্স ছেড়ে সংসার ধরেছে। এই গল্পের মূর্খ রিয়াজ এখন শিক্ষিত। তাই পরের জীবনটা লেখা হয়েছে সিরিজ-০২ তে।]


গল্প- #এম্বুলেন্স_রহস্য ( পর্ব-১৯ ও শেষ )
লেখক- #রিয়াজ_রাজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।