এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-১০ )

এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-১০ )
এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-১০ )



গল্পঃ এম্বুলেন্স রহস্য
পর্বঃ-১০
লেখকঃ রিয়াজ রাজ
প্রকাশকালঃ এপ্রিল-২০২৩
অনলাইন প্রকাশ
গল্পের বিভাগঃ রহস্য গল্প




-----------------------------------
আশ্চর্যজনকভাবে আবার সেই বাচ্চাটা খাটের নিচ থেকে বের হয়। এবং এক দৌড়ে দরজার কাঠ ভেদ করে বের হয়ে যায়। এইভাবে একের পর এক বাচ্চা খাটের নিচ থেকে বের হচ্ছে,আর দরজার দিকে চলে যাচ্ছে। রিয়াজ ভয়ে জমে গেছে। তখনি রিয়াজের মনে হলো,রুমের কোনায় একটা বিশাল কালো অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে।

রিয়াজ কালো অবয়বটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়। এ ব্যাতিত আর কোনো উপায়ও নেই। হাত- পা নাড়ানোর মত শক্তি রিয়াজের নেই। কালো অবয়বের পুরো শরীর কালো ধোয়ার মতো। সারা দেহে শুধু তার চোখ দুইটা দেখা যাচ্ছিলো। যেটি জ্বলজ্বল করছে। রিয়াজ পুরো চেহারা স্পষ্ট দেখতে চাচ্ছে,তার আগেই সেই কালো অবয়ব সামনে আসতে লাগলো। রিয়াজ এইবার দেখে,সে বের হতে হতে তার দেহ মানুষের মত হতে থাকে। এবং অবশেষে খেয়াল করে,এইটা সেই লোক। যাকে রিয়াজ বিলের মাঝে দেখেছিলো। চাদর গায়ে দেওয়া ঐ লোকটা,যে এক দৌড়ে পালিয়ে গেছে। তার চেহারা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছেনা,চাদর দিয়ে মুখটাও ঢেকে রাখা। রিয়াজ কিছু বুঝে উঠার আগে লোকটা তার চাদর থেকে একটা কাটা মাথা বের করে। আর চোখের পলকে লোকটা সেই কাটা মাথা রিয়াজের দিকে ছুঁড়ে মারে। রিয়াজ এইবার সজোরে এক চিৎকার দিয়ে শোয়া থেকে উঠে যায়।

নেই।
চারপাশে সব ঠিক আছে। দরজা জানালা সবি খোলা । নেই কোনো বাচ্চা,আর নেই কোনো লোক। রিয়াজ পিছন ঘুরে বালিশের দিকে তাকায়,বালিশেও কোনো রক্ত নেই। তবে সারা দেহ রিয়াজের ঘেমে একাকার। রিয়াজ তাড়াহুড়া করে পকেট থেকে ফোন বের করে। আর ঘড়ির টাইম খেয়াল করার পর,রিয়াজের যেনো হুশ উড়ে যায়। সময় এখন বিকেল ০৫:৪২ মিনিট। কখন বিকেল হয়ে গেলো। তারমানে কি সব স্বপ্ন ছিলো? কিন্তু রিয়াজ এটিকে স্বপ্ন মানতে পারছেনা,হুটহাট সব তার সামনেই হলো। এখানে অবিশ্বাস করার মত কিছুই নেই। তবুও সময় বলে দিচ্ছে রিয়াজ ঘুমিয়েছে। এদিকে রিয়াজের চোখেও কোনো ঘুম নেই। যেনো অনেক লম্বা একটা ঘুম সেরে উঠেছে। কোনো কূলকিনারা না পেয়ে রিয়াজ হতাশ হয়। কিন্তু তখনি রিয়াজের চোখ যায় তার পায়ের দিকে। রিয়াজের পায়ে একটা হাতের চাপ।একটা বাচ্চার হাতের চাপ,যেনো কালি মেখে সে রিয়াজের পা ধরেছে। রিয়াজ আবারো চিন্তিত হতে লাগলো। যদি সব স্বপ্নই হয়,তবে পায়ে এই হাতের চাপ কিভাবে এলো।
মাথাটা ঝিম ধরে যায় রিয়াজের। কিছুক্ষণ মাথা ধরে ভাবনা করতে থাকে সে। এমতাবস্থায় রিয়াজের নাম্বারে কল আসে একটা। রিয়াজ মাথা তুলে ফোনে তাকায়,দেখে বসের কল। ফোনটা রিসিভ করার পর ওপাশ থেকে রিয়াজকে বস বলল," একজন রোগীকে আনতে হবে।বেশি দূরে না। চলে আসো"। কথাটা বলে বস কল কেটে দেয়। রিয়াজ বসা থেকে উঠে গামছা হাতে নেয়। এরপর জামা-কাপড় খুলে উলঙ্গ হয়ে চলে যায় ওয়াশরুমে। গায়ে প্রচুর ময়লা,গোসল দেওয়া জরুরী।

সন্ধার কিছুক্ষণ আগে রিয়াজ চলে আসে হসপিটাল। চায়ের দোকানে আসতেই শাহরুখ খানকে দেখতে পায়। সে দৌড়ে এসে রিয়াজকে বলে," ভাই,মাফ করে দেন। কালাম ভাই জানতে পারলে আমাকে প্রচুর বকবে"। রিয়াজ ওর কথা শুনে বলে," কেনো?"। হেল্পার এইবার নরম স্বরে বলে," আপনাকে ভাত দিয়ে আসতে বলেছিলো। গেছিলাম আপনার বাসায় দুপুরবেলা। কিন্তু দরজা এতো জোরে জোরে পিটলাম, আপনার কোনো খবরই ছিলো না। রাগে আমি চলে আসছি। আপনি কেমন ঘুম দিছেন কে জানে। সিকিউরিটি রুমে চলেন। ভাত ওখানে আছে। কালাম ভাই যদি জিজ্ঞেস করে,বলবেন যে দুপুরবেলায় খেয়েছেন আপনি"। রিয়াজ শাহরুখ এর কথা শুনে কিছুটা হাসে। এরপর তার কাঁধে হাত দিয়ে বলে," ঠিক আছে। আমারো প্রচুর ক্ষুদা লেগেছে। চলো"। হেল্পার আর রিয়াজ চলে যায় সিকিউরিটি রুমে। রিয়াজ কাওকে বুঝতে না দিলেও,ক্ষুদায় তার পেটেও যন্ত্রণা হচ্ছিলো।

এদিকে কালাম ভাই হামজা হুজুরের কাছে যান। এই হুজুর অনেক কিছুই জানেন। হামজা হুজুরের সাথে জ্বীন আছে অনেক। ক্ষমতাবল এদিকে তিনি। তবে লোকমুখে শুনা যায়,মানুষের ভালো করেন তিনি। খারাপ কিছুতে কখনো সায় দেয়নি। কালাম সাহেবকে দেখে হামজা হুজুর একটু নড়েচড়ে বসে। কালাম সাহেব উনার সামনে গিয়ে বসতেই হামজা বললেন," যার জন্য এসেছিস। সে তো শত্রু বানিয়ে নিয়েছে। ওর পিছনে ৩টা জ্বীন লেগে গেছে। রক্ষাকবজ ছাড়া তাকে ছাড়া উচিৎ হয়েছে?"। কালাম সাহেব মাথা নিচু করে।কিছু বলার আগে হামজা আবার বলে," আমি জানি তুই সময় পাস নি। কিন্তু ওর পিছু নিয়ে আসলে,হয়তো সে বেঁচে যেতো"। কালাম সাহেব এইবার শান্ত স্বরে বলে," একটা উপায় দিন হুজুর। আপনি তো রিয়াজকে হেল্প করতে পারেন। ঐ ৩টা জ্বীনকে ওর পিছু ছাড়ানোর উপায় নেই?"। হুজুর কিছুক্ষণ শান্ত থাকার পর বলে, " আছে। আমি কিছুই না। আল্লাহ্‌র বাণীর উপর কাজ করি। আর এতে আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় সব হয়। ঐ ছেলেটা সেদিন সূরা পাঠ করেছিলো। যেটি তার জন্য রক্ষাকবজের কাজ করেছে। নয়তো এম্বুলেন্স নিয়ে আর আসতে হতো না তার। পথেই শেষ করে দিতো। আমি একটা রক্ষাকবজ দিচ্ছি। এইটা ওর হাতে বা গলায় বেঁধে দিস। আর বাকি জ্বীনদের জব্দ করার চেষ্টা করতেছি আমি"। কালাম সাহেব কিছুটা খুশি হোন হামজার কথা শুনে। হামজা তার ব্যাগ থেকে একটা তাবিজ কালাম সাহেবের হাতে দেয়।এরপর বলে," আমার এতিম খানায় একটা ছাগল দিস। যা"। কালাম সাহেব হামজাকে সালাম দিয়ে বের হয়ে যান হামজার বাসা থেকে।

এদিকে রিয়াজ খাবার খেয়ে একটু শান্ত হয়।হেল্পার রিয়াজকে বলে," শান্তি তো এইবার?"। রিয়াজ একটা ঢোক গিলে ধীর স্বরে বলে," ভাত খাবার পর একটা চা আর সিগারেট না হলে চলে?"। হেল্পার রিয়াজের কথা শুনে টিফিন বক্সটা গুছাতে থাকে,আর বলতে লাগলো," এটির জন্য আপনার ভাত খেতে হয় নাকি। সবসময়ই তো চা আর সিগারেট লাগে আপনার। চলুন, বাহিরের দোকানে যাই"।
সিকিউরিটি রুম ছেড়ে রিয়াজ আর হেল্পার বাহিরে আসে। চায়ের দোকানটায় বসার সময় রিয়াজ দেখে অনেকগুলা ড্রাইভার এখানে। ওরা দিনে ডিউটি করে। রিয়াজ সবার সাথে পরিচিত হয়ে চা আর সিগারেট খাওয়ায় ব্যস্ত। সব ড্রাইভাররা মিলে একেকজন একেকটা কথা বলে যাচ্ছে। কেও হাসাচ্ছে,কেও পার্সোনাল কথা শেয়ার করছে। রিয়াজ মনোযোগ দিয়ে তাদের কথাগুলা শুনে যাচ্ছে। তখনি রিয়াজের ফোনে কল আসে তার ভাবির। রিয়াজ চায়ের কাঁপ পাশে রেখে ফোনটা রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে ভাবি কান্না করতে করতে বলতে শুরু করে," আমার ছেলেটা তাহলে বড় হয়ে গেছে? কাজে এতোই ব্যস্ত হলো,ভাই আর ভাবিকে ভুলেই গেছে"। রিয়াজ ভাবির ভয়েজ শুনতেই চোখ ভিজিয়ে দেয়। এরপর নরম স্বরে রিয়াজ ভাবিকে বলে," না ভাবি। ধারের টাকাটা যোগাড় করতে কাজে মন দিচ্ছি বেশি। তুমি চিন্তা কইরো না। খুব তাড়াতাড়ি টাকা ম্যানেজ হয়ে যাবে"। রিয়াজের কথায় এইবার ভাবি বলে," সাবধানে কাজ করিস। ( এরপর আর কি,বাজে আড্ডা না দেওয়া ইত্যাদি জ্ঞান দিতে শুরু করলো) "। রিয়াজ ভাবির কথা শুনার মধ্যে হটাৎ কান চলে যায় সামনের একজনের কথায়। অর্থাৎ যে ড্রাইভাররা বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে,তাদের মধ্যে একজন বলে," সেই কালো চাদর দেওয়া লোকটা ভয়ানক বটে"। রিয়াজ ওর কথা শুনা মাত্রই ভাবিকে বলল," ভাবি,আমি তোমাকে পরে কল দিচ্ছি"।

কলটা কেটে রিয়াজ মনোযোগ দেয় সামনের ড্রাইভারের কথায়। সামনের ড্রাইভার বলতে থাকে," এম্বুলেন্স ড্রাইভারদের মানুষ কি মনে করে কে জানে। আমাদের লাইফটা কতটা ভয়ানক। সেটি তো আমরাই জানি। পরশু আমার ব্রেকাফ হলো। প্রেমিকা বলে এম্বুলেন্স ছেড়ে অন্য কিছু করতাম। আমি মতামত দেইনি তাই ব্রেকাফ। এই মেয়ে মানুষগুলা কি বুঝবে আমাদের জীবন কেমন। শখে তো আর আমরা লাশ নিয়ে দৌড়াই না। আমাদের পরিবার সামাল দেওয়া,নিজের খরচ আর ভবিষ্যৎ এর জন্য কামাই করা লাগে। অন্য স্থানে আজকাল চাকরির সুযোগ বা কই। এতো প্যারার মাঝে আবার এই ভূত জ্বীন"। এতটুকু বলতেই সবাই হুড়হুড় করে হেসে উঠে। সবার সাথে রিয়াজও হেসে উঠলো।অথচ রিয়াজ জানেই না,সে কেন হাসছে। তাল মিলানো আরকি। কিছুক্ষণ হাসার পর সেই ড্রাইভার আবার বলে," কালো চাদর ব্যাক্তিটি বহুদিন জ্বালাইছে। একদিন তো গভীর রাতে আমার রুমে এসে গেছে। গলা টিপে মেরে ফেলতে চেয়েছিলো। কিভাবে যেনো আল্লাহ্‌র রহমতে বেঁচে গেছি সেদিন। যত দোয়া জানি সব পড়েছি। শেষমেশ কালাম সাহেবের দেওয়া তাবিজটা হাতে পড়ার পর পিছু ছেড়েছে সে। কিন্তু লাভ কি,লাশ তো ওরা চুরি করতেই চায়"। এতটুকু বলতেই রিয়াজ আচমকা সেই ড্রাইভারকে প্রশ্ন করে," লাশ চুরি করতে চায় মানে?"। সবাই রিয়াজের প্রশ্ন শুনে রিয়াজের দিকে তাকায়।রিয়াজ সবার চাহনি দেখে বলে," এইভাবে তাকানোর কি আছে। আমি নতুন,জানাটা জরুরী"। রিয়াজের কথা শুনে ঐ ড্রাইভার আবার বলে, " কেনো,তুমি আগে কোথাও জব করো নি?"। ওর কথা শুনে রিয়াজ একটু নড়েচড়ে বসে বলে," না,এইজন্যই তো জিজ্ঞেস করলাম"। রিয়াজের কথায় এইবার ড্রাইভার বলে, " এইজন্যই কালাম ভাইকে দেখিনা। উনি নিশ্চয়ই হামজা হুজুরের কাছে গেছে রক্ষাকবজ আনতে। যাইহোক শুনো, এম্বুলেন্স থেকে রাতে লাশ চুরি ওরাই করে। যারা লাশের অপেক্ষায় থাকে। তাদের চোখ থাকে আমাদের এম্বুলেন্স এর উপর। শুধু এম্বুলেন্স না,বিভিন্ন মাছের গাড়ি,গরুর গাড়ি ইত্যাদি। এসব গাড়ি রাতে যখন চলে,তখন পরিবেশ স্বাভাবিক থাকলেও,ওরা স্বাভাবিক থাকেনা। ভয় হোক কিংবা আক্রমণ। যেকোনো একটাতে ওরা লাশ চুরি করতে চায়। রক্ষাকবজ শুধু তোমাকে রক্ষা করবে। কিন্তু তোমাকে রক্ষা করতে হবে সেই লাশকে। যদিও এসব সমসময় হয়না। ওদের রাস্তায় যখনি পড়ে যাবা,তখনি ওরা ধরবে। এদিকটা থেকে সাবধান "। ড্রাইভারের কথা শুনে রিয়াজ পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে বলে," আপনারা কি করেন,যখন তারা লাশ নিতে আসে"। রিয়াজের কথা শুনে পাশের আরেকজন বলে," ফোকাস শুধু রাস্তায় রাখি।মনে মনে যত দোয়া আছে,তা উচ্চারণ করি। পথে যত বাধাই আসুক,কোনোটাই পরোয়া না করে এগিয়ে যেতে হবে"। ড্রাইভার কথাটা শেষ করতেই সেখানে উপস্থিত হয় কালাম ভাই। কালাম ভাইকে দেখে সব ড্রাইভার দাঁড়িয়ে যায়। যেহেতু সবাই উনাকে বড় ভাইয়ের মত জানে,তাই সম্মানের দিকটা উচ্চতর। তিনি এসেই রিয়াজের গলায় সেই রক্ষাকবজ পড়িয়ে দেয়। রিয়াজ কিছু বলার আগেই কালাম ভাই বলে," সাবধানে ডিউটি করো। আমি বাসায় যাচ্ছি। যত যাইহোক, আল্লাহ্‌কে স্বরণ করবা। সাধারণ জনগণ জানেনা আমাদের লাইফে আসলে কি কি হয়। যদি তারা শুনে,তবে মনে করবে এটি শুধুমাত্র বানানো গল্প। তাই এসব কারো কাছে শেয়ারও করবেনা।নইলে হাসির পাত্র হয়ে যাবা। যতো কিছুই হোক,নিজের ভিতর রাখবা। আমি যাই,সকালে দেখা হবে"। কালাম সাহেব কথাটা বলে,স্থান ত্যাগ করে।

সেদিন থেকে শুরু হয় রিয়াজের কাজ। রোগী নেওয়া,আনা সব কিছু।সব ঠিকঠাক চলছিলো। রিয়াজও এই এম্বুলেন্স ড্রাইভিং পেশাটাকে আপন করে নেয়। বকুল ভাইয়ের টাকাটাও শোধ হয়ে যায় অনেক আগে। ব্যাপারটা ছিলো এখানে অন্য কিছু। বকুল ভাই আর রিয়াজের ভাবির প্ল্যান ছিলো সব। বকুল ভাই অনেক আগেই টাকা দিয়ে দিছে তার মালিককে। শুধুমাত্র রিয়াজকে টাকা চেনানোর জন্য বাড়িতে এসে চিল্লাচিল্লি করতো। কিন্তু মুদি দোকানদারের ব্যাবহার ছিলো ভিন্ন। সে ইচ্ছেকৃত রিয়াজের ভাবিকে হ্যারেজম্যান্ট করেছে। তবে যা হয়েছে,ভালো হয়েছে। এক সুযোগে রিয়াজ কর্ম লাইফে ফিরেছে। বেতনের টাকা অগ্রিম নিয়ে,সাথে কালাম ভাই কিছু দিয়ে বকুল ভাইয়ের টাকাটা শোধ করে দেয়। বাড়িতেও রিয়াজ তার স্যালারির অংশ পাঠাচ্ছে,পাশাপাশি কালাম ভাইয়ের টাকাটাও ধীরে ধীরে শোধ করে দিচ্ছিলো। রিয়াজের ভাইও অনেক অসুস্থ। উনার সব খরচ চলে এখন রিয়াজের টাকায়। রিয়াজের ভাবি এখন কারো বাসায় কাজ করতে যায় না। মাসে যে ২০ হাজার টাকা দেয়,তা দিয়ে সংসার দৌড়ে চলে। শহরে থাকা-খাওয়া চলে কালাম ভাইয়ের সাথে রিয়াজের। অর্থাৎ সব কিছুই স্বাভাবিক হয়ে উঠে মাত্র ৪ মাসের মধ্যে। সব ঠিকঠাক চলছিলো। লাশ নিয়ে চলাফেরা করতেও রিয়াজের এখন কোনো সমস্যা হয়না। যেনো ব্যাপারটা নরমাল হয়ে গেছে। কিন্তু সময় এক রকম থাকে বা কই । এই সময়টা তার সময়ে ঠিকি ভয়ানক হয়ে যায়।

৬ মাস পর.......
একটা লাশ নিয়ে নেত্রকোনা যাত্রা করেছে রিয়াজ। পিছনে লাশের পরিবার রয়েছে। আর পাশের বক্সে রয়েছে লাশ। গত ২ মাস এই ছেলেটা ভর্তি হসপিটালে। ২ মাস পর ক্যান্সারে মারা যায়। তাই দাপন করার জন্য তাকে দেশের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। শহর থেকে বেরিয়ে রিয়াজ নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে রওনা করে। গাজীপুর পার করে আগে রিয়াজকে যেতে হবে ময়মনসিংহ। ওখান থেকে নেত্রকোনা তেরি বাজার যেতে হবে। অর্থাৎ সফরটা লম্বা। লাশ নিয়ে বের হয়েছে সন্ধার দিকেই। যেতে যেতে পরেরদিন সকাল হবে। গাজীপুর ছেড়ে যখন রিয়াজ ভালুকা রোডে এম্বুলেন্স ঢুকায়। ততক্ষণে হয়ে যায় গভীর রাত। অর্থাৎ রাত প্রায় ১২:২৩। যদিও এই সময়টা আমাদের কাছে সামান্য। কিন্তু এম্বুলেন্স ড্রাইভারদের কাছে,রাত ৮ টার পরেই গভীর রাত।যেটা শুরু হয় ভয়ের অনুভূতি নিয়ে। ভালুকার রোডে রিয়াজ এম্বুলেন্স চালিয়ে যাওয়ার সময়,আচমকা রিয়াজের মনে হলো এম্বুলেন্স এর ছাদে ধপাস করে কিছু একটা পড়েছে। এতো জোরে শব্দ হয়েছে,যেনো বড় কোনো পাথর পড়লো। এদিকে লাশের পরিবাররা তাকিয়ে আছে রিয়াজের দিকে। রিয়াজ তাড়াহুড়ো করে গ্লাস আটকে দেয়। এরপর একটা সিগারেট ধরিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলে," যত কিছুই হয়ে যাক। আপনারা কেও নড়বেন না। আর না করবেন চিল্লাচিল্লি। শুধু দোয়া পড়তে থাকুন"। রিয়াজের কথা শুনে লাশের পরিবার বিষয়টা বুঝে নেয়। রিয়াজের কথামত সবাই দোয়াদরুদ পড়তে শুরু করে। এদিকে অন্ধকার ভেদ করে শুধু এম্বুলেন্স এর লাইটের আলো রোডে।চারপাশে বড় বড় গাছ। রোডটা দেখতেও ভৌতিক মনে হয়। আশেপাশে ঘর বাড়ি আছে কিনা,সেটিরও কোনো হুদিশ নেই। দুই পাশের গাছগুলা এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে,যেনো রাস্তা পাহারা দিচ্ছে তারা। গাছের ডালগুলাও হেলে আছে রাস্তার উপর। অর্থাৎ গেটের মতো ডান পাশের ডাল,আর বাম পাশের ডাল রাস্তার উপর সাজানো। রিয়াজের কপাল বেয়ে ঘাম বের হতে থাকে। তবুও মনে সাহস রেখে রিয়াজ এগিয়ে যেতে লাগলো।

কিছুদূর যেতেই রিয়াজের চোখ আটকে যায় সামনের একটা গাছের ডালে। অর্থাৎ রাস্তার পাশের গাছ থেকে যে ডালগুলা রাস্তার দিকে ঝুলে আছে। সেই গাছের ডালে একটা কালো কুচকুচে মানুষ ঝুলে আছে। রিয়াজ সেদিকটা দেখতেই চোখ আবার নামিয়ে রাস্তার দিকে নিয়ে আসে। যেটুকু দেখেছে,সেইটুকু খুব স্পষ্ট ছিলো। কালো মানুষটার পুরো শরীর কালো। মুখটা কোনো বিশ্রী চেহারার বাঁদরের মতো। আর চোখ দুইটা পুরো লাল। রিয়াজের ভিতর কম্পন শুরু হয়। এম্বুলেন্স এর গতি বাড়িয়ে রিয়াজ এগিয়ে যেতে থাকে।

আরো কিছুদূর যাবার পর রিয়াজের চোখ যায় রাস্তার মাঝে। প্রায় অনেকটা দূরে রাস্তার মাঝে সাদা কিছু দেখা যাচ্ছে। এম্বুলেন্স এর আলোতে,সাদা বস্তুটা বুঝা গেলেও,আসলে সেটি কি তা জানেনা রিয়াজ। সাদা বস্তুটার দিকে তাকাতে তাকাতে,একটা সময় এম্বুলেন্স সেই সাদা বস্তুটার কাছে চলে আসে। হ্যাঁ,ভুল ভাবেন নি। দাপনের কাঁপন পড়া একটা লাশ রাস্তার ঠিক মাঝে পড়ে আছে। আর লাশের পাশে রয়েছে একটা পরিবার। রিয়াজ ভালভাবে খেয়াল করে দেখে,এইটা সেই পরিবার। যারা রিয়াজের এম্বুলেন্সে আছে। পিছন থেকে তারা রাস্তার মাঝে এলো কিভাবে। কনফিউজড হয়ে রিয়াজ হুট করে পিছনে তাকায়। দেখে লাশের পরিবার দোয়াদরুদ পড়েই যাচ্ছে। অর্থাৎ রাস্তার লাশ আর পরিবার আসল না। ওটা ওদের ধোকা। রিয়াজ এইবার এম্বুলেন্স এর গতি আরো জোরে বাড়িয়ে সে লাশ আর পরিবারের উপর উঠিয়ে দেয়। কিন্তু এতে যেনো তুফান আরো বেড়ে গেলো। এম্বুলেন্স এর ভিতরে থাকা লাশটি,বক্সের ভিতর থেকে নাড়াচাড়া শুরু করেছে। লাশের পরিবার নিজেদের মৃত ছেলেকে বক্সে নড়াচড়া করতে দেখে ভয়ে চিৎকার শুরু করে। এদিকে লাশটি যেনো বক্সে ভেঙ্গে বেরিয়ে আসবে এখন।




চলবে..........?



গল্প- #এম্বুলেন্স_রহস্য ( পর্ব-১০ )
লেখক- #রিয়াজ_রাজ



[ জানাবেন,আপনার অনুভূতি এখন কেমন।গল্পের কোথায় কোথায় ভয় অনুভব করেছেন।]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।