এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-০৫ )

এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-০৫ )
এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-০৫ )


গল্পঃ এম্বুলেন্স রহস্য
পর্বঃ-০৫
লেখকঃ - রিয়াজ রাজ
প্রকাশকালঃ এপ্রিল-২০২৩
অনলাইন প্রকাশ
গল্পের বিভাগঃ রহস্য গল্প




----------------------------------

বকুল ভাই রিয়াজের ভাবিকে বলে," তোর দেবররে ঘর থেকে বের কর। নাহলে এখন দরজা ভেঙ্গে বের করবো। তোর পঙ্গু জামাইরে বাচানোর জন্য সে ৮০ হাজার টাকা নিচে আমার থেকে। শাওনরে বন্ধু আর রিয়াজকে ছোট ভাই ভেবে আমি সাহায্য করেছি। আমার পকেটের ৩০ হাজার বাদ।আরেকজনের থেকে যে ৫০ হাজার ধার নিছিলাম।ওটা দেওয়া লাগবেনা আমার?ওয় বলে ওর কাছে টাকা নাই। ওরে বল ওটা দিতে। নাহলে তোরে সহ পিডামু"। হটাৎ বকুল ভাইয়ের এমন আচরণ দেখে,ভাবি নিজেও অবাক হয়ে যায়...।

বকুল ভাইয়ের চিল্লাচিল্লি শুনে ছুটে আসে বস্তির বাকি লোকজন। ঘটনা শুনতে চাইলে বকুল ভাই সবাইকে সবটা খোলসা করে। একটা সময় পুরো বস্তির লোকও বকুল ভাইয়ের পক্ষ হয়ে যায়। রিয়াজের ভাবি পুরোটা শুনার পর বকুল ভাইকে বলে," ভাই,শাওন তো আপনারি বন্ধু। রিয়াজ ভুল করেছে তা আমরা সবাই মানতেছি। কিন্তু টাকার সংখ্যা তো অনেক বড়। আমাকে একটু সময় দেন বকুল ভাই। আমি ধীরে ধীরে সব শোধ করে দিমু"। রিয়াজের ভাবির কথা যেনো গায়ে লাগলো না বকুল ভাইয়ের। তিনি গা ঝাটকিয়ে তেড়ে আসেন ভাবির দিকে। ভাবি পেয়ে যায় ভয়। বকুল ভাই সোজা ভাবির সামনে এসে আঙ্গুল তুলে বলে," ৭ দিন সময়। ৭ দিনের মধ্যে যদি আমি আমার টাকা না পাই। তবে তোরে ল্যাংটা করে বস্তিতে বেধে রাখবো"। ছুরি আর পিস্তলের আঘাতই যে বুক ছিদ্র করে। তা হয়তো ভুল। বকুল ভাইয়ের এই কথাটা যেনো ভাবির বুক ছিদ্র করে দেয়। চোখ দুটো বন্ধ করে ভাবি কেঁদে যাচ্ছেন,নিরব কান্না।

বকুল ভাই কিছুক্ষণ চিল্লাচিল্লি করে লোক নিয়ে চলে যায়। বস্তির লোকেরাও ভাবির দিকে কেমন একটা নজরে তাকিয়ে আছে। ধীরে ধীরে তারাও হালকা হয়ে থাকে। যে যার ঘরের দিকে চলে যেতে লাগলো। ভাবি মূর্তিমতীর মতো উঠোনেই দাঁড়িয়ে আছে। এর কিছুক্ষণ পর দরজা খোলার শব্দ। ভাবি মাথা তুলে পিছনে তাকিয়ে দেখে,রিয়াজ চোরের মত দরজা খোলে। ভাবির চোখ রিয়াজের চোখ বরাবার পড়তেই, রিয়াজ মাথা নিচু করে ফেলে। ভাবি নিজের চোখের পানি মুছে ধীর পায়ে হেটে যায় ঘরে। রিয়াজ তার ভাবির আগমন দেখে পিছন হেটে দাঁড়ায়। ভাবি চুলার সামনে বসে আবার রান্না শুরু করে। রিয়াজ হাত-পা গুটিয়ে ঘরের কোনায় বসে রইলো। বকুল ভাই যে থ্রেড দিয়েছে, তা গ্রহণীয় নয়। পাশের বিছানাতে শুতে আছে শাওন। হোক সে পঙ্গু। তবুও কান সতেজ। বকুল ভাই অর্থাৎ নিজের বন্ধুর মুখে আসা থ্রেড শাওনের কান অব্দি আসে।প্রকাশ করার জন্য হাত পা তো কাজ করেনা,কিন্তু চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়ছে উনার।

রিয়াজের ভাবি রান্না শেষে চুলা থেকে উঠে। নিজে তো খায়নি,কিন্তু বের হবার আগে রিয়াজকে বলে," আমি কাজে যাচ্ছি।খেয়ে নিয়েন আর ভাতিজিকেও খাওয়াই দিয়েন। শাওনের খেয়াল রাখুন"। বলে ভাবি বের হয়ে যায়। রিয়াজ ভাবির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। আজ হটাৎ তুই থেকে আপনি করে কেন বলল? ভেবে যাচ্ছে রিয়াজ।

ভাবি চলে যাবার পর রিয়াজ চুলার কাছে এসে পাতিল উল্টিয়ে দেখে, সাদা ভাত আর ডাল রান্না করে গেছে। সাথে একটা পেঁয়াজ কেটে রিয়াজ নিজে ভাত খেয়ে নেয়। সাথে শাওন আর ভাতিজিকেও খাওয়ায়।

সারাদিন বাসাতেই দিন কেটে যায় রিয়াজের। সন্ধায় ভাবি বাসায় আসে। হাতে কিছু টাকা দেখা যাচ্ছে। রিয়াজ ভাবির হাতে অনেক টাকা দেখে প্রশ্ন করলো," এতো টাকা কোথায় পাইলেন ভাবি?"। ভাবি কোনো জবাব না দিয়ে আগে এক গ্লাস পানি খায়। এরপর হাতের টাকাগুলা বের করে গুনতে শুরু করে। ভাবির হাতের ভঙ্গি দেখে রিয়াজও গণনা করে,ভাবির হাতে ৩ হাজার টাকা। রিয়াজ চুপ মেরেই বসে রইলো। ভাবি নরম স্বরে রিয়াজকে বলে," আইজ জমিদার মশাইরে বলে কয়ে টাকা গুলা আনছি।আরো ৪৭ হাজার টাকা কই পামু ভাবতাছি। আপনে কিছু একটা করেন ভাইয়া। নইলে হুনলেন তো,৭ দিন পর আইসা আমারে কি করবো বকুল ভাই"। রিয়াজ ভাবির কথাটা শুনে আবারো মাথা নিচু করে ফেলে। তখনি বাসার বাহির থেকে রব্বানি সাহেব উচ্চস্বরে বললেন,' কিরে শারমিনের মা। কইরে। একটু হুইনা যাও"।

রব্বানি সাহেব এই বস্তির দোকানদার। বস্তির গেটে উনার মুদি দোকান রয়েছে। ভাবি উনার ডাক শুনে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। রব্বানি সাহেবের হাতে একটা মদের বোতল। দেহের অঙ্গিভঙ্গি দেখে বুঝা যাচ্ছে মাতাল হয়ে আছে। ভাবি দরজার বাহিরে এসে বলে," কি হইছে ভাইয়া? ডাক দিলেন যে?"। রাব্বানি ভাই মদের বোতল হাতে রেখে,হেলুদুলে ভাবির সামনে আসে। এরপর অস্পষ্ট মাতাল স্বরে তিনি বলতে লাগলেন," তোমার দেবর বলে মাইনষের টাকা নিয়া তোমারে লাগাই দিছে। আমি ২ হাজার টাকা দিমু। আইজ রাইতটা আমার ঘরে চল"। উনার এই কু- প্রস্তাব শুনে ভাবি বলে," ছি রাব্বানি ভাই। আপনি আমার বরো ভাইয়ার মতো। এগুলা কি কইতে..."। ভাবির কথাটা শেষ হতে না হয়ে ঘর থেকে রিয়াজ বাতাসের গতিতে বেরিয়ে আসে। রাব্বানি ভাই কিছু বুঝার আগেই,রিয়াজ সোজা দৌড়ে এসে রাব্বানি ভাইয়ের কলার ধরে,আর নিক্ষেপ করে উঠোনে। এমন দৃশ্য দেখে ভাবি হা হয়ে যায়,যেনো রাব্বানি ভাইকে পলিথিনের মতো ছুড়ে মারলো রিয়াজ। এখানেই শেষ ভেবে ভাবি চুপ রয়,কিন্তু রিয়াজ থামেনি। মাটি থেকে মদের বোতলটা তুলে সোজা আঘাত করে রব্বানি সাহেবের মাথায়। রব্বানি সাহেব ব্যাথায় চিৎকার দিয়ে উঠলে,বেরিয়ে আসে বস্তির সবাই।সন্ধার সময়, হালকা অন্ধকার। এই অপচিকীর্ষা আলোয়ে রব্বানি ভাইয়ের পরিবার উপস্থিত হোন। যখন উনারা দেখলেন,রিয়াজ তাদের লোককে মেরেছে।এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে বাশ লাঠি নিয়ে ছুটে আসেন সবাই। রিয়াজের ভাবি চিৎকার দিয়ে বলে," আরে রিয়াজ করতেছিস কি,ঘরে আয়"। রিয়াজ তার ভাবির কথায় কান না দিয়ে কোমর থেকে ৮০ টাকার বেল্ট খোলে। এরপর সেই বেল্ট নিয়ে দৌড়ে যায় রব্বানির পরিবারের দিকে।

দৌড়ের গতিতে আচমকা রিয়াজ একজনের ঘাড়ে বেল্টের আঘাত করতেই, সাথে সাথে তিনি মাটিতে লুটে পড়েন। মারামারি দেখতে আসা লোকজন লাইট মারতে থাকে ওদের দিকে। সেই আলোতে সবাই দেখে,রিয়াজ যাকে আঘাত করেছে। তার কান ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না দেখে বাকিরা দৌড়ে পালায়। রব্বানির একটা লোকও আর নেই। রিয়াজ তখন ঐ বেল্ট নিয়ে,পিছু নিতে থাকে রব্বানির লোকজনদের দিকে।

৫ মিনিট পর রিয়াজ আবার উঠোনে আসে। এরপর বেল্ট কোমরে লাগিয়ে চিৎকার দিয়ে বলে, " এইটা আমার ভাবি না,আমার মা। যদি কেও আমার ভাবির দিকে কু-নজরে তাকাস। চোখ খুলে হাতে ধরাই দিবো আমি"। রিয়াজের এমন ত্যাড়ামি দেখে বস্তির লোকজন উঠান ত্যাগ শুরু করে দেয়। রিয়াজ ফুলে যেনো রাগে বেগুন হয়ে যাচ্ছে। রিয়াজের ভাবি এইবার রিয়াজের কাছে আসে। এরপর রিয়াজের হাত শক্ত করে ধরে বলে," ঘরে আয় তুই"। টানতে টানতে রিয়াজকে নিয়ে যেতে থাকে ঘরে। রিয়াজ চুপচাপ ভাবির সাথে চলে আসে। ঘরে ঢুকার পর ভাবি দরজা বন্ধ করে দেয়। আর কড়া স্বরে বলে, " আইজ ওদের সাহস দিচ্ছিস তুই। তোর কারণেই ওরা আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিতাছে। তোর ভাইয়ের জন্য সব করেছিস তাইনা? তো বিপদে আবার কেন ফেলছিস? কি লাভ হইলো তোর ভাইকে বাঁচাইয়া। উনার এসব দেখার চেয়ে মরে যাওয়াই তো ভালা" । কথাটা বলে ভাবি রান্নাঘরের দিকে যায়। এরপর একটা বটি হাতে নিয়ে বলে," আমার জামাই এই বেইজ্জতি মাইনা নিতে পারবেনা আমি জানি।

আজ উনারেও মারুম,আর আমিও মরুম"। বলে ভাবি ছুটে যায় শাওনের দিকে। তখনি রিয়াজ দৌড়ে এসে ভাবির পা চেপে ধরে। ভাবি জোরাজুরি করেও রিয়াজের হাত থেকে পা ছাড়াতে পারেনি। কষ্ট আর হাজার মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে ভাবি মাটিতেই বসে পড়ে। এতোদিন নিরব কান্না কেঁদেছে। আজ উচ্চস্বরে ভাবির কান্না বের হচ্ছে। একদম গলা ফাটিয়ে কান্না জুড়ে দেয়। শাওনের মেয়ে ভয়ে তার বাবার পাশে বসে আছে। রিয়াজ ভাবির পা ধরে ক্ষমা চেয়েই যাচ্ছে।


রাত ১০ টা...

রিয়াজ ঘরের কোনায় আবারো হাত-পা গুঁজে বসে আছে। ভাবি বটি হাতে এখনো সেই স্থানে। কিছুক্ষণ স্থীর হয়ে ভাবি বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। এরপর রিয়াজের কাছে গিয়ে বলে," ভাত খাইয়া ঘুমাই পড়। সক্কাল সক্কাল আমার কাজে যাইতে হইবো। দেরি কইরা উঠলে তোর ভাতিজি না খাইয়া থাকবো"। কথাটা বলে ভাবি নিজেই না খেয়ে চলে যায়। শাওনের পাশে কোনোভাবে বাচ্চা নিয়ে গুঁজে শুয়ে যান। শাওনের চোখ দিয়ে,এখনো টিপটিপ অশ্রু বের হচ্ছে। রিয়াজ ঘরের কোনায়,হাত-পা গুঁজে বসেই রইলো।


ভোর ৪ টা...

রিয়াজের ভাবি নামাজের জন্য উঠে বসে। বিছানাতে বসে মাথার চুল বাধতে বাধতে খেয়াল করলেন,রিয়াজ ঘরে নেই। হুট করে ভাবি দরজার দিকে তাকায়। দরজা খোলা। চারদিকে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখে,রিয়াজ নেই। ভাবি বিছানা ছেড়ে উঠে। এরপর দরজার বাহিরে দৌড়ে গিয়ে দেখে,সব শুনশান। রিয়াজের ভাবির মনে ভয় শুরু হয়। রব্বানির পরিবার রিয়াজকে কিছু করে দেয়নি তো? ভয়ে ভাবি নিজের কপালে নিজে হাত দিয়ে সেখানেই বসে পড়লেন। কিন্তু বাহিরে অনেক অন্ধকার, রিয়াজকে খুঁজে বের করতে হবে। ভাবি লাইট আনার জন্য তড়িঘড়ি করে রুমের দিকে যায়। আলমারির পাশে লাইট চার্জে দেওয়া। ভাবি লাইট নিতে গিয়ে খেয়াল করে,শাওনের ড্রেস নেই। অর্থাৎ যে ড্রেস পড়ে শাওন এম্বুলেন্স চালায়। সেটি আলমারি থেকে গায়েব। ভাবি কিছু বুঝার আগেই ভাবির ফোনে কল আসে একটা। ভাবি তড়িঘড়ি করে ফোন হাতে নিয়ে রিসিভ করলেন। আর ওপাশ থেকে বকুল ভাই বললেন," আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভাবি। রিয়াজ এম্বুলেন্স চালানোর জন্য এসেছে। ওর চাকরি ফিক্সড করে দেওয়া হয়েছে"। কথাটা শুনে ভাবি খুশিতে যেনো আত্মহারা হয়ে যান। জানে শাওন কিছু বলতে না পারলেও শুনতে পায়। তাই তিনি দৌড়ে এসে শাওনকে বলে," হুনছো? আমগো রিয়াজ কাজে গেছে। এম্বুলেন্স চালানোর চাকরি"। কথাটা শাওনের কান অব্দি যেতেই,শাওনের হাত পা থরথর করে কাঁপতে লাগলো।




চলবে..........?




গল্প- #এম্বুলেন্স_রহস্য ( পর্ব-০৫)
লেখক- #রিয়াজ_রাজ




[ জানাবেন,আপনার অনুভূতি এখন কেমন।গল্পের কোথায় কোথায় ভয় অনুভব করেছেন। ]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।