এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-০৪ )

এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-০৪ )
এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-০৪ )



গল্পঃ এম্বুলেন্স রহস্য
পর্বঃ-০৪
লেখকঃ - রিয়াজ রাজ
প্রকাশকালঃ এপ্রিল-২০২৩
অনলাইন প্রকাশ
গল্পের বিভাগঃ রহস্য গল্প



--------------------------------------

একজন মহিলা বলে, " আপনার ভাই গতকাল এক্সিডেন্ট করেছে। এখন পঞ্চগড় হসপিটালে ভর্তি। সারা শরীর উনার ক্ষতবিক্ষত। পঙ্গু হয়ে গেছে প্রায়। তাড়াতাড়ি আসুন"। কথাটা শুনেই রিয়াজের হুশ উড়ে যায়। লাউড স্পিকার থাকায়,রিয়াজের ভাবিও কথাটা শুনে ফেলে। আর কি,, শুরু হয় কান্নাকাটি।

কি ভাবছেন,শেষ? না না,ঘঠনা মাত্র শুরু।

কিছুক্ষণ কান্নাকাটি শেষে রিয়াজের ভাবি বোরকা পড়ে নেন। তখনো তিনি কেঁদে যাচ্ছেন। রিয়াজ বসা থেকে উঠে একটা প্যান্ট আর গেঞ্জি পড়ে নেয়। পরনের এই প্যান্ট ধূলাবালিতে ভরা। আজ ৫ বছর হচ্ছে এই প্যান্টের। রঙ উঠে প্রায় জ্বলসে যাওয়া। আর যে গেঞ্জি গায়ে দিলো,এটি ফুটপাত থেকে ৪০ টাকা দিয়ে কেনা। গায়ের সাইজে তো ফিট না,বাচ্চাদের গেঞ্জির মতো। অতএব বুঝেছেন,দরিদ্রতার সীমা পেরিয়ে গেছে এরা। বিছানা থেকে নিজের বাটন ফোনটা বাম পকেটে নিতেই,ফোন ঠুস করে পায়ের কাছে চলে আসে। রিয়াজ আবার ফোনটা নিয়ে ডান পকেটে ঢুকায়। মূলত বাম পকেট ছেঁড়া।

রিয়াজ তার ভাবি আর ৬ বছরের ভাতিজিকে নিয়ে রওনা করে পঞ্চগড় হসপিটালে। বড় ভাই কাজে যাবার আগে ৫০০ টাকা দিয়ে গিয়েছিলো। বাজার করার জন্য। যদিও এই যুগে ৫০০ টাকার বাজার কিছু না। কিন্তু এই ৫০০ টাকার বাজারে তাদের ৪-৫ দিন চলে। বাজার তো করা হয়নি। তা দিয়েই রওনা করা হয়েছে। রাস্তায় ভাড়ার ব্যাপার-স্যাপার থাকে।

বস্তি পেরিয়ে মেইন রোডে আসে ওরা। রিয়াজের ভাবি এক লাইনে কেঁদেই যাচ্ছেন। পরিবারে শুধুমাত্র এই একটা মানুষ তাদের। তার কিছু হয়ে গেলে ভিক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। এখন আপনার মনে প্রশ্ন উঁকি দিবে,রিয়াজ কেনো কাজ করেনা। চলুন, তারা পঞ্চগড় যেতে যেতে আমরা রিয়াজের জীবনী ঘেটে আসি।


রিয়াজের জন্মের ২ বছর পর তার মা-বাবা মারা যান। বস্তির দক্ষিণে একটা ফেক্টরিতে কাজ করতেন উনারা। প্রচুর পরিমাণে গ্যাসের কাজ রয়েছে এখানে। রিয়াজের বড় ভাই,আর রিয়াজকে বাসায় রেখে,প্রতিদিন স্বামী-স্ত্রী কাজে চলে যেতেন। মাসে দুজনের বেতন মিলিয়ে ৮ হাজার হয়ে যেতো। এইভাবে যেতে যেতে চলে আসে সেই দিনটা। যে দিনটা রিয়াজের বড় ভাই কোনোদিন ভুলতে পারবেনা। রিয়াজের বয়স তখন ২ বছর। রিয়াজের বড় ভাই মা,বাবার জন্য খাবার নিয়ে যায় ফেক্টরিতে। রিয়াজ ছিলো বাসায়। রিয়াজের বড় ভাইয়ের নাম শাওন হোসেন। লোকে শান্না বলে ডাকতো। বয়স তখন তার ৮ বছর। মোটামুটি জ্ঞান ছিলো। ভাতের বক্স নিয়ে শাওন ফেক্টরির গেটে আসতেই,আচমকা একটা বিষ্ফোরণের শব্দ ছড়িয়ে পড়ে। শাওন ভাতের বক্স নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। দারোয়ান সহ কয়েকজন দৌড়ে পালাচ্ছে। ফেক্টোরিতে কাজ করা আরো অনেক কর্মী জান বাঁচাতে দিক-বেদিক হয়ে দৌড়াচ্ছে। ফেক্টরির ঠিক মাঝে আগুন ধাউ ধাউ করে জ্বলছে। সবাই দৌড়ে পালাচ্ছে বাহিরে। শাওন এক পা দুই পা করে ভিতরে যাচ্ছিলো। তার মা,বাবা ভিতরে। শাওনের সারা দেহ তখন শীতল হয়ে যায়। ধীরে ধীরে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে আরো। শাওন তার মা,বাবাকে খোজার জন্য ধীর পায়ে ফেক্টরিতে যেতে থাকে। কিছুদূর যেতেই একজন মুরুব্বী শাওনকে ঝাপটে ধরে। শাওনের হাত থেকে পড়ে যায় ভাতের বক্স। লোকটা শাওনকে বাঁচানোর জন্য কোলে নিয়ে পালাতে থাকে। শাওনের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। আলাভোলা হয়ে ফেক্টরির আগুন দেখে যাচ্ছে। ধাউ ধাউ করে উঠা সেই জ্বলন্ত আগুনে শাওনের মা,বাবা পুড়ে যায়। শাওনকে যখন গেটের বাহিরে এনে দাঁড় করায় মুরুব্বী। তখনো শাওন সেই আগুনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট এসে আগুন নিভাতে শুরু করে। লাভ হয়নি,ততক্ষনে সব পুড়ে হয়ে যায় ছাই। শাওন এই ছাইয়ের মাঝেও তার মা,বাবার অংশ খুঁজে পায়নি। যেহেতু সব ছাই হয়ে গেছে,কার লাশ কোনটা। সেটি বের করা মুশকিল ছিলো। শাওন ছাইয়ের উপর দাঁড়িয়ে শুধু মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। তখনি শাওনের পাশে একজন মুরুব্বী এসে ফোনে চিল্লাতে থাকে। শাওন সেই লোকের দিকে তাকিয়ে রইলো।


এক ফোঁটা চোখের পানি পড়েনি শাওনের। ভিতরে শাওন হয়তো এক একটা চিৎকার দিয়েছে,যা কারো কান অব্দি যায়নি। ভিতরে সে পুরো ভেঙ্গে তছনছ হয়। কিন্তু বাহিরে কিছুই বুঝা যায়না। শান্ত ছেলের মতো সেই জায়গা ত্যাগ করে চলে আসে বাড়িতে। ছোট ভাই রিয়াজ তখন বিছানায় কান্না করে যাচ্ছিলো। শাওন ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে ধীর স্বরে বলল," কাঁদিস না। তোর বড় ভাই এখনো বেঁচে আছে"।সেদিন থেকে চায়ের দোকান শুরু করে ইটখোলার কাজ অব্দি বাদ রাখেনি শাওন। ছোট ভাইকে দুই মুঠ ভাত মুখে তোলার জন্য যুদ্ধে লেগে যায় শাওন। নিজের হাতে ভাইকে লালনপালন করে বড় করতে থাকে। পকেটে বাড়তি টাকা নেই,তাই স্কুল থেকে বঞ্চিত হয় রিয়াজ। কিন্তু দুই মুঠ ভাত মুখে শাওন তুলেই দিতো। রিয়াজের জ্ঞান হবার পর রিয়াজ তার ভাইকে একদিন বলে," ভাইয়া,আমিও কাজ করবো আপনার সাথে। আপনি একা এতো কষ্ট করলে আমার সহ্য হয়না"। সেদিন এই কথাটা শুনে শাওন নিজেকে এতো লাকি মনে করেছে। যা মুখে বলার ভাষায় নেই। ছোট ভাই তার শ্রমকে উপলব্ধি করেছে,এর চেয়ে বড় আর কি। শাওন দেয়নি রিয়াজকে কাজ করতে। অনেক অনেক টাকা না থাকায় হয়তো কোনোদিন রেষ্টুরেন্টে নিতে পারেনি। না পেরেছে কোনোদিন দামী জামা কিনে দিতে। আর না পারলো স্কুল,কলেজে পড়াতে। কিন্তু কোনোদিন ভাতের কষ্টটা দেয়নি। এমনো দিন গেলো,শাওন নিজে ৩-৪ দিন খায়নি। কিন্তু ছোট ভাইয়ের মুখে খাবার এনে দিয়েছে। দিন মুজুরির কাজ তো প্রতিদিন থাকেনা। মাঝে মাঝে কাজে গ্যাপ যায়। এই সময়টাতে শাওন নিজে উপাস থাকতো।


এলাকার কিছু বখাটে ছেলে প্রায় রিয়াজকে ডাকতো বাহিরে। তাদের সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে রিয়াজ সিগারেট হাতে নেয়। যদিও এইটা শাওন জানতো না। ভাইকে তো বাড়িতে রেখে আসতো।খবর রাখা হতো না তেমন। এদিকে রিয়াজ বখাটে ছেলেদের সাথে মিশে নেশা শুরু করে। সিগারেট থেকে গাঁজা, এরপর ইয়াবা। ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছিলো আরো বড় ক্ষতির দিকে।

একদিন বস্তির বটতলায় নেশা করা অবস্থায়, বকুল ভাই দেখে নেয় রিয়াজকে। এই বস্তিতে বকুল ভাইয়ের সাথে শাওনের গায়ে গা সম্পর্ক। ব্যাপারটা সে শাওনের কাছে পরেরদিন জানাবে ভাবে।

পরেরদিন যখন শাওন কাজে আসে,তখন বকুল ভাই শাওনকে বলে,' আজ তোর ভাইডারে দেখলাম নেশা করতেছে। আমগো পলাশ আর সিয়াইম্মার লগে। এমনে চললে তো রিয়াজও বখাটে হইয়া যাইবো ওগো মতো"। শাওন কথাটা শুনে নিরাশ হয়ে যায়। বকুল ভাই আবার বলে," আমার এক পরিচিত লোক আছে। যদি আমারে কস তো তোর ভাইরে কাজে লাগাই দিমু। ড্রাইভিং শিখা লাগবো শুধু"।


ব্যস,শাওন কিছু না ভেবে নিজেই বকুল ভাইয়ের কাজটায় লেগে যায়। ড্রাইভিং শিখে হাতে নেয় একটা ট্রাক । রিয়াজের বয়সও দিন দিন বাড়ছে। ট্রাক ড্রাইভিং করে মোটামুটি কিছু টাকা শাওন পেতো। কিন্তু রিয়াজ তো নেশায় বিগড়ে যাচ্ছে। এইসব ভেবে শাওন বিয়ে করে একটা মেয়েকে। যে রিয়াজকে নজরে রাখবে। সেদিন থেকেই রিয়াজ সোজা। তার ভাই এমন একটা বউ আনছে,যে রিয়াজকে উঠতেও বকা দেয়।আবার বসতেও বকা দেয়। রিয়াজ ভাবির জ্বালায়, অর্থাৎ বকাবকি থেকে বাঁচতে আর যায়নি নেশা করতে। তবে ঐ সিগারেট, সেটি ছাড়তে পারেনি।

দিন যায়,রিয়াজের ভাতিজি হয়। কিন্তু রিয়াজ কাজ না করতে করতে,এখন এতোটাই অলস যে। কাজের প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট নেই ।প্রাপ্ত বয়স হবার পর শাওন রিয়াজকে ড্রাইভিং শিখায়। ট্রাকেও তুলে দেয়। কিন্তু ২-৩ দিনের মাথায় রিয়াজ বাসায় এসে আর যায়না। কাজ নাকি তার ভালো লাগেনা।শিক্ষাগত যোগ্যতাও নেই যে কোনো চাকরিতে দিবে। শাওন বুঝে,আদর করতে করতে অলস বানিয়ে ফেলছে। তাই উপায় না পেয়ে,নিজেই খাটতে শুরু করেন।শাওনের বাচ্চার যখন ১ বছর। তখন শাওন ট্রাক ছেড়ে এম্বুলেন্স ধরে। বেতন মাসে ২১ হাজার। যেটা শাওনের জন্য অনেক। পরিবার অনাহারে ভোগেনি।টেনেটুনে সংসার চলতো। এম্বুলেন্স চাকরির আজ ৫ বছর। এখন শাওনের সাথে কি হলো,তা তো পূর্বে জেনেই এসেছেন।

রিয়াজ আর তার ভাবিও পঞ্চগড় এসে গেছে। চলুন বর্তমানে ফিরে যাই।


সবাই হসপিটাল এসে খোঁজ নেয় শাওনের। icu তে ভর্তি শাওন। রিয়াজ আর তার ভাবি ছুটে যায় icu তে। এবং রুমে প্রবেশ করতেই তারা যা দেখে,তা ছিলো ভয়াবহ।

শাওনের সারা দেহে ব্যান্ডেজ। চেহারা চেনা যাচ্ছেনা। মুখে অসংখ্য নখের দাগ। পা দুইটাতেই ব্যান্ডেজ করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে,চোখ দুটি নাড়ানো ছাড়া শাওনের দেহের কোনো অঙ্গ কাজ করছেনা। রিয়াজের ভাবি দৌড়ে এসে শাওনকে জড়িয়ে ধরে। আর কান্না জুড়ে দেয়। নার্স এসে রিয়াজের ভাবিকে শান্ত করায়। তখনি পেছন থেকে একটা লোক এসে রিয়াজের ভাবিকে বলল," নমস্কার দিদি"। রিয়াজ পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখে,একজন হিন্দু ব্যাক্তি প্রবেশ করেছে। তিনি একটু সামনে এগিয়ে আসতে আসতে বলল," দিদি,আমার নাম নিমাই চন্দ্র দেবনাথ। আপনার স্বামী রক্তাক্ত অবস্থায় আমাদের বাড়িতে আসে। সাথে যারা ছিলো,সবাই ছিলো রক্তাক্ত। আমরা সবাই এনাদের লোকাল ডাক্তার দেখাই আগে। ডাক্তার বলে শরীরের অবস্থা মারাত্মক। তাই হসপিটালে আনতে । ডাক্তারের কথায় আমরা তখনি উনাদের নিয়ে বের হই। কিন্তু বুঝিনি,এইরকম কিছু ঘটবে আমাদের সাথে "। এতটুকু শুনে রিয়াজের ভাবি নিমাই চন্দ্রের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকায়। লোকটার কথার মধ্যে একটা ভয় দেখা যাচ্ছিলো। লোকটা আবার বলতে শুরু করে," বাড়ি থেকে বেরিয়ে যখন রাস্তায় আসি। তখন আমাদের পরিচিত কয়েকজন সিনএনজি ড্রাইভার আসে। গাড়িতে উঠিয়ে আমরা সহ হসপিটাল রওনা করেছিলাম। কিন্তু অর্ধেক রাস্তায় আসতেই দেখি,আমাদের গাড়ির সামনে বিশাল দেহের একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। উনার মাথাটা যেনো আকাশ ছুঁয়ে গেছে। ভয়ে সিনএনজির ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে ফেলে। আমরাও ভয়ে দিক-বেদিক হয়ে গাড়ি থেকে নেমে দৌড় দিছিলাম। পিছনে এসে এলাকার আরো কিছু মানুষ নিয়ে ছুটে যাই গাড়ির দিকে। কিন্তু তখন ঐ অশুভ শক্তিকে দেখিনি আমরা। ভেবেছি সব ঠিক হয়ে গেছে। তবে ভুল ছিলাম,গাড়িতে এসে দেখি আপনার স্বামী সহ বাকি যারা ছিলো। সবার পা বেঁকে আছে। আর চেহারাতে অনেক আঘাত। বুঝতে বাকি রয়নি এসব কে করেছে। ততক্ষনে হয়ে যায় সকাল। এরপর আমরা আপনার স্বামীকে ভর্তি করাই এখানে। এখন আমার বিদায় নেওয়ার সময়,নমস্কার দিদি"।


কথাটা বলে যখন লোকটা চলে যাবে,তখনি রিয়াজ লোকটার কাছে গিয়ে ধন্যবাদ জানায়। লোকটা মুচকি হেসে বলে," না না দাদা। এসব কি বলছেন। আমরা হিন্দু,আপনারা মুসলিম। সেটি আমাদের ধর্মানুসারী হিসেবে।কিন্তু আমরা সবাই তো মানুষ। আমাদের রক্তে লেখা নেই আমরা হিন্দু,আর আপনার রক্তে লেখা নেই আপনি মুসলিম। মানুষের পাশে পশুরা দাঁড়াবে না। আমরা তো আর পশু নয় দাদা। আসি,ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুক" কথাটা বলে লোকটি ত্যাগ করে রুম।

রিয়াজ লোকটার যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। ততক্ষণে নার্স এসে রিয়াজকে বলে," আপনি আমার সাথে আসুন। বিল পরিষদ করতে হবে"।

রিয়াজের মাথায় আগুন জ্বলে উঠে। কে জানে কত বিল। পকেটে ৫০০ থেকে আর ১৪০ টাকা আছে। হসপিটালের লোক জানলে তো কেলাবে। তবুও মনে সাহস সঞ্চার করে রিয়াজ নার্সের সাথে যায়। নার্স রিয়াজকে নিয়ে চলে যায় ডক্টরের কাছে। ডক্টর রিয়াজের হাতে বিলের কাগজ দিয়ে বলে," ৮১ হাজার টাকা বিল এসেছে।বাহিরে পরিষদ করে আপনার ভাইকে নিয়ে যান"। বিলের কাগজের দিকে তাকাতেই রিয়াজের হুশ উড়ে যায়। ৮১ হাজার টাকা? কোনোদিন এতো টাকা একসাথে চোখেও দেখেনি। ব্যবস্তা করবে কিভাবে। এদিক-সেদিক তাকিয়ে রিয়াজ মিনমিন করে ডক্টরকে বলে," না মানে স্যার এ,, এ,,,এতো টা,,টা,,ক্কা এতো টা,"। রিয়াজের এমন তোতলানো দেখে ডক্টর বলে, " বুঝেছি। যান ব্যবস্থা করে নিয়ে আসুন"। রিয়াজ ডক্টরের কথা শুনে থতমত খেয়ে বলে, "জ্বী জ্বী স্যার। আমি আনতেছি"।


রিয়াজ আর তার ভাবিকে কিছু বলেনি।বাহিরে এসে কল দেয় পলাশকে। পলাশ কল ধরতেই রিয়াজ তাকে সব বুঝিয়ে বলে। কিন্তু ৮১ হাজারের কথা শুনতেই পলাশ কল কেটে দেয়। নেটওয়ার্ক প্রব্লেম ভেবে রিয়াজ আবার কল দেয়। এইবার ফোন বন্ধ পলাশের। উপায় না পেয়ে রিয়াজ সিয়ামকে কল দেয়। সিয়ামকেও সবটা বলার পর সিয়াম বলে," পাগল হইছত? ৮১ হাজার টাকা আমার বাপে কোনোদিন দেখছে? আমার কাছে ২ হাজারের বেশি এক টাকাও নাই। তাও এগুলা দিয়া আজ ইয়াবা খাবো। রাখতো..? "। বলে কল কেটে দেয়।

সিয়ামের কথা শুনে রিয়াজ থমকে যায়। এদের সে বন্ধু ভাবতো। আজ তাদের রুপ দেখা হয়ে গেছে। রিয়াজ এইবার ডায়াল করে বকুল ভাইয়ের নাম্বার। বকুল ভাই সবটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ থাকে। এরপর বলে, " আমার কাছে তো এতো টাকা নেই বাবা? জমানো ৩০ হাজারের মতো আছে। বাকি ৫০ হাজার আমি আমার মালিকের থেকে ধার নিতে পারি। কিন্তু ওটা ২ মাসে ক্লিয়ার করে দিতে হবে। আমি ২ মাসে ৫০ হাজার কোথায় পাবো বাবা। বেতন তো মাসে ১৮ হাজার। পরিবার চলতেও ঝামেলা হয়"। বকুল ভাইয়ের সবটা শুনে রিয়াজ বলে," ২ মাসে আপনাকে আমি দিবো ৫০ হাজার টাকা । তবুও আমার ভাইকে বাঁচান চাচা "। রিয়াজের কথা শুনে বকুল ভাই বলে," তুই কোথায় পাবি টাকা। তুই তো কাজই করস না"। রিয়াজ বকুল ভাইয়ের কথা শুনে নরম স্বরে বলে," চাচা,আমি কাল থেকে কাজে নামবো। টাকার চিন্তা করতে হবেনা। আমি বলছি তো চাচা,টাকা আমি দিবোই"।


যাক,অবশেষে টাকার ব্যবস্থা হয়। বকুল ভাই ৫০ হাজার ধার,আর নিজের ক্যাশ মিলিয়ে ৮০ হাজার করে। ডাক্তারকে বলে কয়ে ৮০ হাজার দিয়ে,নিয়ে আসে শাওনকে। রিয়াজের ভাবি জানেনা রিয়াজ কিভাবে ৮০ হাজার টাকা ম্যানেজ করেছে। উনি দৌড়ে এসে রিয়াজকে জড়িয়ে ধরে। এরপর কান্না করতে করতে বলল," তোরে আমি কোনো সময় দেবর ভাবিনাই।আমার সন্তানের মত ভাইবা আসছি রিয়াজ। আমার সন্তানের মতো শাষণ করেছি তোরে। তুই তো আমার বড় ছেলে। কিন্তু ভাবিনাই তুই তোর ভাইরে এতোটা ভালোবাসিস। কিভাবে পারলি এতো টাকা ম্যাইনেজ করতে"। কথাগুলা বলে অঝোরে কাঁদতে লাগলেন তিনি। রিয়াজ চোখের পানি মুছে মুচকি হেসে বলে," টাকা না দিলে তো ঐ ডাকাত ডাক্তার ভাইকে ছাড়তো না। ব্যবস্থা করতেই হয়েছে। আর ওটা ম্যাইনেজ না,ম্যানেজ। ভাষাটা তো শিখো ভাবি"। রিয়াজের কথা শুনে বকুল ভাই সহ সবাই হাসতে লাগলেন।


২ মাস ১ দিন পর........

সকাল সকাল বকুল ভাই রিয়াজদের ঘরে আসে। শাওন এখনো সেই পঙ্গু। রিয়াজ তার ভাতিজীকে নিয়ে খেলা করছে। বকুল ভাই এসে বলে, " কিরে রিয়াজ? টাকা কই? ২ মাসের মধ্যে দেওয়ার কথা ছিলো। মালিক আমাকে আজ ইচ্ছেমত বকাঝকা করে গেছে"। রিয়াজ বকুল ভাইয়ের কথা শুনে বলে," ওহ আচ্ছা"। বকুল ভাই পুরো অবাক। রিয়াজের যেনো গায়েই লাগেনি ব্যাপারটা। বকুল ভাই চিৎকার করে বলে এইবার," তোর ভাবি কই"। রিয়াজ ভাতিজীর সাথে খেলতে খেলতে বলে," কাজে গেছে"। রিয়াজের কথা শুনে বকুল ভাই বলে," কাজে মানে? কিসের কাজ?"। রিয়াজ আবার স্বাভাবিক ভাবে বলে," বস্তির পিছনে যে জমিদার বাড়ি আছে। তাদের বাড়িতে কাজের বুয়া হিসেবে চাকরি করে"। বকুল ভাইয়ের এইবার মাথায় রক্ত উঠে যায়। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলে," ছিহ! তোর কি লজ্জা নাই? ঘরের মহিলাকে মানুষের বাড়িতে পাঠাস কাজ করার জন্য। আর তুই এইডারে চাকরি কস? তুই ঘরে কেন বসে আসিস?"। বকুলের কথা শুনে রিয়াজ চোখ রাঙ্গিয়ে বলে," তাতে আপনার কি? আপনার বলা শেষ? যান এইবার"। বকুল ভাই যেনো রাগে ফেটে যাচ্ছে।তিনি আরো উচ্চস্বরে বলে,

- তো আমার টাকা কোথায়?

- নাই

- নাই মানে? ধার নিয়েছি ওটা আমি। তোর ভাইয়ের জন্য। তুই নিতে বললি। এখন নাই মানে কি?

- হ্যাঁ দিবো বলেছি। কিন্তু নেই তো আমার কাছে। আমি কিভাবে দিবো।

- আরে তুই কি বলদ নাকি রে। অশিক্ষিতের ঘরের অশিক্ষিত। কিসব বলছিস তুই। তুই তো বললি তুই কাজ করবি। এখন ঘরে বসে কেন?

- ভালা লাগেনা ওসব কাজ ফাজ। আমি ঘরেই ভালো আছি।

- কু**বা*** তো আমার টাকা কে দিবে?

- আমি কি জানি।

- আমি আগামীকাল আসতেছি। যদি টাকা না পাই। তো তোর ঘর দুয়ার ভেঙ্গে শেষ করে দিবো দেখিস তুই। আর ঐ শাওনের বাচ্চা। কোন বালরে খাওয়াইয়া বড় করছত। মাথার তার সব ছেঁড়া এইটার। সব দোষ তোর বাই*দ।


বলে বকুল ভাই চলে যান। কালকে আসবে আবার। রিয়াজ বকুল ভাইয়ের যাওয়া দেখে মনে মনে বলে, " এহ,, ঘর ভাঙ্গবে। আসিস,ঠ্যাং ভেঙ্গে কাঁধে তুলে দিবো"। এইটা বলে আবার ভাতিজীর সাথে খেলতে থাকে। শাওনের চোখ দিয়ে তখন শুধু পানি গড়াচ্ছিলো।মনে পড়ছে সেই দিনের কথা,যখন রিয়াজ বলে," ভাইয়া,আমিও কাজ করবো আপনার সাথে। আপনি একা এতো কষ্ট করলে আমার সহ্য হয়না"। তখন যদি রিয়াজকে কাজ শেখাতো। আজ এই দিন দেখতে হতো না। শাওনের পুরো দেহ অচল।কথাও বলতে পারেনা। চোখ দুইটা শুধু নাড়াতে পারে,তাও সেই চোখে পানি।


পরেরদিন সকাল.....

বকুল ভাই কয়েকজন মানুষ নিয়ে আসে শাওনের ঘরে। রিয়াজ বারান্দায় বসে সিগারেট টানতেছে। এতোগুলা লোক দেখে,সিগারেট ফেলে রিয়াজ এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে যায়। আর দরজা বন্ধ করে দিয়ে ভাবিকে বলে," ভাবি,বকুল চাচা আমাকে মারতে আসতেছে"। রিয়াজের ভাবি রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে বলে, " কেনো? কি হইছে? । দেখি আমি, সর তো"। কথাটা বলে ভাবি দরজা খুলে বাহিরে আসে। তখনি সেকেন্ডের মাথায় রিয়াজ দরজা বন্ধ করে দেয় আবার। ভাবি নিজেও অবাক। ভাবিকে বের করে রিয়াজ আবার ঘরে লুকালো কেন। বকুল ভাই রিয়াজের ভাবিকে বলে," তোর দেবররে ঘর থেকে বের কর। নাহলে এখন দরজা ভেঙ্গে বের করবো। তোর পঙ্গু জামাইরে বাচানোর জন্য সে ৮০ হাজার টাকা নিচে আমার থেকে। শাওনরে বন্ধু আর রিয়াজকে ছোট ভাই ভেবে আমি সাহায্য করেছি। আমার পকেটের ৩০ হাজার বাদ।আরেকজনের থেকে যে ৫০ হাজার ধার নিছিলাম।ওটা দেওয়া লাগবেনা আমার?ওয় বলে ওর কাছে টাকা নাই। ওরে বল ওটা দিতে। নাহলে তোরে সহ পিডামু"। হটাৎ বকুল ভাইয়ের এমন আচরণ দেখে,ভাবি নিজেও অবাক হয়ে যায়...।




চলবে..........?




গল্প- #এম্বুলেন্স_রহস্য ( পর্ব-০৪)
লেখক- #রিয়াজ_রাজ




[ জানাবেন,আপনার অনুভূতি এখন কেমন।গল্পের কোথায় কোথায় ভয় অনুভব করেছেন।]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।