এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-০১ )

এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-০১ )
এম্বুলেন্স রহস্য ( পর্ব-০১ )


গল্পঃ এম্বুলেন্স রহস্য
পর্বঃ-০১
লেখকঃ - রিয়াজ রাজ
প্রকাশকালঃ এপ্রিল-২০২৩
অনলাইন প্রকাশ
গল্পের বিভাগঃ রহস্য গল্প




- স্যার মাইয়াডারে উলঙ্গ দেইখা আমি লোভে পড়ে গেছিলাম। সামলাইতে পারিনাই নিজেরে। 

- স্টুপিড? ওটা একটা মৃত মেয়ে ছিলো। একটা লাশের সাথে তুই? 

-  স্যার,ওটা লাশ তো আমিও জানতাম। কিন্তু জিন্দা কিভাবে হইয়া গেলো। ওইডাই মাথায় ঢুকেনাই। 

- লাশ কখনো জীবন্ত হয়? পুলিশের সাথে ভাঁওতাবাজি করস? 

- কসম কইরা কইতাছি স্যার। ঢাকার বাহিরে যাইবার পর একটা বিলের উপর এম্বুলেন্সটা দাড় করাইছিলাম। আমি মাইনষের মুখে এতোদিন হুনছি এম্বুলেন্স ড্রাইভারগো লগে বহু কিছু ঘটে। ওগো এসব কথা হুইনা আমার খালি হাসি পাইতো। ঠিক আপনের মতো। আমার লগে এরকম ভৌতিক কিছু কখনো ঘটেনাই। তাই এগুলারে পাত্তাও দিতাম না। কিন্তু স্যার, ঐদিন মুতার জন্য আমি গাড়ি খাড়া করাইছি। তখনি আমার হেল্পার কইলো, " ওস্তাদ,আপনে তো এই লাইনে নতুন।সবে ২ মাস হইলো গাড়ি চালান।কোনো সময় মরা মাইয়াগো লগে সহবাস করার মজা নিছিলেন? আমি তো বহুবার নিছি। লন,আইজকা আপনেরেও মজা দিমু"। হেল্পারের কথা হুইনা স্যার আমারো কু-মতলব জাইগা উঠছে। আমি খাড়াই খাড়াই দেখতেছিলাম। হেল্পার এম্বুলেন্স এর দরজা খুইলা ভিতরে ঢুকছে। আমিও রাস্তার কিনারা থেইকা এম্বুলেন্স এর পিছনে আইসা দাড়াইছিলাম। হেল্পার লাশের বক্স খুইলা, লাশটারে টাইনা সিটের উপর তুলছে। পরে লাশের দেহ থেইকা সব খুইলা, হেল্পার শুরু কইরা দেয়। মাইয়াডা স্যার দেখতে সুন্দর আছিলো অনেক। মরার পরেও মাইয়াডারে নায়িকাদের মত দেখাইতেছিলো। হেল্পার কাম সাইরা নামার পর,আমারে কইলো যাইতে। উলঙ্গ লাশটারে দেইখা আমার লোভ বাইড়া যায় স্যার আরো। পরে আমিও যাইয়া তৃপ্তি মিঠাই লইছি। 

- শা*লা মানুষ নামের অমানুষ তোরা। আচ্ছা বল,পরে কি হলো?

- পরে স্যার আমি গাড়ি থেইকা নাইমা দেখি,একটা গাড়ি আইতেছে। রাত তখন ২ টার বেশি। গেরামের রাস্তায় এতো রাইতে গাড়ি অর্থাৎ পুলিশ। আমি পুলিশের গাড়ি ভাইবা তারাতারি এম্বুলেন্স এর ঢাকনা লাগাই দিছি। ভিতরে যে মাইয়াডার লাশ বক্সে ভরিনাই,ওইডা আমার মাথায় নাই। দরজা লক কইরাই স্যার আমি সামনে যাইয়া বসি। পরে এম্বুলেন্স স্টার্ট  করতেই দেখি,একটা মুরগীর গাড়ি যাইতেছে। পুলিশ ভাইবা ডরাই গেছিলাম। পরে একটা সিগারেট ধরাইয়া আমি গাড়ি টান দিতেই,পিছন থেইকা কেও বইলা উঠলো," গাড়ি থামা"।

বিশ্বাস করেন স্যার, এতো ভয়ানক আছিলো কণ্ঠস্বর। আমি তাকাই হেল্পারের দিকে,হেল্পার তাকায় আমার দিকে। কিছু বুঝে উঠার আগেই এম্বুলেন্স এর কাচ ভাইঙ্গা সেই মরা মাইয়া আমার ঘাড় ধইরা বসে। এরপর তো কইলামই স্যার। লাফ মাইরা আমি আর হেল্পার গাড়ি থেইকা নিচে পইড়া যাই। হুশ আছিলো না আর। জ্ঞান ফেরার পর দেখি এম্বুলেন্স খালি। কসম স্যার,এর বেশি আমাগো আর কিছুই জানা নাই। 


ইন্সপেক্টর জয়নাল পুরো ঘটনা শুনে কিছুক্ষণ চুপ থাকে।সকাল থেকে ড্রাইভার আর হেল্পারকে ডাণ্ডা পেটা করে, হাতা কা/টা গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পড়িয়ে বসিয়ে রেখেছে। পুরো থানা যখন নিরব,তখনি ঐ মরা মেয়েটির পরিবার উপস্থিত হয় থানায়। ইন্সপেক্টর জয়নাল ব্যাপারটা নোটিশ করার আগেই,মরা মেয়েটির বাবা অর্থাৎ  আকবর সাহেব চিল্লানি দিয়ে বলে," আমার মরা মেয়ের লাশটারে কোথায় লুকাইছত বল তোরা"। এরকম ধমক দিতে দিতে আকবর সাহেব দৌড়ে এসে ড্রাইভারের কলার ধরে। ইন্সপেক্টর জয়নাল ব্যাপারটা সামাল দিতে চাইলেও,ব্যর্থ হয়। আকবর সাহেব প্রচুর রেগে আছেন। উনি ধস্তাধস্তির মধ্যে ড্রাইভারকে আরো কয়েকটি লাথি,ঘুষি মেরে দেয়। এসব দেখে থানায় উপস্থিত বাকিরা এসে হাজির হয়। সবাই আকবর সাহেবকে সামাল দিয়ে বসায়। উনি চেয়ারে বসে এইবার হুট করে কেঁদে দিলেন। কান্না স্বরে বলতে লাগলেন তিনি," আমার  মেয়ের অকাল মৃত্যুটা এখনো মেনে নিতে পারিনি। রোগ নেই,কিছু নেই হুট করে মারা গেলো। আল্লাহ্‌ তার বান্দাকে তার কাছে নিয়ে যায়। গ্রামে আমাদের ফ্যামিলি কবরস্থানে দাপন করবো ভেবে, ঢাকা থেকে গ্রামে লাশ আনতেছিলাম। তোদের উপর বিশ্বাস করে লাশ গাড়িতে তুলেছি। আমরা কেও সাথে আসিনি তাই লাশ বিক্রি করে দিলি? তোদের কত টাকা লাগবে বল আমাকে। আমি দিতে রাজি,তবুও বল আমার মেয়ের লাশটাকে কোথায় রেখেছিস"। আকবর সাহেবের কান্না দেখে ড্রাইভার নিজেও মন খারাপ করে নেয়। ইন্সপেক্টর জয়নাল তখন মনে মনে বলে," দেখ ড্রাইভারের অভিনয়। আকবর সাহেব যদি জানে এই দুইটা তার মেয়ের সাথে কি করছে। তবে কোর্টে তোলারও সুযোগ দিবেনা। এখানেই গুলি করবে"।


মরা বাড়ির মতো থানায় কান্নার বাজনা দেখে, লকাবের অনেক কয়েদিও কান্না শুরু করে দিলো। ইন্সপেক্টর জয়নাল এসব দেখে আকবর সাহেবকে বললেন," দেখুন সাহেব। এম্বুলেন্স এক্সিডেন্ট হয়েছে। ড্রাইভার, হেল্পার আর গাড়িরও প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। আমি বিষয়টা তদন্ত চালাচ্ছি। এই দুইটাকে তো আমি ঝুলাচ্ছি। আপনার মেয়ের লাশ বের করে আমি জানাবো আপনাকে"। এইরকম নানান টপিক আর যুক্তি বুঝানোর পর আকবর সাহেব মানতে রাজি হন। উনি থানা থেকে পরিবার নিয়ে বাড়িতে চলে যান। ইন্সপেক্টর জয়নাল ড্রাইভার আর হেল্পারকে লকাবে ঢুকিয়ে দিলো। এরপর করিমকে বলে," আমার জন্য এক কাপ চা নিয়ে আসুন আমার কেবিনে"। করিমকে চায়ের নির্দেশ দিয়ে জয়নাল সাহেব চলে যান নিজের কেবিনে। করিম কিছুক্ষণ সময় নিয়ে, চা বানিয়ে চলে গেলেন জয়নাল সাহবের কাছে। টেবিলে চা রেখে করিম চলে আসবে,তখনি পিছন থেকে জয়নাল ডাক দিয়ে বলল," আপনার কি মনে হয়। ড্রাইভার আর হেল্পার সত্য বলতেছে? সত্যিই কি গাড়ি এক্সিডেন্ট হবার পর লাশ গায়েব হয়েছে? আর লাশটি কিভাবে জীবন্ত হয়। এসব বনোয়ারি মনে হচ্ছেনা আপনার?"। করিম সাহেব জয়ানালের কথা শুনে থমকে দাঁড়ায়। এরপর পা ঘুরিয়ে পিছনে তাকালেন। জয়নাল সাহেবের একটু কাছে এসে করিম ফিসফিস করে বলল," স্যার,ঐ রাস্তাটা ভালো নয়। কখনো নিজের চোখে দেখিনি ঠিক,কিন্তু অনেক শুনছি ঐ রাস্তার ব্যাপারে"। করিম সাহেবের চোখে ভয় আর অশ্চর্যজনক কথাগুলা শুনে জয়নাল সাহেব বললেন," কি শুনেছেন ঐ রাস্তার ব্যাপারে?"। জয়নাল সাহেবের আগ্রহ দেখে করিম এইবার একটা চেয়ার টেনে বসে। এরপর ধীর কন্ঠে সে বলে,


" স্যার,আমরা প্রশাসনের লোক। কথা বাহিরে গেলে লোকে হাসাহাসি করবে। কিন্তু সত্য এইটাই যে,এই রাস্তায় অনেক কিছু ঘটে। পুলিশে জয়েন হবার আগে শুনেছি,ঐ রাস্তায় অনেক লাশ পাওয়া যেতো। রাস্তাটা বিলের মাঝখান দিয়ে গেছে। দুই পাশে বিল,আর মাঝে ফাঁকা রোড। ডান পাশের বিলের পর,একটা হিন্দু গ্রাম আছে।মুসলিমও আছে,তবে হিন্দুর সংখ্যায় কম । আর ডান পাশের বিলের পর কিছু ঘন গাছপালা, তারপর একটা ছোট নদী। আগে হিন্দুরা ঐ নদীর কিনারায় লাশ পুড়তো । শ্মশান ঘাট আগে থাকলেও,এখন হিন্দুরা ওখানে লাশ পোড়েনা। শ্মশান ঘাটটা এক হিসেবে পরিত্যক্ত। এর পিছনেও কারণ আছে। শ্মশান ঘাটে যাওয়া-আসার সময়,হুটহাট হিন্দুরা কিছু লাশ খুঁজে পেতো। কোথা থেকে এই লাশ এসেছে আর কে এনেছে। সেটির নির্দিষ্ট কোনো হুদিশ পেতো না। অনেকে মনে করতো,পলিটিক্যালের লোকজন রাজনৈতিক মামলায় খুন করে। আর লাশ এখানে ফেলে যায়। কিন্তু একদিন ২১ জন হিন্দুরা শ্মশান ঘাটে একটা লাশ নিয়ে যাচ্ছিলো। যেতে যেতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। উনারা উনাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী লাশ পুড়ে আসার সময় দেখে এক ভয়ানক ঘটনা। মাত্রই উনারা যে লাশ পুড়ে এসেছে,সেই লাশটা তাদের আসার পথে দাঁড়িয়ে আছে। লাশের সেই বীভৎস চেহারা দেখে ভয়ে একেকজন একেক দিকে পালায়। সেই স্থান থেকে ফিরে আসতে পারে মাত্র ১২ জন। বাকি ৯ জন ফিরে আসেনি।এলাকায় এসে তারা ব্যাপারটা সবাইকে জানায়। কেও ভয়ে সেদিন রাতে তো আসেনি,কিন্তু সকালে যখন ঐ ৯ জন ব্যাক্তিকে খুঁজতে আসা হয়। তখন শ্মশান ঘাটে তাদের মরদেহ পাওয়া যায়। প্রতিটি মানুষের মাথা ছিলো কাঁদার ভিতর। সবার গায়ে ছিলো অসংখ্য কামড়ের দাগ। টুকরো টুকরো মাংস ছিঁড়ে খেয়েছে সে। তখন থেকেই পরিত্যক্ত সেই শ্মশান। কিন্তু ঘটনা নাকি থামেনি। কদিন পর  পর ওখানে লাশ পাওয়া যায়। যাদের কেও চিনেনা। পুলিশকেও ইনফর্ম করেনা,যেহেতু এইটা ভৌতিক মামলা। স্যার..? আপনি ঠিক আছেন?"।


হুট করে লাফ মেরে উঠে ইন্সপেক্টর জয়নাল সাহেব। গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে উনার। যতই বুঝাতে চাচ্ছে তিনি ভয় পায়নি,কিন্তু করিম সাহেব ঠিকি ধরে ফেলেন। জয়নাল সাহেবের অবস্থা দেখে করিম আবার বলল,' ড্রাইভার আর হেল্পারের কথা অনুযায়ী, বিলের মাঝে দাঁড়ায় তারা। যদি আমি ভুল না হই,তবে ওরা সেই ভয়ানক বিলের কথাই বলতেছে। আমাদের সেখানে যাওয়া উচিৎ। হয়তো পরিত্যক্ত ঐ শ্মশান ঘাটের আশেপাশে মেয়েটির লাশ পড়ে থাকবে"।  করিমের কথা শুনে জয়নাল সাহেব কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যান। এরপর অনেক ভেবে বলল," এখনি বের হই। ড্রাইভারকে বলুন গাড়ি নিয়ে আসতে"।

যে কথা সেই কাজ। ৩ গাড়ি  পুলিশ ফোর্স নিয়ে ইন্সপেক্টর জয়নাল সেই বিলে যায়। এম্বুলেন্স এক্সিডেন্ট হওয়া স্থানে গাড়ি রেখে,সবাই নেমে পড়ে । করিম জয়নালকে হাতের ইশারায় সেই পরিত্যক্ত শ্মশান ঘাট দেখায়। জয়নাল সাহেব সবাইকে নিয়ে নেমে যায় বিলে। এরপর বিল পেরিয়ে প্রবেশ করলেন ঘন জঙ্গলে। তারপর শ্মশান ঘাটে। আশেপাশে অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজি করার পর একজন চিৎকার দিয়ে বলে," স্যার,পেয়েছি"। উনার ডাক শুনে সবাই ছুটে যায়। শ্মশান ঘাটে না, ঘন গাছপালার সাইডে পড়ে আছে মেয়েটির লাশ।দুইটা চোখ তুলে ফেলা হয়েছে। একটা হাতের অর্ধেক কামড়ে খেয়ে নিয়েছে। উলঙ্গ নিথর দেহ,পড়ে আছে কিনারায়। জয়নাল সাহেব কিছু বলার আগেই করিম সাহেব বললেন," স্যার,ধারণা সঠিক। ড্রাইভার আর হেল্পার মিথ্যে বলেনি। তাড়াতাড়ি লাশ নিয়ে এই স্থান ত্যাগ করি। বলা যায়না কখন কি হয়"। জয়নাল সাহেব করিমের কথা শুনে দ্রুত লাশ প্যাকেট করে। এরপর সেই স্থান ত্যাগ করে চলে আসে রাস্তায়। এতক্ষণে, বিলের ডানে থাকা স্থানীয় লোকেরা জড়ো হয়ে গেছে। তারা এসে নিজেদের মাঝে নিজেরা নানান কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। জয়নাল সাহেব এক ফাঁকে একজনের কথা নোটিশ করেন। তিনি বলছিলেন,' দেখ দেখ,আজ ৪ মাস পর আবারো একটি লাশ। এই  শয়তানের হাত থেকে কবে যে আমরা রক্ষা পাবো"। জয়নাল সাহেব উনার কথাটা শুনে আরো শিওর হলেন,এই স্থান ভয়ানক।  তিনি তড়িঘড়ি করে,লাশ আরো একটি এম্বুলেন্সে তুলে রওনা করেন। 


থানায় এসে লাশ পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠানো হয়।যদিও,আগে মেয়েটির পোস্টমর্টেম হয়নি। যেহেতু এইটা কোনো আত্মহত্যা বা খুনের কেস ছিলো না। কিন্তু এখন তো এটি একটা ক্রাইমে যুক্ত হয়েছে। অতএব, পোস্টমর্টেম করা জরুরী।  


২ মাস পর....... 

বাইক এক্সিডেন্ট করা আসিফের খারাপ অবস্থা। সন্ধায় এক্সিডেন্ট করেছে। মৃত্যুর সাথে লড়াই করে যাচ্ছে সে। পরিবারের লোকজন স্থানীয় ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে,আসিফকে ঢাকা হসপিটাল নিয়ে যাচ্ছে একটি এম্বুলেন্সে করে। ঢাকা যেতে আরো ৩ ঘন্টা লাগবে। তাদের এম্বুলেন্সটা,মাত্র সেই বিলের রোডে প্রবেশ করেছে.....


চলবে..........? 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।